জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির স্বার্থে তামাকের মূল্যস্তর সহজ করে কর বাড়ান

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধির স্বার্থে তামাকের মূল্যস্তর সহজ করে কর বাড়ান

ফন্ট সাইজ:

তামাক মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর দ্রব্য। বাংলাদেশে তামাকপণ্য যেমন অত্যন্ত সম্ভা এবং সহজলভ্য তেমনি তামাক কর কাঠামো খুবই জটিল এবং ত্রুটিপূর্ণ, যা তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে যথেষ্ট কার্যকরী নয়। বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়াক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)’র প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও তামাক কর সংস্কারে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অথচ এফসিটিসি’র আর্টিকেল ৬ ধারায় তামাকের চাহিদা হ্রাসকল্পে সরকারসমূহকে একটি সহজ তামাক কর ও মূল্য নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তামাক ব্যবহারকারী দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ৩৫.৩ শতাংশ, যা ভারতে ২৮.৬ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৯.১ শতাংশ। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস, ২০১৭)-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ এর তথ্যমতে, তামাক ব্যবহারজনিত রোগে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষ মৃত্যু বরণ করে, পঙ্গুত্ব বরণ করে আরো কয়েক লাখ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ বছর তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা পক্ষান্তরে, তামাক ব্যবহারজনিত কারণে মৃত্যু, অন্যান্য স্বাস্থ্য ক্ষতি এবং পরিবেশের ক্ষতি বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার এবং ক্ষয়ক্ষতি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং পরিবেশের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকি সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশের তামাক কর পদক্ষেপ বা কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অত্যন্ত জটিল যা তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে যথেষ্ট নয়। সিগারেটে ৪টি মূল্যন্তর (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ এবং প্রিমিয়াম) এবং অ্যাডভ্যালোরেম (মূল্যের শতকরা হার) কর প্রথা কার্যকর রয়েছে। তামাকপণ্যের ধরন (সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুল); তামাকপণ্যের বৈশিষ্ট্য (ফিল্টার-ননফিল্টার বিড়ি); এবং সিগারেটের ব্রান্ড (৪টি মূল্যস্তর) ভেদে ভিত্তিমূল্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। একাধিক মূল্যস্তর এবং বিভিন্ন দামে তামাকপণ্য ক্রয়ের সুযোগ থাকায় তামাকের ব্যবহার হ্রাসে কর ও মূল্যপদক্ষেপ সঠিকভাবে কাজ করে না। করপদক্ষেপের কারণে কোন একটি তামাকপণ্যের দাম বাড়লে অথবা ভোক্তার জীবনমানে পরিবর্তন ঘটলে ভোক্তা তার পছন্দমতো তামাকপণ্য ক্রয় করতে পারে। অর্থাৎ ভোক্তা তার রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন দামে তামাকপণ্য ব্যবহারের সুযোগ পায়। বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম কাছাকাছি হওয়ায় ভোক্তা যে কোন একটি জ্বরের সিগারেট বেছে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য বিশ্লেশন করে দেখা গেছে, ২০০৬-০৭ সালে নিম্ন স্তরের সিগারেটের মার্কেট শেয়ার ছিলো মাত্র ২৫ শতাংশ যা ব্যাপকহারে বেড়ে ২০২৩-২৪ সাল ৭৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য মূল্যস্তরের তুলনায় নিম্ন স্তরে কম শুল্কহারের সুযোগ নিয়ে এই স্তরে নতুন নতুন ব্র্যান্ড চালু করেছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু মার্কেট শেয়ারের বড় অংশ হওয়া সত্ত্বেও উচ্চস্তরের তুলনায় এই নিম্নস্তর থেকে কম রাজস্ব পেয়ে থাকে সরকার।
অপরদিকে, দেশে তামাকপণ্যের খুচরামূল্য বা ভিত্তিমূল্য খুবই কম। তাই করহার বেশি হলেও তা তামাকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে তেমন কোন অবদান রাখে না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত গ্লোবাল টোব্যাকো এপিডেমিক ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮৬টি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কায় ২০ শলাকার ১ প্যাকেট সিগারেটের দাম (আন্তর্জাতিক ডলারে সর্বাধিক প্রচলিত ব্রান্ড) সবচেয়ে বেশি ৩৪.৩৮ টাকা এবং করহার ৬৮.৩৭ শতাংশ। তারপরেই রয়েছে তুর্কেমেনিস্তান (দাম ৩৩.৭৬ ডলার এবং করহার ৩১.৩২%), অস্ট্রেলিয়া (দাম ২৬.১৯ ডলার, করহার ৬৯.১৫%), নিউজিল্যান্ড (দাম ২৬ ডলার, করহার ৭৭.৬৮%) এবং আয়ারল্যান্ড (দাম ২২.৪৩ ডলার এবং করহার ৭৭.৮১%)। দামের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম (৩.৪৮ ডলার) তবে করহারের বিবেচনায় শ্রীলঙ্কা, তুর্কেমেনিস্তান এবং অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও উপরে রয়েছে বাংলাদেশ (৫৮.৪%)। বস্তুত, এই ত্রুটিপূর্ণ কর-কাঠামোই (বেশি কর, কমদাম) স্ববিরোধ তৈরি করেছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তামাক কোম্পানিগুলো এনবিআর-কে কর না বাড়ানোর ব্যাপারে প্রভাবিত করে থাকে। বিশেষত বিগত বছরগুলোতে সিগারেটের নিম্ন স্তরে সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে তামাক কোম্পানিগুলোকে ব্যাপকভাবে মুনাফা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক না বাড়িয়ে কেবল মূল্যস্তর বৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের দাম বাড়ানো হলে বর্ধিত মূল্যের একটি বড় অংশ তামাক কোম্পানির পকেটে চলে যায়। তামাক কোম্পানিকে লাভবান রেখে আর যাই হোক, তামাক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য থেকে ৭টি মহানগরীর (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং রংপুর) নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গড় খুচরা মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সালের (৪ জুলাই) তুলনায় ২০২৩ সালে (৪ জুলাই) খোলা চিনির দাম বেড়েছে ৮৯ শতাংশ, আলু ৮৭ শতাংশ, খোলা আটা ৭৫ শতাংশ, পাঙ্গাস মাছ ৪৭ শতাংশ, ডিম ৪৩ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৩৪ শতাংশ, গুঁড়ো দুধ ৩০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ। অথচ একইসময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে নিত্যপণ্যের তুলনায় তামাকপণ্য আরো সন্তা হয়েছে। তামাকপণ্যের প্রকৃতমূল্য হ্রাস পাওয়ায় তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ এসব পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর আহরণ সহজীকরণের জন্য বাজারে বিদ্যমান সিগারেটের স্তর চারটি থেকে নামিয়ে তিনটিতে এনে মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমানে সিগারেটে চারটি মূল্যস্তর (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) থাকায় তামাক কর ও মূল্য পদক্ষেপ সঠিকভাবে কাজ করে না। বিশেষ করে নিম্ন এবং মধ্যম স্তরের সিগারেটের দাম কাছাকাছি হওয়ায় ভোক্তা যে কোন একটি স্তরের সিগারেট বেছে নেয়ার সুযোগ পায়। সিগারেট বাজারের সিংহভাগ এই দুই স্তরের দখলে রয়েছে। এই দুটি স্তরকে একত্রিত করে দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ১৫০ টাকা ও অতি উচ্চ স্তরের দশ শলাকার এক প্যাকেটের দাম ২০০ টাকা করা হোক। সেই সাথে সকল স্তরের সিগারেটের উপর বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং প্রতি ১০ শলাকার প্যকেটে ৪ টাকা হারে নির্দিষ্ট করারোপ করা হোক। এতে যেমন স্বল্প আয়ের ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে বিশেষভাবে উৎসাহিত হবে তেমনি তরুণ প্রজন্ম ধূমপান শুরু করতেও নিরুৎসাহিত হবে।

এই প্রস্তাবনা মতে, মূল্য বৃদ্ধি ও করারোপ করলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লাখ ৭২ হাজার-এর বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে; দীর্ঘমেয়াদে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪০৮ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩৩৫ তরুণ জনগোষ্ঠির অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে এবং ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি তামাক কর রাজস্ব পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় হবে।

তাই প্রত্যাশা করছি যে, জনস্বাস্থ্য রক্ষা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং তামাকমুক্ত একটি সুস্থ-সবল জাতি গঠনের লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে সিগারেটের বর্তমান চার স্তরকে তিন স্তরে পুনর্বিন্যাস করে প্রস্তাবিত হারে কর বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
লেখক: সংসদ সদস্য (মহিলা আসন-৫), বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন