যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব

ধ্বংসস্তূপ থেকে সম্ভাবনার রাষ্ট্র

যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্ব

ফন্ট সাইজ:

ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি জাতির সামনে শুধু সংকটই থাকে না, থাকে অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নও। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ঠিক তেমনই এক কঠিন অধ্যায়। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেশের অবকাঠামোকে বিধ্বস্ত করেছিল, প্রশাসনিক কাঠামোকে অকার্যকর করে তুলেছিল এবং অর্থনীতিকে প্রায় পঙ্গু অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল। রেলপথ, সড়ক, সেতু, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎব্যবস্থা- সবখানেই ছিল যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন। কৃষি উৎপাদন ছিল অনিশ্চিত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অপ্রতুল, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল নবজাত ও দুর্বল।

এমন এক অনিশ্চয়তা ও হতাশার পরিবেশে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কেবল একজন শাসক হিসেবে আবির্ভূত হননি; তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন বাস্তববাদী রাষ্ট্রনির্মাতা হিসেবে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সার্থকতা কেবল রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত অর্থ নিহিত রয়েছে অর্থনৈতিক মুক্তি, উৎপাদনশীল সমাজ এবং আত্মনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার বাস্তবতানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি আবেগ নয়, ফলাফলকে গুরুত্ব দিতেন। তিনি বুঝেছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। তাই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন উন্নয়ন, উৎপাদন ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতির ধারণা।

তার ঘোষিত ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল এই দর্শনেরই প্রতিফলন। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল না, বরং বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের একটি জাতীয় রূপরেখা ছিল। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, শিল্পায়ন, যুব উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ-সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে এনে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন।
বিশেষত কৃষি খাতে তার উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে কৃষিকে বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার সময়ে খাল পুনঃখনন কর্মসূচি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ, কৃষিঋণের সহজলভ্যতা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসারে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘খাল খনন’ কর্মসূচি কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্জাগরণের একটি জাতীয় প্রয়াস।

গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল তার রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রীয় উপাদান। তিনি মনে করতেন, ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কখনো একটি জাতিকে সামগ্রিক অগ্রগতি দিতে পারে না। উন্নয়নের সুফল প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে হবে। সেই লক্ষ্যেই তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করেন। এতে তৃণমূল জনগোষ্ঠী প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সক্রিয় অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়।
অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করেন। তিনি রাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশকে উৎসাহিত করেন। তার বিশ্বাস ছিল, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগকে বিকশিত না করলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। ফলে শিল্প বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে তিনি বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন। এই নীতির ফলেই পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত ধীরে ধীরে শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করে।

শিক্ষা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তার চিন্তায় শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান ছিল একই সূত্রে গাঁথা। তিনি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যা তরুণদের কর্মমুখী, আত্মনির্ভর এবং বাস্তব জীবনের উপযোগী করে গড়ে তুলবে।

তবে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনায়কোচিত মেধার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ দেখা যায় তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত। জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য বহুমাত্রিক কূটনীতি অপরিহার্য। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবভিত্তিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন।

তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার নতুন দিগন্ত লাভ করে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন পথ উন্মোচিত হয়। পরবর্তীকালে প্রবাসী আয়ের যে শক্তিশালী ভিত্তি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করেছে, তার প্রাথমিক ভিত্তি এই সময়েই সুদৃঢ় হতে শুরু করে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নেও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একইসঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে বহুমাত্রিক রূপ দেন। তার পররাষ্ট্রনীতির মূল শক্তি ছিল- কোনো একটি বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া।

দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা প্রচারে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক উন্নয়নের যে চিন্তা পরবর্তীকালে সার্ক (ঝঅঅজঈ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তব রূপ পায়, তার অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

জাতীয় পরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, জাতীয়তাবোধ এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। তার ভাষণে বারবার ওঠে এসেছে আত্মনির্ভরতা, উৎপাদনশীলতা, শৃঙ্খলা এবং কর্মমুখী সমাজ গঠনের আহ্বান। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো জাতি কেবল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে উন্নত হতে পারে না; উন্নয়নের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে মানুষের সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার মধ্যে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের অবদান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রগঠন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তার উদ্যোগগুলোর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ খুবই সীমিত। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের সামনে উন্নয়নের একটি বিকল্প পথ উন্মোচন করেছিলেন। তিনি জনগণকে হতাশা থেকে আশার দিকে, নির্ভরতা থেকে আত্মনির্ভরতার দিকে এবং স্থবিরতা থেকে উৎপাদনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৮১ সালের ৩০শে মে তার জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া রাষ্ট্রদর্শন, উন্নয়ন ভাবনা এবং আত্মনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। সময়ের ব্যবধানে তার নীতি ও দর্শনের মূল্যায়ন নতুনভাবে হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সম্ভাবনার রাষ্ট্রে রূপান্তরের যে দীর্ঘ যাত্রা, তার প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এক দূরদর্শী, কর্মমুখী এবং অসাধারণ মেধাসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক।
লেখক: ব্যাংকার

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন