নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও পানি নিষ্কাশন সংকট নিরসনে বামনী নদীতে নির্মাণাধীন ক্লোজার বাঁধের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন ‘নোয়াখালী জেলার বামনী নদী অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এ অবকাঠামো সম্পন্ন হলে প্রায় ৯ লাখ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। বুধবার স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে নির্মাণকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নোয়াখালীতে অতিবৃষ্টি ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে প্রায়ই বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এর আগে বামনী নদীতে ১৯-ভেন্টের একটি রেগুলেটর নির্মাণ করা হলেও ক্লোজার বাঁধ না থাকায় আলগীর খাল ও নোয়াখালী খালে জোয়ার-ভাটার প্রভাব অব্যাহত ছিল। ফলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, কৃষিজমির ক্ষতি, ঘরবাড়ি ও সড়ক প্লাবনের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এসব সমস্যা সমাধানে নোয়াখালী খালের রিকশাওয়ালা মোড় এলাকায় অস্থায়ী মাটির আড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও তা কার্যকর স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। পরে সরকার ‘নোয়াখালী জেলার বামনী নদী অববাহিকার বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় বামনী নদীতে ক্লোজার বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন, সøুইস গেট নির্মাণ এবং পুরোনো বাঁধ অপসারণের কাজ চলছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জানা যায়, প্রায় ৪১৫ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার গভীর এই ক্লোজার বাঁধ নির্মিত হলে কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলার প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৯ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন। একইসঙ্গে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার সম্পদ সুরক্ষার আওতায় আসবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা হ্রাসের পাশাপাশি কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত ১০ মার্চ পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু যৌথভাবে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এরপর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল) ও পাউবো যৌথভাবে দিন-রাত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী বর্ষণ ও তীব্র জোয়ার-ভাটার মধ্যেও নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ কাজে প্রয়োজনীয় জিও টিউব, জিওব্যাগ ও জিওটেক্সটাইল সরবরাহের মাধ্যমে আরএফএল জিও টেক্সটাইল গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে। এতে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, তীব্র জোয়ার-ভাটা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও মাত্র তিন মাসে ক্লোজার বাঁধের মূল নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পুরো প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নোয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল মানবজমিনকে বলেন, টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কিছুটা বিলম্ব হলেও জনস্বার্থে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। সাধারণত এ ধরনের কাজ পানির স্তর সর্বনিম্ন্ন থাকাকালে ফেব্রুয়ারি মাসে বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে মে-জুন মাসেই আমরা এ চ্যালেঞ্জিং কাজ হাতে নিয়েছি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
