ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন বাস্তবতায় নতুন কূটনীতির সন্ধান

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: নতুন বাস্তবতায় নতুন কূটনীতির সন্ধান

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন মুহূর্ত বারবার আসে, যখন প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটি হয় আরও শক্ত হয়, নয়তো আরও জটিল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর বৈঠক এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিএএ-এনআরসি বিষয়ক বক্তব্য এই দু’টি ঘটনা একসঙ্গে পাঠ করলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি নতুন চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই চিত্র কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

প্রথমত, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রশ্নে বলতে হয়, সামরিক পর্যায়ে এই বৈঠক নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি যখন কূটনীতির কেন্দ্রে আসে, তখন বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থের রেখাটি নির্ধারণ করতে হবে। সহযোগিতা মানেই অধীনতা নয় এই বোধটি রাষ্ট্রীয় নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে যদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো যায়, তবে তা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই সহযোগিতা যদি একতরফা নির্ভরতায় পরিণত হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সিএএ ও এনআরসি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য যদিও কূটনৈতিক ভাষায় সংযত, তবু এর অন্তর্নিহিত বার্তাটি পরিষ্কার। ভারতের অভ্যন্তরীণ আইন হলেও তার প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ে। পুশ-ইন সমস্যা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্তে মানবিক সংকট এগুলো কেবল ভারতের 'আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়' বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আলোকে সুচিন্তিত ও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। নীরবতা কখনও কখনও সম্মতির ইঙ্গিত দেয়, যা কূটনৈতিক দুর্বলতার রূপ নেয়।

তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি কেবল আইনি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষাও বটে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তাহলে এই প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ছায়া যদি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর পড়ে, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে দুর্বল করবে এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও নতুন জটিলতা তৈরি করবে।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্নে বলা দরকার, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের কেন্দ্রে কেবল রাজনীতি নয়, বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের ঘাটতি উদ্বেগজনক। ভারতীয় পণ্যের বিপুল প্রবাহের বিপরীতে বাংলাদেশের রপ্তানি সুযোগ সীমিত। এই অসমতা দূর করতে হলে বাংলাদেশকে কেবল কূটনৈতিক আলোচনায় নয়, বরং কার্যকর বাণিজ্য নীতিতেও সক্রিয় হতে হবে। আঞ্চলিক সংযোগ, ট্রানজিট সুবিধা এবং যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

পঞ্চমত, সামগ্রিক বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন একটি 'কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের' মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই পর্যবেক্ষণ সত্য। কিন্তু এই পুনর্বিন্যাসের দিকটি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে বাংলাদেশের নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ও সাহসের ওপর। কেবল প্রতিক্রিয়াশীল কূটনীতি নয়, বরং সক্রিয়, নীতিনিষ্ঠ ও জনস্বার্থমুখী কূটনীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ এই জটিল বাস্তবতায় নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে।

শেষ কথা হলো, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক মানে কেবল মাথা নত করা নয়, আবার সম্পর্ক ছিন্ন করাও নয়। সমতা, পারস্পরিক সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে গড়া সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয়। বাংলাদেশের মানুষ সেই সম্পর্কই চায় যেখানে ঢাকার কণ্ঠস্বর দিল্লির করিডোরে সমান মর্যাদায় উচ্চারিত হয়।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]

শহীদুল্লাহ

১ মাস আগে

ভারত মুসলিমদের সাথে সরাসরি শত্রুতা করছে।চরম ইসলাম বিদ্বেষী। ইসরাঈল-ভারত একসূত্রে গাথা। দুটো রাষ্ট্রই কখনো আমাদের বন্ধু হতে পারে না। তাই সতর্কতার সাথে সম্পর্ক হতে হবে।।

মন্তব্য করুন