দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-পাকিস্তান ও ভারত-মার্কিন মৈত্রী, বাংলাদেশ কোন পথে চলবে?

দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-পাকিস্তান ও ভারত-মার্কিন মৈত্রী, বাংলাদেশ কোন পথে চলবে?

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন-কে স্বাগত জানানোর অব্যবহিত পরেই পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বকে বরণ করেছে চীন। এই ধারাবাহিক কূটনৈতিক সক্রিয়তা শুধু বেইজিংয়ের বৈশ্বিক মনোযোগের পরিচায়ক নয়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সতর্কতারও ইঙ্গিতবহ। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-পাকিস্তান ও ভারত-মার্কিন মৈত্রীর ফলে যে নতুন ভূ-রাজনীতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ কি কোনো এক বলয়ে ঝুঁকবে, নাকি বজায় রাখবে সম-সম্পর্ক, এমন প্রশ্নও সামনে আসছে। পরিবর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, তা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তিসমূহ মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মেরূকরণ যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে। একসময় যেখানে ভারত ছিল প্রায় একক আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি, সেখানে এখন নতুন শক্তি-সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই পরিবর্তনের একদিকে রয়েছে চীন-পাকিস্তান অক্ষ, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভারত-মার্কিন কৌশলগত মৈত্রী। ফলে দক্ষিণ এশিয়া এখন আর কেবল আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র নয়, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার নতুন পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।

চীন ও পাকিস্তান-এর সম্পর্কের যে বিস্তার, তার শিকড় বহু পুরনো। ১৯৪৯ সালে নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চীনের আত্মপ্রকাশের পরপরই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের বর্ষীয়ান নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি চীন সফরের মাধ্যমে সম্পর্কের সূচনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ দুই দেশের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকে নতুন মাত্রা দেয়। পাকিস্তান দ্রুত উপলব্ধি করে যে, ভারতের মোকাবিলায় বেইজিং একটি কার্যকর ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হতে পারে। অন্যদিকে চীনও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব সীমিত করতে ইসলামাবাদকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে।

ধীরে ধীরে দুই দেশের সম্পর্ক সামরিক সহযোগিতা, পারমাণবিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প, অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক সমর্থনের মধ্যদিয়ে গভীর কৌশলগত জোটে রূপ নেয়। আজ সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এটি শুধু অবকাঠামো প্রকল্প নয়, ভারত মহাসাগর, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-কৌশলগত সংযোগের ভিত্তি।

কিন্তু এই পরিবর্তনের সমান্তরালে আরেকটি বিপরীতধর্মী শক্তিশালী ধারা গড়ে উঠেছে-ভারত-মার্কিন কৌশলগত মৈত্রী। গত দুই দশকে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং চীন-প্রতিরোধী আঞ্চলিক ভারসাম্যের অংশে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, কোয়াড” জোট এবং সামরিক সহযোগিতা চুক্তিগুলো দেখাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এশিয়ায় একটি প্রতিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে ভারত শুধু দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি নয়। বরং চীনের উত্থানের বিপরীতে বৃহত্তর এশীয় ভারসাম্যের কেন্দ্রীয় উপাদান। অন্যদিকে ভারতও মার্কিন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বৈশ্বিক সমর্থনকে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করছে।
ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় এখন দু’টি বৃহৎ কৌশলগত বলয় দৃশ্যমান-একদিকে চীন-পাকিস্তান অক্ষ, অন্যদিকে ভারত-মার্কিন ঘনিষ্ঠতা। এই বাস্তবতায় নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, এমনকি বাংলাদেশও বিভিন্ন মাত্রায় বৈশ্বিক শক্তি প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হচ্ছে। বন্দর, করিডোর, সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার, ডিজিটাল অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কানেক্টিভিটি এখন ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের অবস্থান এখন শুধু বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নয়। এটি ইন্দো-প্যাসিফিক, দক্ষিণ এশিয়া এবং চীনের সংযোগ-রাজনীতির মধ্যবিন্দুতে উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম, পায়রা ও মাতারবাড়ি বন্দর, আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি উদ্যোগ, সাবমেরিন ক্যাবল, জ্বালানি করিডোর-সবই এখন বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়ন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি’র সামপ্রতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক “রিয়্যালিস্ট রিক্যালিব্রেশন” হিসেবে দেখছেন। ঐতিহাসিকভাবে দলটি পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক ঘনিষ্ঠ এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কের পক্ষে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলটি সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। তাছাড়া, বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে-ঢাকা কি ভারত-মার্কিন বলয়ের দিকে বেশি ঝুঁকবে, নাকি চীন-পাকিস্তান অক্ষের দিকে? নাকি উভয়ের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে? পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েই এগুতে হবে।

বাস্তবতা হলো, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভূগোল, অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও আন্তঃনির্ভরতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আবার চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদারদের একটি; অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহৎ রপ্তানি বাজার ও কৌশলগত অংশীদার। পাকিস্তানও ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় নতুন করে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।

অতএব, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর পথ সম্ভবত কোনো এক বলয়ে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়া নয়, বরং “মাল্টি-ভেক্টর ডিপ্লোম্যাসি” বা বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনীতি অনেকটা নতুন স্নায়ুযুদ্ধধর্মী প্রতিযোগিতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যেখানে বড় শক্তিগুলো আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কৌশলগত স্বার্থ, বাণিজ্য পথ, সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে।

প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি এই দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত? ঢাকার কূটনীতিকে এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সীমায় ভাবলে চলবে না। প্রয়োজন বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি-সমীকরণ বোঝা, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকির পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক, বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে আগামী দিনগুলোতে এই কৌশল আরও সুসংহত, গবেষণাভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হয়, তখন মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখা। বাংলাদেশের জন্যও সেটিই সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন