বিদেশ সফরের ফাইলে প্রধানমন্ত্রীর লাল দাগ: ‘ডোবার পাশেই সমাধান’

বিদেশ সফরের ফাইলে প্রধানমন্ত্রীর লাল দাগ: ‘ডোবার পাশেই সমাধান’

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর। বছরের পর বছর ধরে আমরা এমন সব সরকারি সফরের খবর দেখে এসেছি, যা নিয়ে জনমনে বিস্ময়ের পাশাপাশি ক্ষোভও জন্মেছে। কখনও পুকুর খনন শেখার জন্য ইউরোপ সফর, কখনও টয়লেট ব্যবস্থাপনা দেখতে বিদেশ যাত্রা, আবার কখনও চরাঞ্চল পর্যবেক্ষণের জন্য হাজার হাজার মাইল দূরের দেশে সফর, এসব ঘটনা নাগরিকদের কাছে প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতার প্রতীক হিসেবেই বেশি পরিচিত হয়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও পাঁচ কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা সফরের একটি প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। উদ্দেশ্য ছিল মশক নিধনের উদ্ভাবনী কার্যক্রম পরিদর্শন। সফরের ব্যয় বহনের কথা ছিল একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সরাসরি সরকারি অর্থ ব্যয় হতো না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করে প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল, “মশক নিধন শেখা বা দেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় যাওয়ার দরকার নেই। দেশেই সন্ধ্যার পর যে কোনো ডোবার পাশে দুই/তিন ঘণ্টা অবস্থান করলেই মশক নিধনের অনেক উদ্ভাবনী পদ্ধতি বের করা সম্ভব হবে।”

বক্তব্যটি নিছক রসিকতা নয়; এর মধ্যে একটি প্রশাসনিক বার্তা লুকিয়ে আছে। সেই বার্তা হলো, সমস্যার সমাধান খুঁজতে সব সময় বিদেশমুখী হওয়া জরুরি নয়। বাস্তবতা বোঝার জন্য অনেক সময় মাঠে নামাই যথেষ্ট।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও মশাবাহিত রোগ এখন আর মৌসুমি সংকট নয়; এটি একটি স্থায়ী নগর সমস্যা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী—প্রায় সব বড় শহরেই মশার উপদ্রব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো, এই সমস্যার সমাধান কি সত্যিই বিদেশ সফরের ওপর নির্ভরশীল? নাকি এর মূল চাবিকাঠি রয়েছে স্থানীয় বাস্তবতা বোঝা, সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মধ্যে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফল মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অবশ্যই রয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা ভারতের কিছু শহরে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ডেটা বিশ্লেষণ এবং কমিউনিটি অংশগ্রহণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শেখার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু শেখার জন্য সব সময় শারীরিকভাবে বিদেশে যাওয়াই একমাত্র পথ নয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ, অনলাইন কর্মশালা, বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ কিংবা যৌথ গবেষণার সুযোগ অনেক বিস্তৃত হয়েছে।

ভারতের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। দিল্লি ও মুম্বাইয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনকে সম্পৃক্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ সফরের চেয়ে স্থানীয় তথ্য সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেও নগর ব্যবস্থাপনায় “ফিল্ড-ফার্স্ট” বা মাঠভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কর্মকর্তাদের বড় অংশ অফিসকেন্দ্রিক নয়, বরং সরাসরি সমস্যাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি আসলে অর্থ ব্যয়ের নয়; প্রশ্নটি মানসিকতার। এই সফরের খরচ সরকার দিত না—এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশাসনের সমস্যা সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি। যদি কোনো সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব হয়, তবে বিদেশ সফরকে প্রথম বিকল্প হিসেবে ভাবার যৌক্তিকতা কতটুকু?

অন্যদিকে, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সব সফরকে এককভাবে অপ্রয়োজনীয় বলাও সঠিক হবে না। অনেক সময় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশ সফর কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশ্বের উন্নত নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা গণপরিবহন ব্যবস্থার বহু উদাহরণ বিদেশ থেকে শেখার মাধ্যমেই বিভিন্ন দেশ গ্রহণ করেছে। ফলে কেবল সফর বাতিল করাই সমাধান নয়; বরং কোন সফর সত্যিই প্রয়োজনীয় এবং কোনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা—সেই পার্থক্য নির্ধারণ করাই মূল বিষয়।

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের ইতিবাচক দিক হলো, এটি প্রশাসনের কাছে একটি প্রতীকী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সেই বার্তা হচ্ছে, কাগুজে প্রকল্প, দাপ্তরিক রুটিন কিংবা বিদেশ সফরের তালিকা দিয়ে নয়, বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান দিয়েই সাফল্য পরিমাপ করা হবে। জনসাধারণের একটি বড় অংশও সম্ভবত এই কারণেই সিদ্ধান্তটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকরা দেখতে চান, কর্মকর্তারা সমস্যার উৎসে গিয়ে সমাধান খুঁজছেন; বিদেশ সফরের প্রতিবেদনে নয়, বাস্তব ফলাফলে পরিবর্তন আনছেন।

মশা নিধন শেখার জন্য ফ্লোরিডা সফর বাতিলের ঘটনাটি তাই কেবল একটি সফর প্রত্যাখ্যানের গল্প নয়। এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি, দায়িত্ববোধ এবং বাস্তবমুখী শাসনব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ। শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটিই—মশা কমেছে কি না, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না। কারণ নাগরিকের বিচার সফরের গন্তব্য দিয়ে নয়, ফলাফলের ভিত্তিতেই হয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

email: [email protected]


SM Rafiqul Islam

১ মাস আগে

যথাসময়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। দেশ এখন যে যায়গায় অবস্থান করছে, তাতে কিছু বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প নেই। সবার আগে দেশ তারপর অন্য কথা। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন