কর্মজীবনের ব্যস্ত করিডোরে আমরা প্রায়ই এক অদৃশ্য দৌড়ে শামিল হয়ে পড়ি। বর্তমান পেশাজীবী বিশ্বে ‘প্রতিযোগিতা’- যেন এক অবিচ্ছেদ্য নীরব বাস্তবতা। কে আগে এগোবে, কে বেশি প্রশংসা পাবে, কে বসের চোখে ‘সেরা’ হয়ে উঠবে-এই হিসাব কষতে কষতেই অনেক সময় আমরা ভুলে যাই, আমরা আসলে একই পথে চলা সহযাত্রী। পদোন্নতি, স্বীকৃতি, সফলতা- সব কিছুতেই এক মনস্তাত্ত্বিক অসম প্রতিযোগিতা। অনেক সময় আমরা কর্মক্ষেত্রকে এমনভাবে দেখি, যেন এটি কোনো অলিম্পিক স্টেডিয়াম, আর সহকর্মী মানেই প্রতিদ্বন্দ্বী! কেউ একটু এগিয়ে গেলেই মনে হয়- ‘এই বুঝি আমি পিছিয়ে পড়লাম!’ অথচ বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ সময় এই দৌড়টা আমাদের নিজের মনেই তৈরি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা কি সত্যিই আমাদের এগিয়ে নিচ্ছে, নাকি অদৃশ্যভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে?
প্রতিযোগিতা: প্রেরণা নাকি প্রতিবন্ধকতা?
প্রতিযোগিতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা এবং প্রতিযোগিতাকে প্রতিষ্ঠানে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য করা সমীচীন নয়। এটি আমাদের উন্নতির প্রেরণা জোগায়, নিজেকে আরও ভালো করার তাগিদ দেয়। কিন্তু যখন এই প্রতিযোগিতা অন্যকে হারানোর দিকে মোড় নেয়, তখন তা ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভিত নষ্ট করতে শুরু করে। কর্মক্ষেত্রে অবিশ্বাস জন্মায়, ঊসঢ়ধঃযু কমে যায়, আর একসময় কাজের পরিবেশ হয়ে ওঠে চাপ ও অস্বস্তির এক নিঃশব্দ কারাগার।
অফিসের এক চেনা দৃশ্য কল্পনা করা যাক-কেউ একটি ভালো কাজ করলো, কিন্তু তাকে অভিনন্দন জানানোর বদলে মনে প্রশ্ন জাগে, ‘সে কীভাবে করলো?’ কিংবা, ‘এতে আমার অবস্থান কোথায় দাঁড়ালো?’ এই প্রশ্নগুলো অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু এগুলো যদি আমাদের মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখনই প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতার সঞ্চার ঘটে। কারণ তখন আমরা নিজের কাজের চেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ি অন্যের সাফল্যের হিসাব কষতে।
সুস্থ প্রতিযোগিতা মানুষকে নিজের সীমা ছাড়িয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু সমস্যার সূত্রপাত শুরু হয় তখনই, যখন এই প্রতিযোগিতা ‘নিজেকে উন্নত করা’ থেকে সরে গিয়ে ‘অন্যকে হারানো’তে পরিণত হয়।
মনোবিজ্ঞানী আলফি কোহনের গবেষণায় দেখা যায়, ‘অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা কর্মীদের মধ্যে অবিশ্বাস, মানসিক চাপ এবং সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করে’। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর গবেষণাগুলোও দেখায়, ‘যেখানে সহকর্মীরা একে-অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে, সেখানে তথ্য গোপন রাখা, সহযোগিতার অভাব এবং দলগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে’।
সহযোগিতা এক ভিন্ন জগতের দরজা খুলে দেয়। সেখানে প্রতিযোগিতার চাপ নেই, আছে পারস্পরিক আস্থা। একজনের সাফল্য আরেকজনের জন্য হুমকি নয়, বরং প্রেরণা। কেউ কিছু ভালো জানলে তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়, কেউ সমস্যায় পড়লে অন্যরা পাশে দাঁড়ায়। এতে কাজ শুধু সহজ হয় না, সম্পর্কও গভীর হয়।
সহযোগিতার সৌন্দর্যটা অনেকটা একটি সুরেলা গানের মতো-একটি কণ্ঠ যতই মধুর হোক, একাধিক কণ্ঠ একসঙ্গে মিললে তবেই তা পূর্ণতা পায়। একা কেউ পুরোটা বহন করতে পারে না, কিন্তু সবাই মিলে একটি সম্পূর্ণতা তৈরি করা যায়।
সহযোগিতা শুধু কাজের গতি বাড়ায় না, এটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বড় করে তোলে। এতে জন্ম নেয় সহানুভূতি, ধৈর্য, আর পারস্পরিক সম্মান। কর্মক্ষেত্র তখন আর শুধু কাজের জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে শেখার জায়গা, বেড়ে ওঠার জায়গা।
সহযোগিতা এমন একটি শক্তি, যা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়কেই দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে নেয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সহযোগিতা অনেক গুরুত্ব বহন করে। ইসলাম সহযোগিতাকে শুধু উৎসাহই দেয় না, বরং এটিকে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ্তাআলা পবিত্র কোরআন এ বলেন-
‘তোমরা নেক কাজ ও তাক্ওয়ার ক্ষেত্রে একে-অপরকে সহযোগিতা করো, আর গুনাহ্ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে সহযোগিতা করো না।’
(সূরা আল-মায়েদা, ৫:২)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘মুমিনরা একে-অপরের জন্য একটি দালানের মতো, যার এক অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম)
এই শিক্ষাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সহকর্মী আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং আমাদের শক্তির অংশ।
বিশ্বায়নের এই সময়ে কোন প্রতিষ্ঠান তার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ার সুযোগ কোনোক্রমেই দিতে চাইবে না। তারা প্রতিনিয়ত যুগোপযোগী কর্মী ব্যবস্থাপনাকে জোরদারকরণে বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপের পাশাপাশি সমাজ মনোবিজ্ঞানী, কর্পোরেট গবেষণার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিবেশ সূচারুরূপে নিশ্চিত করে গতি আনয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিছু গবেষনার দিকে আলোকপাত করলে তা দেখা যায়-
লিংকডইন এবং গাল্প এর মতো সংস্থাগুলো তাদের জরিপে দেখিয়েছে যে, যেসব কর্মীরা তাদের সহকর্মীদের সাথে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন এবং সহযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করেন, তারা বেশি সন্তুষ্ট থাকেন, কর্মক্ষেত্রে বেশি সম্পৃক্ত হন এবং তাদের কর্মক্ষমতাও উন্নত হয়। বিশ্বজুড়ে সফল প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন- টয়োটা তাদের ‘খবধহ গধহঁভধপঃঁৎরহম’ পদ্ধতিতে শ্রমিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দলগতভাবে সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে, যার ফলে তাদের উৎপাদনশীলতা এবং পণ্যের মান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বিস্তর গবেষণা করে যাচ্ছেন। কিছু উল্লেখ্যযোগ্য গবেষনার মধ্যে রয়েছে-
‘সামাজিক মনোবিজ্ঞানের জনক কুর্ট লেউইন (কঁৎঃ খবরিহ) তার ‘ক্ষেত্রের তত্ত্ব’ (ঋরবষফ ঞযবড়ৎু)-এর মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মানুষের আচরণ আশেপাশের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। একটি সহযোগিতামূলক কর্মপরিবেশ কর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক মিথস্ক্রিয়া বাড়ায়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধি করে’।
‘হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের প্রফেসর অ্যামি এডমন্ডসন (অসু ঊফসড়হফংড়হ) তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, উচ্চ মাত্রার সাইকোলজিক্যাল সেফটি সম্পন্ন দলগুলো উদ্ভাবনী এবং কার্যকরী হয়, কারণ সদস্যরা ভুল করতে বা নতুন ধারণা প্রকাশ করতে ভয় পায় না। সহযোগিতামূলক পরিবেশে, কর্মীরা নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করতে এবং অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করে না, যা সামগ্রিকভাবে দলের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। স্ট্রেস এবং বার্নআউটের (নঁৎহড়ঁঃ) ঝুঁকিও কমে আসে যখন কর্মীরা জানেন যে তারা একা নন এবং প্রয়োজনে সহকর্মীদের সহায়তা পাবেন’।
প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর প্রয়োজনের সোপান তত্ত্ব (গধংষড়দিং ঐরবৎধৎপযু ড়ভ ঘববফং) আলোকে বলা যায়, মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা হলো ‘নবষড়হমরহমহবংং’-অর্থাৎ কোনো দলের অংশ হওয়া এবং গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া। সহযোগিতামূলক পরিবেশ এই চাহিদা পূরণ করে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তা ব্যাহত করে।
“সহযোগিতা মানে নিজের আলো নিভিয়ে দেওয়া নয়;
বরং অনেক আলো একসঙ্গে মিলিয়ে পথকে উজ্জ্বল করা।’
সহকর্মীকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে উঠুক- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ, আমরা যখন একসঙ্গে এগিয়ে যাই, তখন সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত থাকে না; তা হয়ে ওঠে সবার।
প্রবন্ধের যবনিকায় এই ?উপলব্ধি নিয়ে শেষ করতে চাই- জীবন আসলে কোনো একক দৌড় নয়, যেখানে অন্যকে হারিয়েই জিততে হয়। বরং এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা, যেখানে একে- অপরের হাত ধরে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সাফল্য।
লেখক: ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর
সোনালী ব্যাংক পিএলসি।
