সিলেটে এমেক্সের ইমন উদ্দিন। বহুল পরিচিত একটি নাম। নামটি গত এক মাস ধরে সিলেটে ভাসছে। নেট দুনিয়াও তাকে নিয়ে সরব। কয়েকশ’ গ্রাহক প্রতারিত হয়েছেন ইমনের কাছে। কানাডা ও ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণরা তার কাছে টাকা দিয়েছিলেন। কেউ দেন এক লাখ, কেউ দুই লাখ, আবার কেউ কেউ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। সব টাকা মেরে দিয়ে ইমন হয়েছিল লাপাত্তা। সেই ইমনকে মঙ্গলবার আদালতপাড়ায় পেয়ে যান ভুক্তভোগীরা। তাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
এমেক্স এসোসিয়েট সিলেটের উপশহরে সি ব্লকের একটি মানব পাচার অবৈধ কোম্পানি। এমেক্সের কর্ণধার ইমন উপশহর এলাকাতেই খুলেন তার প্রতারণার অফিস। লোভনীয় অফার দেন কানাডা ও ইউরোপ যাওয়ার। এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকায় কানাডা যাওয়ার অফার করেন। কয়েক মাস আগে দেয়া তার এই অফারে এমেক্সে হুমড়ি খেয়ে পড়েন তরুণরা। কানাডা যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর এসব তরুণদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয় নগদ টাকাও। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন- কয়েকশ’ তরুণের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা আদায় করা হয়। তবে তাদের ভিসা দেয়া হয়নি। কেবল ইমনই নয় তার সঙ্গে আরও কয়েকজন রয়েছেন। তারা মিলে ওই টাকা আত্মসাৎ করে।
একপর্যায়ে টাকা দেয়ার পর যখন ভিসা পাওয়া যাচ্ছিলো না তখন ধীরে ধীরে ইমন ও তার সহযোগীদের প্রতারণার বিষয়টি প্রকাশ পায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রতারণার শিকার হওয়া তরুণরা। এ সময় তারা এমেক্সে গিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে গত ১৯শে মে এমেক্সের কার্যালয় বন্ধ করে পালায় ইমন ও তার সহযোগীরা। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা পেজও বন্ধ করে দেয়।
ভুক্তভোগী তরুণরা জানিয়েছে- প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো ও ভুয়া ভিসা প্রাপ্তির ভিডিওচিত্র প্রচার করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতো। সহজ শর্তে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে। ইমন ও তার সহযোগীরা বিদেশ গমনেচ্ছুক প্রায় ৭০০ জন তরুণ-যুবকের কাছ থেকে জনপ্রতি ১ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে। এতে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় এমেক্স এসোসিয়েটের স্বত্বাধিকারী ইমন উদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শাহপরান থানায় ৪টি মামলা করা হয়। তারা সিলেট নগরেও এমেক্সের প্রতারণার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখান। নানা জায়গাও দেন অভিযোগ। গ্রেপ্তার দাবি করেন ইমন ও তার সহযোগীদের।
প্রতারণার শিকার হওয়া কয়েকজন যুবক জানিয়েছেন- প্রথমে শাহপরান থানার ওসি ফেরদৌস আহমদ বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখালেও রহস্যজনক কারণে পরবর্তীতে তিনি নীরব হয়ে পড়েন। আসামিরা উপশহর ও আশপাশ এলাকায় থাকলেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। পুলিশের এই নাটকীয়তায় ক্ষোভ বাড়ে তরুণদের। ঈদের সময় তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন সিলেটে অবস্থান করা শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে। এ সময় তারা এমেক্স এসোসিয়েটের বিরুদ্ধে নালিশও করেন।
বিষয়টি শোনার পর মন্ত্রী তাৎক্ষণিক বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। মন্ত্রীর ফোনে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে সক্রিয় হলেও ধরা পড়ছিলো না ইমন। মঙ্গলবার দুপুরে আদালত এলাকায় যায় ইমন ও সহযোগীরা। আদালত প্রাঙ্গণেই তাদের দেখতে পান কয়েকজন ভুক্তভোগী। একপর্যায়ে তারা ইমনকে আটক করে পুলিশের সোপর্দ করেন। এদিকে ইমন গ্রেপ্তারের খবরে প্রথমে আদালত প্রাঙ্গণ পরে থানার সামনে ভিড় করেন ভুক্তভোগীরা। তারা জানিয়েছেন- ইমন নিজেকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচিত দিতো। তার সঙ্গে কয়েকজন নেতা ছিলেনও ভুক্তভোগীদের জানাতো।
এদিকে ইমনকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার দুপুরে শাহপরান থানায় দায়ের করা চারটি মামলায় আদালতে সোপর্দ করেছে পুলিশ। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এসিডি (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ইমনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
