উপাচার্য নিয়োগে বিতর্ক

উপাচার্য নিয়োগে বিতর্ক

ফন্ট সাইজ:

ক্ষমতার রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন কাজ সম্ভবত নিজের ঘরের ভুলকে চিহ্নিত করা। বিরোধী পক্ষের সমালোচনা করা সহজ, কারণ সেখানে রাজনৈতিক অবস্থান আগে থেকেই স্পষ্ট থাকে। কিন্তু যে শক্তিকে সমর্থন করা হয়েছে, যার আদর্শিক অবস্থানের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে আস্থা রাখা হয়েছে, সেই শক্তির ভেতরের বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলা মানসিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি কঠিন। কারণ এতে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকে, সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এমনকি কখনো কখনো ব্যক্তি আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়। তারপরও দায়িত্ববোধের প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একজন সচেতন নাগরিক, একজন শিক্ষক কিংবা একজন রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধ মানুষের কাজ কেবল প্রশংসা করা নয়; প্রয়োজনে সতর্ক করা, ভুল ধরিয়ে দেয়া এবং ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত তুলে ধরাও তার নৈতিক কর্তব্যের অংশ।

রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস বলে, বড় বিপর্যয় কখনো হঠাৎ তৈরি হয় না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্যুতি, ছোট ছোট ভুল সিদ্ধান্ত, সীমিত কিছু অনিয়ম এবং কিছু আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ আপস ধীরে ধীরে গভীর সংকটের ভিত্তি তৈরি করে। বহু গবেষণায় দেখা গেছে, একটি রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় সাধারণত প্রশাসনিক নিয়োগের মধ্যদিয়েই শুরু হয়। যখন যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য, সততার পরিবর্তে তোষামোদ এবং দক্ষতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর তার প্রভাব পড়ে। প্রথমদিকে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও পরে সেটি সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। জনগণের আস্থা হারানোর প্রক্রিয়াও একইভাবে ধীরগতির। মানুষ প্রথমে অসন্তুষ্ট হয়, পরে হতাশ হয়, তারপর একসময় পুরো ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তাই একটি দায়িত্ববান সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত শুরু থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা, ন্যায়বোধ এবং যোগ্যতার সমন্বয় ঘটানো।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রায়ই একটি বিশেষ উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হন। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তার ভূমিকার বাইরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাকে তুলনামূলকভাবে দৃঢ়চেতা নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বহু বিশ্লেষক স্বীকার করেন যে, তাকে ঘিরে কোনো নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তিনি যোগ্য লোকদের উপযুক্ত স্থানে দায়িত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেই সাধারণ ধারণা বিদ্যমান। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজ এলাকা বা আত্মীয়স্বজনকে অযাচিত সুযোগ সুবিধা দেয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে তেমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বর্তমান সময়ে যখন প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ নিয়ে পক্ষপাত, গ্রুপিং এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের অভিযোগ উঠছে, তখন অনেকেই অতীতের এই উদাহরণটির সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করছেন।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আজ এমন এক সংকটময় সময় পার করছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয় একটি জাতির মেধা উৎপাদনের কেন্দ্র। এখান থেকেই গবেষক, বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি হয়। অথচ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এখনো অনেক পিছিয়ে। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান অত্যন্ত হতাশাজনক। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, পাকিস্তান কিংবা মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রেই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।

স্কোপাস এবং সায়মাগো ডাটাবেজের তথ্য অনুযায়ী, গবেষণা প্রকাশনা এবং সাইটেশনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বাংলাদেশের ব্যয় জিডিপির এক শতাংশেরও কম। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলো যেখানে জিডিপির দুই থেকে চার শতাংশ পর্যন্ত গবেষণায় বিনিয়োগ করে, সেখানে বাংলাদেশে এই বিনিয়োগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা পরিবেশ শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

এই বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে গবেষণাবান্ধব, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় ব্যক্তিদের আসা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন সরকার প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি রাজনৈতিকভাবে স্বাভাবিক। প্রতিটি নতুন সরকারই নিজেদের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশাসনিক পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই পুনর্গঠনের ভিত্তি কী? সেখানে কি গবেষণা, যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং নৈতিক অবস্থান গুরুত্ব পাচ্ছে, নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক, তোষামোদ, এলাকাভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং সিন্ডিকেট রাজনীতি বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে?

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেন্দ্রিক কিছু সিদ্ধান্ত শিক্ষাঙ্গনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এখানে নেতৃত্বের প্রশ্ন কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, গবেষণাগত সক্ষমতা এবং নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন রাজনৈতিক নেতা কম শিক্ষিত হয়েও সফল হতে পারেন, কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্ষেত্রে গবেষণা, একাডেমিক নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক মানের অবদান অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল নথিপত্রে স্বাক্ষর করার জায়গা নয়; এটি জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র।

বাংলাদেশের শিক্ষক রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। জাতীয়তাবাদী আদর্শের শিক্ষকদেরও একাধিক সংগঠন রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তন আসবে, সেটি স্বাভাবিকভাবেই অনুমিত ছিল। কিন্তু যেভাবে উপাচার্য নিয়োগের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং যেভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে, তা হতাশার জন্ম দিয়েছে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যদের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা সচিবকে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করার বিষয়টি অনেকেই আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠী সরকারের উচ্চ মহলকে প্রভাবিত করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নির্দিষ্ট ফ্যাকাল্টির শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগে প্রাধান্য দেয়া নিয়ে। বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের নিয়োগকে অনেকেই অযৌক্তিক মনে করছেন এবং সুস্পষ্ট একটি সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড খুঁজে পাচ্ছেন।

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো অনুষদের বিরুদ্ধে নয়। ব্যবসায় শিক্ষা বা অন্য কোনো অনুষদ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিকে বসানো, যার গবেষণা ও একাডেমিক অবদান প্রায় নেই বললেই চলে এবং যা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়, তা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দেয়। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কেবল প্রশাসক নন; তিনি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ভিশনের প্রতীক।

আরও উদ্বেগজনক হলো, জ্যেষ্ঠতা ও গবেষণাগত সক্ষমতাকে উপেক্ষা করার অভিযোগ। এমন উদাহরণও রয়েছে যে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ জনের বেশি গ্রেড-১ অধ্যাপক থাকা সত্ত্বেও তুলনামূলকভাবে কম জ্যেষ্ঠ গ্রেড-২ অধ্যাপককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গবেষণার ক্ষেত্রেও তার অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পুরো কর্মজীবনে মাত্র একটি Scopus indexed গবেষণাপত্র থাকা ব্যক্তিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসছেন। গবেষণার মানদণ্ডে দুই শতাধিক অধ্যাপকের মধ্যে যার অবস্থান নিচের সারির ১০-২০ জনের মধ্যে, তাকে যদি অন্য কোনো বিবেচনায় নেতৃত্বের পদে আনা হয়, তবে তা শিক্ষক সমাজের কাছে যোগ্যতা ও মেধার মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে এবং হতাশার বার্তা বহন করতে পারে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অন্যান্য সূচক বাদ দিলেও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কোনো উপাচার্যের Google Scholar profile পর্যন্ত নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। আজকের বিশ্বে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের একাডেমিক উপস্থিতির অন্যতম মৌলিক পরিচয় হচ্ছে Google Scholar, Scopus ID অথবা Web of Science profile। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের আগে প্রার্থীর গবেষণা, সাইটেশন, h-index এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশদভাবে মূল্যায়ন করা হয়। সেখানে যদি একজন উপাচার্যেরই মৌলিক গবেষণা প্রোফাইল না থাকে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্কৃতি কতোটা এগোবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলশক্তি গবেষণা। আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা তৈরি করাই একজন শিক্ষকের বড় পরিচয়। সেখানে যদি গবেষণায় দুর্বল, আন্তর্জাতিকভাবে অপ্রতিষ্ঠিত কিংবা একাডেমিক ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা হয়, তাহলে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা অনুভব করেন যে পরিশ্রম, গবেষণা এবং সততার চেয়ে অন্য কিছু বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে।

এর ফলাফল হিসেবে শুরু হয় মেধাপাচার। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছে। এদের বড় একটি অংশ আর দেশে ফিরছে না। কারণ তারা বিদেশে গবেষণার স্বাধীনতা, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং একাডেমিক পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছে, যা দেশে অনুপস্থিত বলে মনে করছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি। কারণ একটি দেশ তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার সেরা মেধাগুলো দেশেই কাজ করার অনুপ্রেরণা পায়।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো প্লেজারিজম বা গবেষণা চৌর্যবৃত্তির প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তির পিএইচডি গবেষণায় ৫০ শতাংশের বেশি প্লেজারিজম থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হলে তা পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে। গবেষণা জগতে প্লেজারিজমকে বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। জার্মানির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী কার্ল থিওডর গুটেনবার্গ থেকে শুরু করে হাঙ্গেরির সাবেক প্রেসিডেন্ট পাল স্মিট পর্যন্ত বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব প্লেজারিজমের অভিযোগে ডিগ্রি হারিয়েছেন বা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সেখানে যদি এমন অভিযোগকে উপেক্ষা করে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে তরুণ গবেষকদের কাছে কী বার্তা যাবে?

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, উপাচার্য নিয়োগের সার্চ কমিটির এক সদস্য প্লেজারিজমভিত্তিক গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে । যদি এটি সত্য হয়, তাহলে তা স্বার্থের সংঘাতের স্পষ্ট উদাহরণ। উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় সামান্য ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। অথচ বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রশ্নকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়।

এই পরিস্থিতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্যদের এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা এলাকার পরিচয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা ব্যক্তিদের অতীত ও বর্তমান আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের বিভিন্ন উইং থেকে ক্রস ভেরিফাই তথ্য নেয়া প্রয়োজন বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি রাজনৈতিক নৈতিকতা এবং আদর্শিক সততার সঙ্গেও জড়িত।

কিন্তু সমস্যা কেবল গবেষণা বা যোগ্যতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে যে, ছাত্রজীবনে ভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা এবং সেখান থেকে সুবিধা গ্রহণ করা, কিংবা অতীতের কর্তৃত্ববাদী সময়ে প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করা- এমন কিছু ব্যক্তি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাচ্ছেন। যারা অতীতে আদর্শিক ঝুঁকি নেননি, শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা নৈতিক অবস্থানে দৃঢ ছিলেন না, তারাই এখন ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে গ্রহণযোগ্যতা কম থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তোষামোদের দক্ষতার কারণে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে গেছেন।

একবার ভাবা যাক, উপরে বর্ণিত গবেষণাগত দুর্বলতা, প্লেজারিজমের অভিযোগ এবং নানাবিধ বিতর্ক যদি কোনো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাহলে সেই নিয়োগ কতোটা উদ্বেগজনক ছিল, তা আর আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ এমন একটি পদে নিয়োগ কেবল একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার বিষয় নয়; এটি পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানদণ্ড, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে।

তোষামোদ বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতির পুরোনো ব্যাধি। ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু যখন এই সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে, তখন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে স্বাধীন চিন্তা, নৈতিক দৃঢতা এবং সত্য উচ্চারণের চর্চা হওয়ার কথা।

একটি নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। জনগণ পরিবর্তন চায় শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তারা প্রশাসনিক আচরণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নৈতিক মানদণ্ডেও পরিবর্তন দেখতে চায়। যদি নতুন সরকারও পুরোনো পথেই হাঁটে, তাহলে মানুষের প্রত্যাশা ভেঙে যাবে। আর যখন মানুষের প্রত্যাশা ভেঙে যায়, তখন রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

গঠনমূলক সমালোচনাকে তাই শত্রুতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং যারা সত্যিকারের শুভাকাংখী, তারাই ভুলগুলো নিয়ে সতর্ক করেন। কারণ ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আত্মতুষ্টি। যখন কেউ মনে করে তার সব সিদ্ধান্তই সঠিক, তখনই পতনের বীজ বপন হতে শুরু করে।

আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, সেগুলো কেবল কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়। এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান নিয়ে প্রশ্ন। সামষ্টিকভাবে এসব ছোট ছোট ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু সতর্কতার প্রয়োজন এখনই। কারণ ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, অনেক বিপর্যয় শুরু হয়েছিল এমন কিছু সিদ্ধান্ত দিয়ে, যেগুলো প্রথমদিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রফেসর ড. মোঃ ছিদ্দিকুল ইসলাম

১ মাস আগে

যথোপযুক্ত যুক্তি উপস্থাপন ও ইঙ্গিতপুর্ন উদাহরনসহ লেখাটি বর্তমান সময়োপযোগী হয়েছে।

মন্তব্য করুন