আজ মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালির দ্রোহ এবং জীবনোৎসর্গের মাধ্যমে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার শুভসূচনার দিন। আজ থেকে ৭৪ বছর আগে বাঙালি জনগোষ্ঠীর একঝাঁক অকুতোভয় তরুণ-যুবা, সচেতন নাগরিকসমাজ সেদিন উর্দুভাষী পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর ভাষা-কেন্দ্রিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে নেমেছিল। বুলেটের আঘাতে শহীদ হওয়া সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও কয়েকজন বীর সেনানীদের প্রতিবাদমুখী অবস্থানের কারণে বাঙালির নিজস্ব ভাষা আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকতে পেরেছিল ।
যুগে যুগে শাসকেরা স্পটলাইটে শুধু নিজেদের-সহ একটা সংকীর্ণ বৃত্তের পরিধি দেখতে পায় এবং অন্যদের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি তোয়াক্কা না করে ভুল করে। এমনকি পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহও সে ভুলটি করেছিলেন। তিনি সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ভাষা কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার কিছু নয়। এক ভাষা দ্বারা অন্য ভাষাকে দাবিয়ে রাখার পদক্ষেপ যে ভুল, তার প্রমাণ হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে। আসলে ভাষা প্রকৃতিগতভাবে হাজার বছর ধরে গ্রহণ এবং বর্জনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়; প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়ে তার গতিপথে বাধা সৃষ্টি কোনো সুফল বয়ে আনতে পারে না। দেশে দেশে, কালে কালে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই বাংলা ভাষার ওপর তৎকালীন সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের ধারক-বাহক শাসকগোষ্ঠীর ভাষিক নিপীড়ন-নীতি বিফল হয়েছিল। সেদিন ওদের জন্য আরও নিষ্ঠুর সত্য অপেক্ষমাণ ছিল। সেটা হচ্ছে, ভাষার ওপর আগ্রাসন ভবিষ্যতে ধর্মভিত্তিক বন্ধনকে আলগা করে দিতে পারে, তা তারা বোঝেনি।
সেদিনের শাসকগোষ্ঠী আরেকটা ভুল করেছিল। তারা বুঝতে পারেনি যে, দেশভাগের আগে পূর্ব ও পশ্চিমের মেলবন্ধন শুধুমাত্র ধর্মের গ্রন্থি দ্বারা আবদ্ধ ছিল, তা সত্য নয়। বৃহত্তর ভারতের সংখ্যাগুরু শ্রেণির কাছে সংখ্যালঘু শ্রেণির অধিকার ও নাগরিক মর্যাদা উপেক্ষিত ছিল বলে অঞ্চল, ভাষা, কৃষ্টি নির্বিশেষে নির্যাতিত মানুষ নতুন পরিচয়ের জন্য একতাবদ্ধ হয়েছিল। সেদিনের ঐক্য ছিল নিপীড়িতের মধ্যে ঐক্য।
খোলসটা ছিল ধর্মের, কিন্তু ভেতরটা ছিল বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ঐক্য। নব্য শাসক এটা বুঝতে না পেরে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অতি-উৎসাহী প্রকল্প হাতে নিয়ে নিজেরা অত্যাচারীর আসন গ্রহণ করেন। ফলাফল সেই অনুমিত ঐক্যে ফাটল, যা তাদের জন্য ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা বয়ে নিয়ে এসেছিল ১৯৫২ সালে এবং পরবর্তী সময়ে।
গভীরভাবে দেখলে বুঝা যায়, ধর্মীয় অনুশাসনের অনুগামী জীবনচর্চার সঙ্গে ভাষার অধিকারের জন্য সংগ্রামের কোনো সংঘাত নেই। সেই উপলব্ধি থেকে বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধীদল প্রথমবারের মতো এবারে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটা অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। শ্রদ্ধা জানানোর রীতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু সকল নাগরিকের অনুভূতিকে সম্মান জানানোর জন্য স্থান একটাই হতে বাধা কোথায়? ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব হৃদয়ঙ্গম করে এই সচেতনতার প্রতি সকল প্রজন্মের নাগরিককে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।
ভাষার আদর্শিক ভাবানুভূতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষার ব্যবহারিক উন্নয়ন কাজটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটা সর্বজনীন প্রমিত বাংলার ব্যবহারে সক্ষম জনগোষ্ঠীর হার বাড়ানোর মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মাধ্যম সম্পূর্ণরূপে বাংলা হতে এখনো যেসব অন্তরায় আছে, তা দূরীভূত হওয়া প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে পাঠ্যবই বাংলায় রচনার জন্য বিদগ্ধজনকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রমিত বাংলার ব্যবহারের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সমূহের একটা ভালো ভূমিকা থাকতে পারে। দেশের আটটি বিভাগ পর্যায়ে বাংলা একাডেমি একটি গবেষণা চালিয়ে দেখতে পারে যে, কোন বিভাগে শিক্ষকদের কত ভাগ প্রমিত বাংলার উচ্চারণ-রীতি অনুযায়ী পাঠদানে সক্ষম এবং এ বিষয়ে কী করণীয় তার সুপারিশ দিতে পারে ।
লেখক: সাবেক সিভিল সার্ভেন্ট ও প্রবন্ধকার
