যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত একতরফা ‘পাল্টা শুল্ক’ (রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) অবৈধ ঘোষণা করেছে। ফলে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও বড় শঙ্কার কারণ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ চুক্তিটি। এতে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তিটি পুনঃপর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তির কী হবে, শুল্ক বাতিল হলেও অন্য শর্তগুলো বহাল থাকবে কিনা, এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ভাগ্যের চাবিকাঠিও এখানে।
গত ৯ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এআরটি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ২০ শতাংশ ছিল। প্রথমে এটা ছিল ৩৭ শতাংশ। নানা আলোচনা আর দরকষাকষির পর কয়েকদিন আগেই শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এ চুক্তি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করবে না; কারণ সবার জন্য শুল্ক হার সমান থাকায় প্রতিযোগিতার মাত্রা একই থাকবে। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে চুক্তিটি তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা হয়েছে। এটা কিছুটা হলেও অসম চুক্তি। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশের জন্য শর্তাবলি অসুবিধাজনক হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিমাণ আমদানি করতে হবে। তাদের মতে, চুক্তিটি পুনঃমূল্যায়নের প্রয়োজন। কারণ এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তার অবস্থান পাল্টেছে ট্রাম্পের আরোপিত একতরফা ‘পাল্টা শুল্ক’ (রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) অবৈধ ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে আবারো এক নতুন মোড় নিয়েছে পুরো বিষয়টি। বাংলাদেশ কি এই রায়ে লাভবান হবে, নাকি ট্রাম্পের ‘প্ল্যান বি’ আমাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে; এমন প্রশ্ন নতুন করে সামনে আনছেন অনেকে। আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্য আইনে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে, বাংলাদেশের ১৯ শতাংশ শুল্ক কমে ১০ শতাংশ হচ্ছে।
এটাকে আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের। তারা বলছেন, দেশটির যে আইনে ট্রাম্প নতুন শুল্কের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেখানে আপাতত শুল্ক কমার বিষয়টি ছাড়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে তেমন স্বস্তির বার্তা নেই।
রপ্তানিকারকরা যা বলছেন
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর আমাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমরা কি বাস্তবে কোনো লাভবান হচ্ছি, নাকি এই পরিবর্তন শুধু প্রতিযোগী দেশগুলোর সুবিধা দিচ্ছে। আগে আমরা ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশ ট্যারিফ কমানোর মাধ্যমে কিছু সুবিধা পেয়েছিলাম, কিন্তু আদালতের রায়ে সেই কাঠামো বাতিল হয়ে যাওয়ায় এখন সেগুলো আর কার্যকর নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। ‘নতুন ১০ শতাংশ ট্যারিফ সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ায় আমাদের আগের লাভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপন হয়নি।’ মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এ পরিস্থিতিতে চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ কী দিচ্ছে এবং কী পাচ্ছে-তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তারমতে, বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে চুক্তিটি পুনর্মূল্যায়ন ও সমন্বয় করা জরুরি, যাতে আমরা সুবিধা নিতে পারি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে যদি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্যও সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, চুক্তিটি দেশের জন্য অসম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্কের পরিবর্তে প্রায় ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে ক্রেতারা কিছুটা সুবিধা পাবেন এবং কাজের অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে একজন রপ্তানিকারককে মোট প্রায় ২৫.৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ১৯ শতাংশ ট্যারিফ বাতিল হয়ে সব দেশের জন্য সমানভাবে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ এতে প্রতিযোগিতায় সমতা ফিরে এসেছে এবং ল্যান্ডিং কস্ট কমেছে। ফলে গার্মেন্টস রপ্তানিতে অর্ডার বৃদ্ধি ও দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান। তিনি বলেন, তবে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের উচিত নিজেদের মধ্যে ন্যায্যমূল্য বজায় রাখা, যাতে শুধু অর্ডার বাড়ে না, গড় রপ্তানি মূল্যও ধরে রাখা যায়।
চুক্তির ভবিষ্যৎ
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন যে ১৯ শতাংশ ট্যারিফ কাঠামোতে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়েছিল, তা এখন কার্যত ১০ শতাংশে নেমে এসেছে- অন্তত ১৫০ দিনের জন্য। প্রেস ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করা হয়েছে, ১০ শতাংশের বেশি যেসব ট্যারিফ চুক্তি ছিল, সেগুলো আপাতত ১০ শতাংশে সমন্বিত হবে এবং এ সময়ের মধ্যে দেশভিত্তিক পর্যালোচনা চলবে।
আইনগতভাবে ট্যারিফ কাঠামো যদি আদালতের রায়ে অকার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে ১৯ শতাংশ-ভিত্তিক সমঝোতার বাধ্যবাধকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, বাংলাদেশকে ১৯ শতাংশ ট্যারিফের ভিত্তিতে দেয়া প্রতিশ্রুতি এখন আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল রাখতে হবে- এমনটি বলা কঠিন। কারণ ট্যারিফই যদি ১০ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে আগের শর্তগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করায় বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপরও। আগে যে সমঝোতার মাধ্যমে ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ ট্যারিফ নির্ধারণের কথা হয়েছিল, সেই কাঠামো এখন কার্যত আইনি ভিত্তি হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেন বেসরকারি খাতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আগামী ১৫০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ আরোপ করা হতে পারে, অন্যথায় ট্যারিফ শূন্যেও নেমে আসতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত সতর্ক থাকা এবং বাণিজ্যচুক্তির যেকোনো দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা দ্রুত দূর করার উদ্যোগ নেয়া।
বাংলাদেশের করণীয় কী?
যেহেতু বৈশ্বিক বাণিজ্য বর্তমানে অস্থির অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের দিক থেকে দেখা যাচ্ছে, তাই বাংলাদেশের উচিত চুক্তি বাতিলের পরিবর্তে অত্যন্ত সতর্কভাবে এগিয়ে যাওয়া। আমাদের চুক্তিটি পুনঃপর্যালোচনা করে সর্বোত্তম সুবিধা নিশ্চিত করার দিকেই মনোযোগ দিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতো, এখন আবেগ নয়- কৌশল জরুরি। তারমতে, বাংলাদেশের উচিত- ১৫০ দিনের ‘উইন্ডো’কে কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য অভিযোগের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, শ্রমমান, পরিবেশমান ও বাণিজ্য স্বচ্ছতার বিষয়ে প্রস্তুতি শক্তিশালী করা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে বিকল্প কৌশল তৈরি করা এবং নতুন বাস্তবতায় পুনঃআলোচনার প্রস্তুতি রাখা। তিনি বলেন, এ পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুখবর- কারণ ১৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নেমে আসা প্রতিযোগিতায় স্বস্তি দেবে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। ১৫০ দিনের পর কী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। অতএব, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- প্রস্তুতি, কৌশল ও নীতিগত দৃঢ়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কেন গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একক সর্ববৃহৎ বাজার, যেখানে আমাদের তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন ইউএস অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। মোট আমদানি করা পোশাকের মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ছিল তুলাভিত্তিক এবং অবশিষ্ট অংশ ছিল নন-কটন বা তুলা-বহির্ভূত পণ্য। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে প্রায় ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।
