বিটিভি’র মহাপরিচালক কি দায় এড়াতে পারেন?

বিটিভি’র মহাপরিচালক কি দায় এড়াতে পারেন?

ফন্ট সাইজ:

এখানে আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই আর্টিকেলটি লিখতে বসে আমি বিটিভি কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বক্তব্য জানার প্রয়োজন অনুভব করি। সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই আমি একাধিকবার ফোন করি বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান, বিটিভি’র মহাপরিচালক, তথ্য সচিব এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কারও কাছ থেকেই কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা কি কেবল ব্যস্ততার কারণে, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি? রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে যদি দায়িত্বশীলরা জবাবদিহি না করেন, তাহলে জনগণ উত্তর পাবে কোথায়? সবচেয়ে বড় কথা হলো, শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী।

নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন। সরকারের ব্যয় সংকোচন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানে সরকারের মাত্র একশ’ দিন পেরোতেই বিটিভি’র মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন ভয়াবহ অনিয়ম প্রকাশ্যে আসা সমাজে কী বার্তা দিচ্ছে? যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর জন্য ব্যক্তিগত আচরণেও সরলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। পোশাক-আশাক, প্রটোকল, সরকারি ব্যয় সবক্ষেত্রেই সংযম প্রদর্শন করছেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের লাঞ্চ ভাতা ৮০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৫০ টাকায় নামিয়ে এনেছেন। অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল কমিয়েছেন।

এমনকি ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য নিজেই মাঠে নেমেছেন। অর্থাৎ একজন প্রধানমন্ত্রী প্রাণপণ চেষ্টা করছেন জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য, একটি সুশাসিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য, জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু সেই সরকারের অধীনেই যদি বিটিভি’র মতো প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; সেটি সরাসরি সরকারের নৈতিক অবস্থানকে আঘাত করে। আরও স্পষ্ট করে বললে, বিটিভি’র এই ঘটনা সরকারের সমস্ত ইতিবাচক প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এখানে বিটিভি’র মহাপরিচালক কি দায় এড়াতে পারেন? তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ঈদের এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দাপ্তরিকভাবে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে তিনি কি সত্যিই দায়মুক্ত? যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম হয়, আর প্রধান কর্মকর্তা বলেন তিনি কিছুই জানেন না, তাহলে সেটি আরও ভয়ঙ্কর সংকেত। কারণ এতে বোঝা যায়, হয় তিনি সম্পূর্ণ অযোগ্য, নয়তো তিনি দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশের মানুষ আজ দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশাহারা। বেকার তরুণ চাকরি পাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে ওষুধের সংকট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত
দুরবস্থা। অথচ সেই দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে কয়েকজন ব্যক্তি মিলে কোটি কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা করছেন। এটি কেবল দুর্নীতি নয়; এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নির্মম উপহাস। সরকার যদি সত্যিই পরিবর্তনের বার্তা দিতে চায়, তাহলে বিটিভি’র এই কেলেঙ্কারি হতে পারে একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র।

এজন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত। শুধু বিভাগীয় তদন্ত নয়; আর্থিক নিরীক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলাও হওয়া উচিত। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের দ্রুত অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপই জনগণের কাছে সরকারের প্রকৃত চরিত্র তুলে ধরে। যদি এই ঘটনারও শেষ পরিণতি হয় আরেকটি ফাইলবন্দি তদন্ত, তাহলে জনগণের মনে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা যাবে- সরকার বদলায়, মুখ বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় লুটপাটের সংস্কৃতি বদলায় না। আর সেটিই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা।

কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় হয়। সুতরাং এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দ্রুত, স্বচ্ছ এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে জনগণের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। বিটিভি যদি আবার জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হতে হবে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যম একসময় শুধু লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, বরং দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হবে। যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: ধযধনরনযসব@মসধরষ.পড়স
শেষ পর্ব

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন