প্রস্তাবিত ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ। ব্যাংক খাতে সুশাসন, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে রেখে এই উদ্বেগ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে তুলে ধরা হয়।
সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সম্পাদক পরিষদের একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে নিউ এজ সম্পাদক ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ, ব্যাংক সংস্কারের ধীরগতি, আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কেও মতবিনিময় হয়েছে।
নূরুল কবীর বলেন, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর সম্পাদক পরিষদ গুরুত্বারোপ করেছে। কোনো ব্যাংক সংকটে পড়লে আমানতকারীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়। তিনি আরও জানান, বৈঠকে গভর্নর ব্যাংক খাত সংস্কারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে গভর্নর আশ্বাস দেন।
আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ধীরগতি, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন দিকও উঠে আসে।
বৈঠক শেষে নূরুল কবীর বলেন, দেশের আর্থিক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর এবং সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী এবং দৈনিক আগামীর সময় সম্পাদক মোস্তফা মামুন। এ সময় গভর্নর মহোদয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারা হলো ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬’-এর একটি অত্যন্ত বিতর্কিত বিধান, যার মাধ্যমে একীভূত হওয়া বা রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় যাওয়া দুর্বল ব্যাংকের সাবেক শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে আবারও ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার আইনি সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে করে ব্যাংক খাত লুটের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরকে আবারও মালিকানায় নিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সম্পাদকদের যা জানালেন গভর্নর: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ হ্রাস, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
গভর্নর জানান, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে কিছু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) উন্নয়ন ও সমন্বয় শেষ হলে পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অর্থঋণ আদালত আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান গভর্নর। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আদায়-অযোগ্য ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থপাচার ও চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার সমমূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে বৈঠকে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, এসব সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বৃহৎ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে। এর আওতায় ডিজিটাল ন্যানো-লোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ক্রেডিট ব্যুরো অনুমোদন এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডেন্টিটি, ওয়ান ওয়ালেট” ধারণার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা হবে। একই সঙ্গে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, যা ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেনকে আরও সহজ করবে।
বিদেশে চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন সাপেক্ষে দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান গভর্নর। এ ছাড়া ইউপিএএস ব্যবস্থায় বিল ডিসকাউন্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সুদহার কমানো হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় কমবে এবং পণ্যের দাম হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের নেতারা ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক মতামত তুলে ধরেন। উভয় পক্ষ দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

SHINGRAPUR
১ মাস আগেবিগত সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং ব্যাপক অর্থপাচারের কারণে পুরো আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শিল্প খাতে চরম মন্দার কারণে নতুন ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমে এসেছে, যা বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
প্রধান খাতগুলোতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না, উল্টো বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে পোশাক ও ব্যাংক খাতে চলমান অস্থিরতা এবং দ্রুত কার্যকরী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।