শয্যা কম, রোগী বেশি তারপরও চলছে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ

বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের বাস্তবতা

শয্যা কম, রোগী বেশি তারপরও চলছে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালের মোট শয্যা (বেড) সংখ্যা প্রায় ৭১ হাজার ৬৬০টি। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট শয্যা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫টি। অর্থাৎ দেশে প্রতি প্রায় ৯৯০ জন মানুষের জন্য আছে মাত্র ১টি হাসপাতাল শয্যা। কিন্তু বাস্তবতা আরও কঠিন। বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় সরকারি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগী থাকে প্রায় দ্বিগুণ, কোথাও তারও বেশি। অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ হাজার বেডের বিপরীতে চিকিৎসা নেয় ৩-৪ হাজার রোগী।

ফলাফল?
একটি হাসপাতাল ধীরে ধীরে পরিণত হয় জীবন বাঁচানোর যুদ্ধক্ষেত্রে।
রোগীর খাবারের বাস্তবতা
সরকার বর্তমানে একজন ভর্তি রোগীর খাবারের জন্য দৈনিক প্রায় ১৭৫ টাকা বরাদ্দ দেয়। এই টাকায় দিতে হয় ৩ বেলার খাবার। কিন্তু যখন ১ হাজার রোগীর জন্য বরাদ্দকৃত খাবার ২ হাজার রোগীর মাঝে ভাগ করতে হয়, তখন-

> খাবারের পরিমাণ কমে যায়
> পুষ্টিমান কমে যায়
> মাছ, মাংস ও ডিম কমে যায়
> রোগীকে বাইরে থেকে খাবার আনতে হয়
> অনেক সময় নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়
হাসপাতালের রান্নাঘর তখন শুধু খাবার নয়, “সংকট” রান্না করে।

ওষুধের সংকট কেন হয়?
সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি নির্দিষ্ট ওষুধ বরাদ্দ নেই। হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা, রোগীর চাপ ও বাজেট অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রোগী যখন বেডের দ্বিগুণ বা তিনগুণ হয়ে যায়, তখন-
> স্টকের ওষুধ দ্রুত শেষ হয়ে যায়
> রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বলা হয়
> জরুরি ইনজেকশন ও অ্যান্টিবায়োটিক সংকট তৈরি হয়
> দরিদ্র রোগীর চিকিৎসা মাঝপথে থেমে যায়
অতীতে অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ ছিল

স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও অপচয়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। যেমন-
> নিম্নমানের খাবার সরবরাহ
> কাগজে বেশি রোগী দেখানো
> সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রি
> অতিরিক্ত দামে কেনাকাটা
> ভুয়া বিল ও টেন্ডার বাণিজ্য
> অকার্যকর যন্ত্রপাতি কেনা
তবে এটাও সত্য-
সব হাসপাতাল বা সব স্বাস্থ্যকর্মী দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। অসংখ্য ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী সীমাহীন চাপের মধ্যেও সততা ও মানবিকতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

পরিবর্তনের চেষ্টাও চলছে
ইতোমধ্যে সরকারের সদিচ্ছা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি ও জনগণের সরকার হিসেবে স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
✔ ই-টেন্ডার ব্যবস্থা
✔ ডিজিটাল মনিটরিং
✔ দুর্নীতিবিরোধী অভিযান
✔ হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন
✔ শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পরিকল্পনা
✔ উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
এই উদ্যোগগুলো আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।

চিকিৎসকদের উপরও ভয়াবহ চাপ
একজন ডাক্তারকে কখনও কখনও স্বাভাবিকের কয়েকগুণ বেশি রোগী দেখতে হয়।
ফলে-
> রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া যায় না
> ভুলের ঝুঁকি বাড়ে
> ফলোআপ দুর্বল হয়
> রোগী-চিকিৎসক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
> মানসিক চাপ বাড়ে
বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা
অনেক রোগীকে থাকতে হয়-
▪ মেঝেতে
▪ করিডোরে
▪ বারান্দায়
▪ এক বেডে দুইজন
এটি শুধু অস্বস্তিকর নয়, সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ায়।

এখন কী প্রয়োজন?
>সরকারি হাসপাতালের শয্যা দ্রুত বৃদ্ধি
> স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধি
> খাদ্য ও ওষুধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং
>স্বচ্ছ ক্রয় ব্যবস্থা ও স্বাধীন অডিট
> চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী বৃদ্ধি
>জনগণের সচেতনতা ও সামাজিক নজরদারি
একটি দেশের হাসপাতালের অবস্থা সেই দেশের মানবিকতার আয়না। স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ মানে শুধু হাসপাতাল বানানো নয়-মানুষের জীবন বাঁচানো। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো সীমাহীন চাপের মধ্যেও প্রতিদিন লাখো মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে আছে। এই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন বিলাসিতা নয়, জাতীয় প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক ডা, এ কে এম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া মাসুম, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ধানমন্ডি-২, ঢাকা।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন