বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো শুধু অতীতের ঘটনা নয়; বরং বর্তমান রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে বারবার ফিরে আসে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধের নেতৃত্ব, ভূমিকা ও অবদান নিয়ে বিতর্ক তার অন্যতম। সম্প্রতি ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের একটি ফেসবুক পোস্ট আবারও সেটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতীয় হাইকমিশন তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে যে বার্তা প্রকাশ করেছে, সেখানে ১৯৭১ সালের মার্চে জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে প্রচারিত সেই বিখ্যাত বেতার ভাষণের কথা স্মরণ করা হয়েছে। পোস্টে বলা হয়েছে, তার সেই ভাষণ জনগণকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং জাতীয় মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল। একইসঙ্গে ভারত উল্লেখ করেছে যে, অতীতের মতো আজও তারা বাংলাদেশের জনগণের পাশে রয়েছে, অভিন্ন আত্মত্যাগের গৌরবগাথা এবং দুই দেশের জনগণের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির যৌথ যাত্রায়।
একটি কূটনৈতিক মিশনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই বার্তা হয়তো অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর তাৎপর্য অনেক গভীর। কারণ, এটি কেবল একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস, সেই ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দু’টি প্রধান রাজনৈতিক বয়ান বিদ্যমান। একদিকে রয়েছে এমন একটি বয়ান, যেখানে শেখ মুজিবর রহমান-এর নেতৃত্বকে স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি রাজনৈতিক ধারা, যা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর ভূমিকা, বিশেষ করে তার ঐতিহাসিক বেতার ঘোষণাকে মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণাদায়ী ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করে।
বাস্তবতা হলো, ইতিহাস কখনো একরৈখিক নয়। একটি জাতির জন্মের মতো বিশাল ঘটনার পেছনে বহু ব্যক্তি, বহু প্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের অবদান থাকে। মুক্তিযুদ্ধও তার ব্যতিক্রম নয়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব, তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সামরিক ও বেসামরিক প্রতিরোধযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের সম্মিলিত ফল ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় হাইকমিশনের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, ১৯৭১ সালে ভারত কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ছিল না; তারা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অংশীদার। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে সামরিক সহায়তা পর্যন্ত ভারতের অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ। ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কেবল কূটনৈতিক ভাষ্য নয়; বরং তা ঐতিহাসিক গুরুত্বও বহন করে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, ভারতীয় হাইকমিশনের পোস্টে জিয়াউর রহমানের সেই বেতার ভাষণকে জনগণকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি এমন এক স্বীকৃতি, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখার ইঙ্গিত দেয়।
অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ বিদ্যমান। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ব্যাখ্যাও অনেক সময় পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো কোনো ব্যক্তির অবদান বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, কখনো বা অন্য কারও ভূমিকা আড়ালে চলে গেছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের ইতিহাস যদি দলীয় অবস্থানের বন্দি হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
ভারতের এই বার্তা হয়তো সেই জায়গায় একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করছে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমষ্টিগত সংগ্রাম। সেখানে একজনের অবদান স্বীকার করতে গিয়ে অন্যজনের অবদান অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
এই ঘটনাকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেও দেখা দরকার। গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি একটি বার্তা যে, ভারত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে বুঝতে চায় এবং বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসকে একটি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর মধ্যে দেখতে আগ্রহী।
আরেকটি বিষয়ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্যও প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। ফলে জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করার মধ্যে কূটনৈতিক বাস্তবতার একটি মাত্রাও অস্বীকার করা যায় না।
তবে এটিকে কেবল কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। কারণ, ইতিহাসের প্রশ্নে রাজনৈতিক পরিপক্বতা হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিভিন্ন অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হয়। পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই আজ সেই পথে এগিয়েছে। তারা ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে দেখার। এতে কারও মর্যাদা কমবে না; বরং ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হবে। জাতি হিসেবে আমাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। কারণ, একটি পরিণত জাতি তার ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়কে ভয় পায় না; বরং সেগুলোকে গ্রহণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।
ভারতীয় হাইকমিশনের এই বার্তা হয়তো নতুন কোনো আলোচনার জন্ম দেবে। কেউ এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখবেন, কেউ সমালোচনা করবেন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট এই বার্তা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ১৯৭১ কেবল অতীতের একটি বছর নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার ভিত্তি, জাতীয় চেতনার উৎস এবং রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড।
আর সেই কারণেই ১৯৭১-এর ইতিহাস নিয়ে প্রতিটি মন্তব্য, প্রতিটি স্বীকৃতি এবং প্রতিটি ব্যাখ্যা আজও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই যে জাতি তার অতীতকে যত বিস্তৃতভাবে বুঝতে পারে, তার ভবিষ্যৎ তত বেশি সুদৃঢ় হয়। ভারতের এই সাম্প্রতিক স্বীকৃতি সেই উপলব্ধিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই সুযোগে ইতিহাসকে দলীয় বিতর্কের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে রূপান্তরিত করতে পারবে? উত্তরটি ভবিষ্যতের হাতেই রয়ে গেল।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]
