মমতার দলও গেল

বিদ্রোহীদেরই তৃণমূল কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি স্পিকারের

মমতার দলও গেল

ফন্ট সাইজ:

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা নেতৃত্বের দিকে আঙ্গুল তুলেছিলেন। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সকলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মমতার ডাকা বিভিন্ন বৈঠকে। তারপর থেকেই দলের অন্দরে পদত্যাগের ঘটনা ঘটতে থাকে। বুধবার বিদ্রোহী ৫৯ জনের সই সংবলিত
চিঠি বিধানসভার স্পিকার গ্রহণ করার পরই বিভাজনের ছবিটি স্পষ্ট হয়েছে। স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন অংশকে তৃণমূল কংগ্রেস পরিষদীয় দলের স্বীকৃতি দিয়েছেন। এ অবস্থায় মমতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল তৃণমূল কংগ্রেস। এক কথায় বিধানসভায় মমতার দলও গেল।

এদিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে দলের সমস্ত কমিটি এবং সহযোগী সংগঠনগুলো ভেঙে দিয়েছে। সমাজমাধ্যমে জানানো হয়েছে, ‘দল প্রতিটি স্তরে একটি ব্যাপক আত্মসমীক্ষা, কার্যাবলী পর্যালোচনা এবং সাংগঠনিক মূল্যায়ন করবে। এই পর্যালোচনার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল সংগঠন এবং সমস্ত সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে যথাসময়ে তা ঘোষণা করা হবে।’

গতকাল বিধানসভার স্পিকার বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি দেয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিভাজনে সীলমোহর পড়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত ৮০ বিধায়কের মধ্যে ৬০ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বলেন, আপাতত ৫৮ জন। আরও দু’জন আছেন। তারা এখন রাজ্যের বাইরে আছেন। তাদের সম্মতি রয়েছে। তাদের সমর্থন এলে এই সংখ্যা ৬০ হবে। তবে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরামর্শদাতা হওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাদের দূর-দূরান্ত সম্পর্ক নেই বলেও ঘোষণা করা হয়েছে।

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের একটি চিঠিকে ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বিধানসভায় মমতার নির্দেশে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে দলনেতা করে জমা দেয়া চিঠিতে অনেকের জাল সই রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠার পর পুলিশকে দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বিধানসভার সচিবালয়। জাল সইয়ের অভিযোগ করার জন্য দল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করে।

এর পরেই তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা ও নির্বাচিত বিধায়ক নীতিহীনতার প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এড়িয়ে যেতে শুরু করেন। সবশেষ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মমতার বাড়িতে ডাকা পরিষদীয় দলের বৈঠকে ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। আর মঙ্গলবার ধর্মতলায় তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন মাত্র ৮ জন বিধায়ক। সাংসদদের মধ্যে ছিলেন মাত্র ৪ জন। এরই মধ্যে বিদ্রোহী বিধায়করা কয়েকদিন ধরে বৈঠক করে পরিষদীয় দলে ভাঙনের রাস্তা নিশ্চিত করে দিয়েছিলেন।

বুধবার ঋতব্রত জানিয়েছেন, বিধানসভায় চিফ হুইপ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে। ডেপুটি লিডার করা হয়েছে চার জনকে- জাভেদ আহমেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, শিউলি সাহা এবং সন্দীপন সাহা। তাদের সমর্থনের চিঠি বিধানসভার স্পিকারকে দিয়ে দেয়া হয়েছে।

নবনির্বাচিত বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত ঘোষণা করেছেন, আমরা দায়িত্বশীল, সদর্থক ভূমিকা পালন করবো। সরকারের চোখে চোখ রেখে লড়াই হবে। তাদের সদর্থক পদক্ষেপের প্রশংসাও করবো। ঋতব্রত আরও বলেন, বাংলার মাটিতে মানুষ রায় দিয়েছেন আমাদের বিরোধী আসনের জন্য। সেটা মেনে নিতে হবে। আমি ‘বস্‌’ নই। আমি বসিংয়ে বিশ্বাসী নই। আমি আমরায় বিশ্বাস করি। সব সিদ্ধান্ত আলোচনা করে নেবো আমরা।

এর আগে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। চিফ হুইপ করা হয়েছিল ফিরহাদ হাকিমকে। তবে তাদের মানতে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ বিধায়ক। এই আবহে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের ওপর থেকে মমতার নিয়ন্ত্রণ যে চলে গেছে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।

বিধায়ক সন্দীপন সাহা দাবি করেছেন, দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক তাদের সঙ্গে রয়েছেন। বিধায়কদের অনেকে সরাসরি মুখ খুলেছেন। অনেকে আবার বিষয়টিকে এড়িয়েও গিয়েছেন। তৃণমূল কার দখলে যাবে, এ নিয়ে শুরু হয়েছিল টানাপড়েন। বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে অবিলম্বে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেয়ার দাবি জানিয়ে মঙ্গলবার ফের বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে স্পিকার অভিষেকের চিঠি গ্রহণ করেন নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থাকে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ও একনাথ সিন্ধের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি এনসিপি’র ভাঙনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইতিমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছে কোনটি হবে আসল তৃণমূল কংগ্রেস।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন