২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ফাঁপা বুলি’ ও ‘প্রতারণামূলক’ বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। শুক্রবার বিকালে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ড. আতিক মুজাহিদ এ কথা জানান। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে তারা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাজেট বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, এটি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং অনেকাংশে ‘ফাঁপা বুলি’ ও ‘প্রতারণামূলক’ বাজেটে পরিণত হয়েছে। যদিও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, তবুও সামগ্রিক বিশ্লেষণে বাজেটটি বাস্তবসম্মত নয়।
আতিক মুজাহিদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বড়। কিন্তু বর্তমান ভঙ্গুর ও ঋণনির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতায় এত বড় বাজেট ‘কাল্পনিক’ ও ‘অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী’। বাজেটটি সংখ্যাভিত্তিক বাস্তব পরিকল্পনার চেয়ে ইশতেহারনির্ভর প্রতিশ্রুতির ওপর বেশি দাঁড়িয়ে আছে।
রাজস্ব আহরণ প্রসঙ্গে ড. আতিক বলেন, সরকার এনবিআরের জন্য উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও তা অর্জনের বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা দেয়নি। এনবিআর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সরকার ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায় সম্ভব হবে না। ফলে শুরু থেকেই আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেটে বিপুল ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও সেই ব্যয় নির্বাহের নির্ভরযোগ্য অর্থের উৎস স্পষ্ট নয়। এ কারণে পরবর্তীতে বাজেট সংকোচন বা ব্যয় কমানোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা জনগণের প্রত্যাশাকে হতাশ করবে।
ব্যাংক ঋণনির্ভরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আতিক মুজাহিদ বলেন, দেশের বৈদেশিক ঋণ ইতোমধ্যে ১০ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের পরিমাণও প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা ব্যাংকিং খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক ব্যাংক কার্যত সংকটে রয়েছে, কিন্তু বাজেটে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ কিংবা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
ড. আতিক বলেন, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে শেষ পর্যন্ত সরকার যদি টাকা ছাপানোর পথে যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। অথচ একই সঙ্গে সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর-ভ্যাট কমানোর কথা বলছে, যা পরস্পরবিরোধী।
কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক ব্যাংক হিসাব থাকলেও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়মিত কর দেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করা হলে অনেক মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারেন। এতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি ক্ষুদ্র ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর উৎসে কর আরোপেরও বিরোধিতা করেন। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধার মুখে পড়বেন।
তিনি আরও বলেন, অর্থপাচার ও কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান নেই। এটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই উদ্বেগজনক।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সেই অর্থ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হবে নাকি সেবার মান উন্নয়নে, তা স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি রোধ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে।
ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তবসম্মত, বৈষম্যহীন ও রূপান্তরমুখী বাজেট প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সরকার এমন একটি বাজেট দিয়েছে, যার ব্যয়ের তুলনায় আয়ের উৎস অস্পষ্ট। এটি মূলত ইশতেহারনির্ভর ও ফাঁপা প্রতিশ্রুতির বাজেট। তাই এনসিপি এ বাজেটের তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি বাজেট একাই পুরো অর্থব্যবস্থা বদলে দিতে পারে না। তবে প্রতি বছর যদি একই ধরনের গতানুগতিক বাজেট প্রণয়ন করা হয়, তাহলে কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক রূপান্তর কখনোই সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কেবল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি জানান, এনসিপির প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিম্ন আয়ের মানুষের আয় বৃদ্ধি, প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের উন্নয়ন। পাশাপাশি একটি সর্বজনীন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টিও তাদের অগ্রাধিকারে থাকত।
এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ বলেন, লুটতরাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি যেভাবে দুর্বল করা হয়েছে এবং অর্থনীতিকে যেভাবে বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধনির্ভর করে তোলা হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এবারের বাজেট একটি রূপান্তরমুখী (ট্রান্সফরমেটিভ) বাজেট হওয়া প্রয়োজন ছিল। এমন একটি বাজেটের প্রত্যাশা ছিল, যা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক ভিত্তিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেবে।
তিনি বলেন, কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি ও প্রকৃত অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) প্রয়োজনের দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে একে অনেকটা নির্বাচনী ইশতেহারনির্ভর বাজেটে পরিণত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যেমন ভোটের সময় জনগণের কাছে অনেক সময় অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেয়, বাজেটেও তেমন কিছু প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বাজেট অধিবেশনে রাজনৈতিক দল ও দেশের সর্বস্তরের মানুষের মতামত ও উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে সরকার বাজেটটি সংশোধন করবে। কেবল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং বাংলাদেশকে আগামী দিনে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

Abdul Matin Sikder
১ ঘন্টা আগেপ্রতারক এনসিপি দির্ঘ ১৮ মাস সরকারী সম্পদ লুটপাট করেছে, হাসিনার মতো ইলেকশন ইন্জিনিয়ারিং করে অবৈধ পথে ক্ষমতায় থাকতে চক্রান্ত করেছে। ভিন্নভিন্নভাবে একের পরে এক ষরযন্ত্র করে ১৫ মাস নির্বাচন পিছিয়ে জামাতসিপিলীগ জাতির সাথে ভয়াবহ প্রতারনা করেছে। ওরা নিজেরাই বড় প্রতারক, ওদের কঠিন বিচার হওয়া উচিৎ। যারা নিজেরা অল্প বয়সে বড় ধরনের লুটেরা ও প্রতারক তারা জনগনের ভোটের সরকারকেও ঠিক নিজেদের মতোই মনে করতেছে। প্রতারকরা সবসময় ভালো মানুষকেও প্রতারক মনে করে।