ঈদ-উল-আযহা মানে হলো কোরবানীর ঈদ। মানব কল্যানে আত্মত্যাগ আর আল্লাহর সন্তুষ্টি হলো এই ঈদের তাৎপর্য। কুরবানীর ঈদ বিধায় পশু কেনা থেকে শুরু করে, লালন-পালন, ঈদের নামাজ পড়া শেষ করে পশু জবাই, প্রতিবেশী-গরীবদের মাঝে মাংস বিতারণ- সবকিছু মিলিয়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ, এক ভিন্ন মাত্রার আমেজ এনে দেয়। ঈদ আনন্দ এবং উৎসব সব মিলিয়ে এর ফাঁকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কিন্তু একেবারে কম নয়।
পশু কিনতে সতর্কতাঃ
প্রতি বছরই আমরা পরিবারের সবাই মিলে দলবেধে পশু কিনতে যাই হাটে। সুস্থ সবল পশু বেছে কেনার চেষ্টা করুন। জবাই এর আগে পশু অসুস্থ মনে হলে ভেটেনারী চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। হাটে গিয়ে কিন্তু চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। সতর্ক হতে হবে হাটে পশু ছোটাছুটির জন্য আমরা যেন আঘাত বা ভয় না পাই। রোদে ঘামে-বৃষ্টিতে ভিজে যেন অসুস্থ না হয়ে পরি। পকেটমার দের খপ্পরে যেন আমরা টাকা পয়সা খুইয়ে না ফেলি। সেই সাথে সাবধান হতে হবে অজ্ঞান পার্টি এবং মলম পার্টির হাত থেকে। শিশুদের আমরা হাটে না নিয়ে যাওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করি।
পশু জবাইয়ে সতর্কতাঃ
সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে অথবা নিজস্ব বসতবাড়ীতে কোরবানী করুন। দক্ষ ব্যাক্তি দ্বারা পরিছন্ন পরিবেশে, পশু কোরবানী ও মাংস প্রস্তুত করুন। কুরবানীর পর যতদ্রুত সম্ভব বাড়ীর চারপাশ পরিস্কার করে ফেলুন। জমে থাকা পশুর রক্ত এবং উচ্ছিষ্ট অংশ ডাষ্টবিনে ফেলুন। কোরবানীর পর স্থানটি ব্লিচিং পাউডার অথবা ডেটল মেশানো পানি দিয়ে পরিস্কার করে ফেলুন। মাংস কাটাকাটির জন্য ব্যবহৃত দা, বটি, ছুড়ি, চাটাই যথাযথ জীবনুনাশক দিয়ে পরিস্কার করে নিতে হবে। একদিনের কসাই হয়ে পশু কাটাকাটি করার সময় সাবধানে কাজ করুন। জবাই করার পর পর দ্রুততার সাথে মাংস সংরক্ষন করুন। কাঁচা মাংস সঠিকভাবে না ধুইলে বা কাটাকাটির সময় হাতে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে যেতে পারে। মাংস স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৪ ঘন্টার বেশী বাইরে রাখবেন না। যতদ্রুত সম্ভব রান্না করুন, স্বল্প সময়ের জন্য সংরক্ষন করতে চাইলে রেফ্রিজেটরে ৫˚ (ডিগ্রি) সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখুন। দীর্ঘ মেয়াদ মাংস সংরক্ষনের জন্য ডিপ ফ্রিজে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখুন।
ঈদের খাবারে সতর্কতাঃ
কোরবানীর ঈদ মানেই সকাল-দুপুর-রাত প্রত্যেক বেলায় খাবার তালিকায় মাংস। তাই সকাল থেকেই সতর্ক হতে হবে-ফল-মূল, ফাইবার জাতীয় খাবার দিয়ে দিন শুরু করতে হবে। এর ফলে মাংস খেতে এবং হজমেও সুবিধা হবে। একবেলায় বেশী করে না খেয়ে একটু একটু করে খেতে হবে এবং খাবার সময় পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার কারনে হজমে সমস্যা, কোষ্ঠ কাঠিন্য, ওজন বেড়ে যাওয়া বিষয় তো থাকছে। সাথে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগ আক্রান্ত রোগীদের নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে খাবার খেতে হবে। মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সারাদিন ভর মাংস খাওয়া তার উপর মিষ্টি জনিত খাবার সব মিলিয়ে ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই সময় মাংস খাওয়ার পর কোমল পানীয় খাওয়ার প্রবনতা দেখা যায়। তবে লেবু পানি, সালাদ, টক দই, বোরহানি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। মাংসে চর্বি বাদ দিয়ে ফেলুন, অল্প তেল আর মশলা দিয়ে রান্না করুন, ভূনা করে রান্না না করে গ্রীল বা কাবাব করার চেষ্টা করবেন। এমন করে মাংস খেলে আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া অনেকখানি সম্ভব হবে।
ঈদের পরে সতর্কতাঃ
১. সকাল বিকাল হাটাহাটি/জগিং/দৌড়ানোর চেষ্টা করুন। মাংস বেশী খাওয়ার কারনে রক্তে চর্বি বেড়ে যাওয়ায় সুযোগ কিন্তু ব্যাপক সম্ভব হলে ট্রেডমিলে কিছু সময় দৌড়ানোর অভ্যাস করবেন।
২. পুদিনা চা/গ্রিন টি/লেবু-চা খাওয়ার অভ্যাস করুন যা আমাদের শরীর বিপাক ক্রিয়া বাড়িয়ে দেবে।
৩. কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে ইসবগুলের ভুসি খেতে পারেন সকালে।
৪. খাবার তালিকায় সবুজ/হলুদ ফল এবং সবজি রাখুন।
ঈদে আপনারা ভালো থাকুন সুস্বাস্থ্য বজায় রাখুন। ঈদ পালন শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসুন। ঈদ শেষ হউক আত্ম শুদ্ধির মাধ্যমে, স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়িয়ে, একই সাথে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ করে।
লেখকঃ
ডাঃ ইমনুল ইসলাম ইমন
অধ্যাপক, শিশু বিভাগ
চেম্বারঃ আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার, মিরপুর-৬
হটলাইনঃ ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
