চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নতুন স্থাপিত র্যাব ও পুলিশের যৌথ ক্যাম্পে গভীর রাতে সংঘবদ্ধ হামলা চালিয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। হামলার আগে অন্তত পাঁচটি স্থানে এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে পুরো এলাকা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারেন। পরে ভারী অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্প লক্ষ্য করে শুরু হয় গুলিবর্ষণ।
সোমবার দিবাগত রাত ১টার পর সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম আলীনগর ও ছিন্নমূল এলাকায় স্থাপিত র্যাব ও পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে এ হামলার ঘটনা ঘটে। র্যাবের দাবি, ‘ইয়াসিন বাহিনী’ নামের একটি সশস্ত্র গ্রুপ এই হামলার সঙ্গে জড়িত।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা জঙ্গল সলিমপুরে অবস্থিত র্যাব ক্যাম্প ঘেরাও করে অতর্কিত গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়ে।
তিনি বলেন, ‘এটি ছিল পরিকল্পিত হামলা। রাস্তা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে তারা আগেই নিজেদের সুবিধা নিশ্চিত করেছে। আমাদের সদস্যরা নিরাপদে আছেন এবং পুরো এলাকা এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
হামলার আগে কেটে ফেলা হয় রাস্তা
স্থানীয় সূত্র ও ঘটনাস্থলের ছবি থেকে জানা যায়, রোববার রাত ১০টার পর থেকেই এক্সকাভেটর দিয়ে রাস্তা কাটার কাজ শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে অন্তত পাঁচটি পয়েন্টে পাহাড়ি সড়ক চার ফুট গভীর করে কেটে ফেলা হয়। কোথাও কোথাও কালভার্টও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
রাস্তার মাঝখানে বড় বড় গর্ত ও মাটির ঢিবি তৈরি করে যান চলাচল সম্পূর্ণ অচল করে দেয়া হয়। ফলে র্যাব-পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে যেতে পারেনি।
অভিযানে অংশ নেয়া র্যাব-৭-এর ডেপুটি সহকারী পরিচালক কামাল হোসাইন বলেন, ‘রাস্তা কেটে তারা পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে দেয়। গাড়ি তো দূরের কথা, মোটরসাইকেলও ঢুকতে পারছিল না। তাদের মূল পরিকল্পনাই ছিল ভেতরে থাকা সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো।’ পরে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে রাস্তা কাটার কাজে ব্যবহৃত এক্সকাভেটরটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে রাতভর গুলিবর্ষণ
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, রাস্তা বিচ্ছিন্ন করার পর রাত ১টার দিকে ২৫০ থেকে ৩০০ জনের একটি সশস্ত্র দল আলীনগর ও জঙ্গল সলিমপুরের ক্যাম্প দু’টি ঘিরে ফেলে। হামলায় একে-৪৭ ধাঁচের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয় বলে দাবি করেছে র্যাব।
রাত ১টা থেকে ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দফায় দফায় গুলিবিনিময় চলে। ক্যাম্পের টিনশেড কাঠামো ও দেয়ালে অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখা গেছে। এক র্যাব সদস্য বলেন, ‘হঠাৎ চারদিক থেকে গুলি শুরু হয়। আমরা দ্রুত অবস্থান বদলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। না হলে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারত।’
নিরাপত্তা সূত্র বলছে, হামলাকারীরা বুলডোজার দিয়ে ক্যাম্পের সীমানাপ্রাচীর ভাঙারও চেষ্টা করে। ক্যাম্পের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৃষ্টি ও অন্ধকারকে কাজে লাগায় হামলাকারীরা
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাত ১২টার পর এলাকায় বৃষ্টি শুরু হলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের কাছে চলে আসে। বৃষ্টির শব্দে গুলির প্রাথমিক শব্দও ঢাকা পড়ে যায়।
অন্যদিকে, ক্যাম্প এলাকায় স্থায়ী ব্যারাক না থাকায় অনেক সদস্য পাশের একটি স্কুল ভবনে অবস্থান করছিলেন। হামলাকারীরা বিষয়টি আগে থেকেই জানত বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ভোরে পাঁচ শতাধিক সদস্যের অভিযান
হামলার পর ভোর ৫টার দিকে র্যাব, পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর পাঁচ শতাধিক সদস্য অভিযান শুরু করেন। রাস্তা কেটে ফেলার কারণে যানবাহন ব্যবহার সম্ভব না হওয়ায় সদস্যদের পায়ে হেঁটে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রবেশ করতে হয়।
প্রায় ৩০ হাজার একর পাহাড়ি এলাকা ঘিরে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘হামলার আগে সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে কয়েক জায়গায় রাস্তা কেটে ফেলেছিল। গাড়ি কোনোভাবেই সামনে এগোতে পারেনি। আমরা পায়ে হেঁটে সদস্য পাঠাই। রাতভর গুলিবর্ষণের পর ভোরে তারা পালিয়ে যায়। এখন পুরো এলাকা ঘিরে অভিযান চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের সমন্বিত হামলা চালাতে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি লাগে। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’
আতঙ্কে স্থানীয় বাসিন্দারা
দিনভর পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করে। ভাঙা রাস্তা, কাটা পাহাড়ি পথ, ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্প ও গুলির চিহ্ন দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এক বাসিন্দা বলেন, ‘এমন দৃশ্য কোনো দিন দেখিনি। পাহাড় কেটে রাস্তা উধাও, রাতভর গুলির শব্দ—পুরো এলাকা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে গিয়েছিল।’
দীর্ঘদিনের অপরাধের অভয়ারণ্য
দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু ও অপরাধী চক্রের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে পরিচিত। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এলাকাটিতে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। সরকার সেখানে পুলিশ ট্রেনিং একাডেমি, জেলা কারাগারসহ একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
এর আগে ২০১৭ ও ২০২২ সালে এলাকা অপরাধমুক্ত করতে প্রশাসন উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের বাধা ও প্রতিকূলতার কারণে তা পুরোপুরি সফল হয়নি।
চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। পরে গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য অংশ নিয়ে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সেখানে স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, নতুন করে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং যৌথ বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতেই এই সংঘবদ্ধ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এ হামলার ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ–এর। প্রশাসন রোববার সকালে তার সফরসূচি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর একই রাতেই হামলার ঘটনা ঘটে।
