দরজায় নেই কোনো দারোয়ান। নেই কড়া নিরাপত্তার বলয় কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষার আনুষ্ঠানিকতা। যে কেউ সহজেই প্রবেশ করতে পারেন ভেতরে। চারদিকে সাধারণ মানুষের বসার জন্য সাজানো চেয়ার। কক্ষে ঢুকতেই হাসিমুখে অভ্যর্থনা- বসেন, কী সমস্যা বলুন। এ যেন কোনো সরকারি কর্মকর্তার দপ্তর নয়, বরং মানুষের সমস্যার সমাধান খুঁজে দেওয়ার একটি উন্মুক্ত আশ্রয়স্থল। পাবনার চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরীর চেম্বারে আধাঘণ্টা অবস্থান করেই দেখা গেল ব্যতিক্রমী এই চিত্র।
এই স্বল্প সময়েই প্রায় ১৫ জন মানুষের বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনলেন তিনি। কারও জমি-সংক্রান্ত জটিলতা, কারও সামাজিক সমস্যা, কারও আবার সরকারি সহায়তা পাওয়ার আবেদন। ধৈর্য সহকারে সবার কথা শুনলেন, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে বিদায় করলেন।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে চাটমোহরে যোগদানের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০০-২৫০ জন সাধারণ মানুষের জন্য একইভাবে তার দপ্তরের দরজা খোলা থাকে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নিজেকে একজন মানবিক, জনবান্ধব ও কর্মমুখী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
চাটমোহরের উন্নয়ন, শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে তার ভূমিকা ইতিমধ্যেই মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০২৬ সালে পাবনা জেলার মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে চাটমোহর উপজেলা। এ সাফল্যের পেছনেও রয়েছে তার নিবিড় তদারকি ও উৎসাহ। প্রতিবছর উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী, পাবলিক পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী এবং দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা ও স্বীকৃতি দেন তিনি। শিক্ষা যে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার- তা তিনি শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ করছেন। তবে তার কর্মকাণ্ড শুধু অফিসকেন্দ্রিক নয়। দিনের সরকারি কাজ শেষে সন্ধ্যা নামলেই তিনি বেরিয়ে পড়েন গ্রামের পথে। মানুষের দুয়ারে গিয়ে তাদের কথা শোনেন, খোঁজ নেন সমস্যার, খুঁজে বের করেন সমাধানের পথ।
সরকারের বিভিন্ন সহায়তা যাতে প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছে, সে চেষ্টা চালিয়ে যান নিরলসভাবে। গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সহায়তা, দরিদ্র ও দুরারোগ্য রোগীদের চিকিৎসা অনুদান, মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল প্রদান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ- সব ক্ষেত্রেই রয়েছে তার সক্রিয় উপস্থিতি। সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন সমানভাবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে নিয়মিত কাজ করছেন স্থানীয় জনগণের সঙ্গে। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আপ্যায়ন ছাড়া ফিরে এসেছেন- এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। এককাপ চা আর আন্তরিক কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে এনেছেন অনেকটাই।
গাইবান্ধা জেলার সন্তান মুসা নাসের চৌধুরী অল্প সময়ের মধ্যেই চাটমোহরের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং একজন আপন মানুষ, একজন সহমর্মী অভিভাবক এবং জনগণের সেবক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। বর্তমান সময়ে যখন সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনকে অনেক সময় দূরের কোনো প্রতিষ্ঠান বলে মনে হয়, তখন চাটমোহরের এই ইউএনও প্রমাণ করেছেন- ইচ্ছা থাকলে একটি সরকারি অফিসও মানুষের ভরসার ঠিকানা হতে পারে।
