২০২০ সালের ২৯শে নভেম্বর। আর্সেনালের ডেভিড লুইজের সঙ্গে সেই ভয়াবহ, মর্মান্তিক সংঘর্ষ। মাথার খুলিতে চির ধরায় মাঠেই অচেতন হয়ে পড়েন রাউল হিমিনেজ। সতীর্থ, কোচ থেকে শুরু করে গ্যালারিতে থাকা পরিবারÑ সবাই তখন শঙ্কিত, উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সের এই স্ট্রাইকার বেঁচে আছেন তো? ফুটবল ক্যারিয়ার তো দূরের কথা, জীবন নিয়েই টানাটানি। সেই ফুটবলার জীবনে প্রথমবার বিশ্বকাপের শুরুর একাদশে খেলতে নেমে কাঁদলেন, হাসলেন এবং শেষ পর্যন্ত গোল করে মেক্সিকোকে এনে দিলেন এক অবিস্মরণীয় জয়। ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকার ৮০,৮২৪ জন দর্শকের গগনবিদারী চিৎকারের মাঝে সেই অবিশ্বাস্য গল্পটাই লিখলেন ৩৫ বছর বয়সী হিমিনেজ।
১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিল আর ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও বিশ্বজয়ের সাক্ষী এই আজতেকা স্টেডিয়াম। বিশ্বের প্রথম ভেন্যু হিসেবে রেকর্ড তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের গৌরব গড়লো এই ফুটবল ক্যাথেড্রাল। ম্যাচ শুরুর আগে শাকিরা ও নাইজেরিয়ান গায়ক বার্না বয়ের সুরের মূর্ছনায় মেতে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। এমন এক মঞ্চে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ‘স্টার্ট’ পান হিমিনেজ। এর আগে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপ মিলিয়ে মোট ৬টি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি, তবে শুরুর একাদশে থাকা হয়নি কখনোই, গোলও করা হয়নি। ম্যাচের মাত্র চতুর্থ মিনিটেই আলভারাডোর ক্রসে দুর্দান্ত এক হাফ-ভলিতে নিজের উপস্থিতি জানান দেন সদ্য উলভসে ফেরা এই স্ট্রাইকার। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস সে যাত্রায় দারুণভাবে তা ঠেকিয়ে দেন। মেক্সিকোর ‘ওলে, ওলে’ সেøাগানে শুরু থেকেই দিশাহারা বাফানা বাফানারা প্রথমার্ধের নবম মিনিটেই গোল খেয়ে বসে। গোলকিপার উইলিয়ামসের ব্যাক-পাসের মারাত্মক ভুল লুফে নেন এরিক লিরা। অধিনায়ক এডসন আলভারেজের জায়গা মিডফিল্ডের দায়িত্ব পাওয়া লিরা বল বাড়িয়ে দেন হুলিয়ান কুইনোনসের দিকে। বক্সে ঢুকে নিখুঁত শটে উইলিয়ামসকে নাটমেগ করে (পায়ের নিচে দিয়ে) বল জালে জড়ান কলম্বো-বংশোদ্ভূত কুইনোনস। বিশ্বকাপ ইতিহাসে গত দুই দশকের মধ্যে এটি ছিল দ্রুততম গোল।
তবে ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ জমা ছিল দ্বিতীয় অর্ধের ৬৭তম মিনিটে। রবার্তো আলভারাডোর ডান প্রান্তের দারুণ এক ক্রস থেকে চমৎকার হেডে বল জালে জড়ান হিমিনেজ। দেশের হয়ে ১২৫তম ম্যাচে এটি তার ৪৬তম গোল, যা তাকে মেক্সিকোর ইতিহাসের যৌথ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতায় পরিণত করেছে। ৫২ গোল নিয়ে সবার উপরে হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজ। গোল করেই আকাশের দিকে হাত তোলেন হিমিনেজ, যা ছিল গত মার্চে প্রয়াত তার বাবা রাউল হিমিনেজ ভেগাকে উৎসর্গ করা। গ্যালারির তীব্র গর্জনের মাঝে সতীর্থরা যখন তাকে জড়িয়ে ধরেন, হিমিনেজের চোখ তখন ভিজে ওঠে অশ্রুতে। ম্যাচ শেষে হিমিনেজের এই আবেগ ছুঁয়ে গেছে সতীর্থদেরও। প্রথম গোলদাতা হুলিয়ান কুইনোনস বলেন, ‘আমরা তাকে মন থেকে অভিনন্দন জানিয়েছি। কারণ সে দলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেয়। ও আমাদের দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় দলের হয়ে ও যে গোল সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে, তা সত্যিই অসাধারণ।’
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ ছিল মূলত লাল কার্ডের প্রদর্শনী। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ইতিহাসে ৩টি লাল কার্ডের ঘটনা এটিই প্রথম। ৪৯তম মিনিটে মেক্সিকোর গুতিয়ারেজকে গোলবঞ্চিত করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার স্পেফেলো সিথোলে। ৮৪তম মিনিটে আলভারাডোর মুখে কনুই দিয়ে আঘাত করায় ভিডিও এসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) চেকের মাধ্যমে দ্বিতীয় লাল কার্ড দেখেন দক্ষিণ আফ্রিকার থেম্বা জোয়ান।
৯ জনের
দলের বিপক্ষে ম্যাচ যখন মেক্সিকোর পকেটে, ঠিক তখনই ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ফাউল করে বসেন মেক্সিকান অধিনায়ক সিজার মন্তেস। তাকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখান ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন সামপাইও।
