চায়না শক ২.০: বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন ভূমিকম্প, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

চায়না শক ২.০: বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন ভূমিকম্প, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

ফন্ট সাইজ:

ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি করে না। তবে মাঝেমধ্যে সে অদ্ভুতভাবে মিল রেখে চলে। বিশ শতকের শেষ দশকে যখন চীন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছিল, তখন পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা সেই পরিবর্তনের গভীরতা অনুধাবন করতে পারেননি। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় চীনের যোগদানের পর যে অর্থনৈতিক ঝড় বয়ে গিয়েছিল, সেটিকে পরে 'চায়না শক' নামে চিহ্নিত করেছিলেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটোর। আজ দুই দশকেরও বেশি সময় পরে ইতিহাস আবার সেই একই পথে হাঁটছে । তবে এবার অনেক বেশি শক্তি নিয়ে, অনেক বেশি প্রযুক্তিগত সামর্থ্য নিয়ে। বিশ্লেষকরা এর নাম দিচ্ছেন 'চায়না শক ২.০'।

প্রথম চায়না শকের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক ছিল না। অনেক শিল্পনগরীতে বেকারত্বের ছায়া দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। পরিবারগুলো ভেঙে পড়েছিল। বিয়েবিচ্ছেদ, আত্মহত্যা ও মাদকাসক্তির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল। এটি কেবল পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি লাখ লাখ মানুষের জীবনের গল্প, যেখানে একটি দেশের বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন কীভাবে একজন শ্রমিকের ঘরের আলো নিভিয়ে দিতে পারে, তার নির্মম দলিল। অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ে বলা হয়, বাজার নিজেই সামঞ্জস্য বিধান করে নেয়। কিন্তু ডেভিড অটোর দেখিয়েছেন, সেই সামঞ্জস্যের প্রক্রিয়া কখনো কখনো এক দশকেরও বেশি সময় নেয় এবং সেই দীর্ঘ অপেক্ষায় সাধারণ মানুষের জীবন কার্যত থমকে যায়।

এবারের পরিস্থিতি আরও জটিল। চীন ২০২৬-৩০ সালের জন্য যে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে, তা কেবল কম দামে পণ্য রপ্তানির গল্প নয়। এবার লক্ষ্য হলো রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি এবং জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। প্রথম চায়না শকের সময় চীন মূলত নিম্নমজুরির শ্রমশক্তিকে পুঁজি করে সস্তা পণ্য তৈরি করত। কিন্তু এবার চীন উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য তৈরি করছে এবং সেগুলো প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে ছাড়ছে। এই সমন্বয়টিই বিপজ্জনক। কারণ এর আগে উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ঢাল দিয়ে চীনা প্রতিযোগিতা ঠেকাত। এবার সেই ঢালটিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি ইতিমধ্যে এই চাপ অনুভব করছে। বেলজিয়ামভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান রিফর্ম জানাচ্ছে, মাত্র এক বছরে জার্মানির সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১২ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। মোট বাণিজ্য ঘাটতি এখন ৯৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জার্মানির মতো একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি যদি এই চাপে কাঁপতে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা কী হবে, সেটি ভাবলে উদ্বেগ জাগাটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দেশের ইলেকট্রনিক্স খাতে তিন হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এই খাতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন এই পণ্যগুলো তৈরিতে দেশীয় শিল্প ধীরে ধীরে সক্ষমতা অর্জন করছে। কিন্তু বাজারের বাস্তবতা হলো, এই খাতে চীনা পণ্য ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে। এখন যদি চীনের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আওতায় আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তিপণ্য দেশের বাজারে ঢুকতে শুরু করে, তাহলে দেশীয় শিল্পের টিকে থাকার সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আর সেই সংগ্রামে হেরে গেলে যে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, তারাই সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাবে।

চীনের সরকারি গণমাধ্যম পিপলস ডেইলি ও গ্লোবাল টাইমস অবশ্য এই উদ্বেগকে পশ্চিমা প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের যুক্তি হলো, চীনের উন্নত ও সাশ্রয়ী পণ্য বরং সাধারণ মানুষের কাছে প্রযুক্তিকে সহজলভ্য করে তুলছে। এই যুক্তিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা যাবে না। সত্যিই চীনা পণ্যের কারণে বিশ্বের বহু দেশে ভোক্তারা কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু এই সুবিধার একটি অদৃশ্য মূল্যও আছে। যখন স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়, কর্মসংস্থান কমে, পরিবারে আয়ের সংকট দেখা দেয় তখন সস্তা পণ্যের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। ভোক্তার স্বার্থ ও শ্রমিকের স্বার্থ একই মুদ্রার দুই পিঠ। দুটোকে একসঙ্গে বিবেচনা না করলে নীতিনির্ধারণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর করণীয় কী? নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকলে চায়না শক ২.০-এর ঢেউ একদিন এই দেশগুলোর উপকূলেও আছড়ে পড়তে পারে। আবার আমদানি নিষিদ্ধ করে বা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকাও সম্ভব নয়। টেকসই সমাধান হলো দেশীয় শিল্পের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এবং উদ্ভাবনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা। গ্লোবাল টাইমসের ভাষায় বলতে গেলে "যারা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ কাজে লাগায়, তারাই টিকে থাকে।" এই কথাটি চীনের জন্য যতটা সত্য, বাংলাদেশের জন্যও ততটাই।

ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, প্রতিটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা কিছু দেশকে পিছিয়ে দেয়, আবার কিছু দেশ সেই ধাক্কাকেই সুযোগে পরিণত করে। প্রথম চায়না শকের সময় দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান নিজেদের প্রযুক্তিগত শিল্পকে আরও শক্তিশালী করেছিল। বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। চায়না শক ২.০ আসছে এটি এখন আর কেবল থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সতর্কবার্তা নয়, এটি সময়ের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত?

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন