ইউক্রেনের একের পর এক ড্রোন হামলা গত বৃহস্পতিবার ভোরে মস্কোর আকাশে নেমে আসার সময় দেশটির প্রতিক্রিয়া ছিল পরিকল্পিত কৌশলের চেয়ে বেশি বিশৃঙ্খল ও তাড়াহুড়োময়। মস্কোর রাস্তায় ধারণ করা ভিডিওতে সেই অস্থির পরিস্থিতির চিত্র ধরা পড়েছে।
সিএনএনের যাচাই করা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ করা ফুটেজে দেখা যায়, রুশ সেনারা ব্যস্ত মহাসড়কে দাঁড়িয়ে কাঁধে বহনযোগ্য এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে ড্রোন ভূপাতিত করার চেষ্টা করছে। এ সময় যানবাহন চলাচল অব্যাহত ছিল।
অন্যদিকে, সেখানকার একটি বাজার এলাকায় রুশ বাহিনীর প্রতিহত করা ইউক্রেনীয় ড্রোন ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে সরে যায়।
আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভবত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মস্কোর উপকণ্ঠে একটি তেল সংরক্ষণ ট্যাঙ্কে আঘাত হানে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) একজন অস্ত্র বিশেষজ্ঞ সিএনএনকে বলেন, এটি ছিল রাশিয়ার নিজেদের কারণেই ক্ষতি করা একটি ঘটনা। যার ফলে বিশাল ধোঁয়ার মেঘ এবং ট্যাঙ্কের বড় অংশ আকাশে উড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে,গত বৃহস্পতিবারের হামলাটি ছিল ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ড্রোন আক্রমণগুলোর একটি। ওই হামলা রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষাকে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত করে ফেলার কৌশলের সফল উদাহরণ।
এসআইপিআরআই’র সিনিয়র গবেষক মার্কাস শিলারের মতে, রাশিয়ার পুরনো কিছু সিস্টেম পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। অন্যদিকে ইউক্রেন বছরের পর বছর ধরে তার আক্রমণ সক্ষমতা উন্নত করে চলেছে।
২০২৪ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর দীর্ঘ পাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি সেন্ট পিটার্সবার্গেও তারা রুশ প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ে এবং মস্কোতেও একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। ফলে যুদ্ধ কার্যত রাশিয়ার বড় শহরগুলোর ভেতরে পৌঁছে গেছে।
ম্যাকেঞ্জি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের সিনিয়র বিশ্লেষক স্টু রে বলেন, ব্যস্ত মহাসড়কে ‘ম্যানপ্যাডস’ ব্যবহারের ভিডিওটি তাড়াহুড়ো ও অপ্রশিক্ষিত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়। যেখানে কোনো ধরনের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই সামরিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে-যা বেসামরিক মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেন সীমান্ত ও ফ্রন্টলাইনে কেন্দ্রীভূত করেছিল। তবে ইউক্রেন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বাড়ানোর ফলে রাশিয়াকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করা হয়েছে
ইউক্রেন দাবি করেছে, তারা রাশিয়ার বহু বিমান প্রতিরক্ষা রাডার ও লঞ্চার ধ্বংস করেছে। ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শত শত প্রতিরক্ষা উপাদান ধ্বংসের দাবি করছে কিয়েভ।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক টমাস উইথিংটন সিএনএনকে বলেন, রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা মূলত যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ক্রুজ মিসাইল ঠেকানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল, ড্রোন হামলার জন্য নয়।
তিনি বলেন, রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা এই ধরনের হামলা ঠেকানোর জন্য উপযুক্ত নয়। বড় ধরনের পুনর্গঠন ছাড়া এই পরিস্থিতি বদলাবে না। টমাস উইথিংটন জানান, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া আধুনিক প্রযুক্তি সংগ্রহে সমস্যার মুখে পড়েছে, ফলে কার্যকর নতুন সিস্টেম তৈরি করাও কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপের কারণে রাশিয়াকে মে মাসে রেড স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজেও সামরিক সরঞ্জাম প্রদর্শন সীমিত করতে হয়েছিল। তবে রাশিয়া দাবি করেছে, তারা শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ২১৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
এদিকে ইউক্রেনের মানববিহীন সিস্টেম বাহিনীর কমান্ডার রবার্ট ব্রোভদি জানিয়েছেন, মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মস্কোর আশপাশে ১০০টিরও বেশি বিমান প্রতিরক্ষা লঞ্চার এবং ৫০টিরও বেশি ‘প্যান্টসির’ মোবাইল সিস্টেম মোতায়েন ছিল। তবুও একসঙ্গে ১০০টির বেশি ড্রোন হামলা হলে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক ড্রোন রাডারে শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন, কারণ এগুলো বড় মিসাইল বা যুদ্ধবিমানের মতো সহজে ধরা পড়ে না।
উইথিংটন বলেন, রাডারে কিছু শনাক্ত করা এক জিনিস, কিন্তু সেটিকে সঠিকভাবে ট্র্যাক করা আরেক জিনিস। শত শত ড্রোন একসঙ্গে বিভিন্ন দিক থেকে এলে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ইউক্রেনের ধারাবাহিক বড় আকারের হামলা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে পারে, যদিও সঠিক মজুদের পরিমাণ জানা কঠিন।
সবশেষে তিনি বলেন, রাশিয়ার জন্য প্রতিটি বিকল্পই কঠিন। এখন তারা শুধু সবচেয়ে কম ক্ষতিকর বিকল্পটাই বেছে নেয়ার চেষ্টা করছে।
