দেশে প্রায় ২০ হাজার রোগী এ রোগে ভুগছেন, চিকিৎসার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ আবশ্যক

২৩শে মে আন্তর্জাতিক ফিস্টুলা দিবস

দেশে প্রায় ২০ হাজার রোগী এ রোগে ভুগছেন, চিকিৎসার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ আবশ্যক

ফন্ট সাইজ:

২৩শে মে “আন্তর্জাতিক ফিস্টুলা দিবস”। বিশে^ প্রায় ২০ লাখ নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ’ নারী নতুন করে প্রসবজনিত সমস্যার কারণে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে সহনশীল রেখে মানব সমাজের জীবনযাত্রার চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ২০১৫ সালে টেকসই উন্নয়নের ১৭টি নীতি গ্রহণ করে। টেকসই উন্নয়নের একটি অভীষ্ট লক্ষ্য হল “সকল বয়সী সকল মানুষের জন্য সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ”। এই অভীষ্ট লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সরকার দেশের অন্যান্য সংস্থার টেকনিক্যাল সহায়তায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা মুক্ত করার একটি বড় উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা মুক্ত করার কাজে সামনে থেকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের মধ্যে অন্যতম আমেরিকা প্রবাসী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হোপ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ডা. ইফতিখার মাহমুদ। ফিস্টুলা নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।

প্রসবজনিত প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী? প্রসঙ্গে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা হলো মূত্রাশয় এবং/অথবা মলদ্বারের মধ্যে একটা ক্ষত/গর্ত যার ফলে অনবরত প্রস্রাব/পায়খানা নির্গত হয়। প্রসবের সময় কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়, অথবা অতিরিক্ত বিলম্ব হয়। তাহলে প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন স্থানে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, পেশী নষ্ট হয়ে যায়, এবং অনেক সময় পেশী পচে যায়। ফলে প্রস্রাবের থলি ও মাসিকের রাস্তা যুক্ত হয়ে যায়। এটাই ফিস্টুলা। তখন প্রস্রাবের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, অনেক ক্ষেত্রে পায়খানার ওপরও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রস্রাব অনবরত ঝরতে থাকে। যত দিন যায়, পরিস্থিতি তত খারাপের দিকে যেতে থাকে। নারীর শরীর থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে।

প্রসবজনিত ফিস্টুলার কী চিকিৎসা আছে? জানতে চাইলে ডা. ইফতিখার মাহমুদ বলেন, যদি ফিস্টুলা হওয়ার স্বল্প সময়ের মধ্যে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়া যায় তখন বিনা সার্জারিতে ফিস্টুলা ভাল করা সম্ভব। কিন্তু যাদের ফিস্টুলা দীর্ঘ সময় ধরে আছে তাদের চিকিৎসা অপারেশন ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। ফিস্টুলা অপারেশন জটিল এবং একমাত্র দক্ষ সার্জনরাই এই অপারেশন করতে পারেন। বাংলাদেশে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসক আছেন, যারা ফিস্টুলা অপারেশন এ ট্রেনিং প্রাপ্ত এবং দক্ষ। তবে চিকিৎসার আগে কীভাবে ফিস্টুলা প্রতিরোধ করা সম্ভব, তা নিয়ে ভাবতে হবে। গর্ভধারণের পর থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অপরিহার্য। প্রসব পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফলাফলে এক ধরনের সামঞ্জস্য থাকে। অস্বাভাবিক কিছু দেখা দিলে চিকিৎসক তা গর্ভবতী মাকে অবহিত করে থাকেন। কোথায় প্রসব হবে, তার প্রস্তুতি থাকতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল বাড়ি থেকে দূরে থাকে। এসব ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথা উঠলে গর্ভবতী নারীকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

হাসপাতালে বা ক্লিনিকে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে প্রসব করাতে হবে। তারপরও গর্ভে কোনো শিশু মারা গেলে প্রসূতি মাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।
সামাজিকভাবে কেন ফিস্টুলা রোগীকে হেয় হয়ে থাকতে হয়- প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফিস্টুলা একটি অত্যন্ত মানসিকভাবে ক্ষতিকর ব্যাধি। ফিস্টুলায় আক্রান্ত হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে। অনবরত মূত্র অথবা/এবং মল ঝরার কারণে শরীর থেকে সারাক্ষণ দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। ফিস্টুলা আক্রান্ত মায়েরা শারীরিকভাবে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে প্রায় অক্ষম। সাধারণত স্বামীরা তাদের পরিত্যাগ করে। অনেক সময় বাবা/মা বা অন্যান্য নিকট আত্বীয়দের কাছেও আশ্রয় পান না। অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় জীবন কাটাতে হয়। গোয়ালঘরে থাকতে হচ্ছে এমন নজিরও আছে। তীব্র লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর জীবন কাটে।

নারী বা মাতৃস্বাস্থ্যের অনেক বিষয় থাকলেও ফিস্টুলা নিয়ে আপনার কাজ করার আগ্রহ তৈরির কারণ কী ? উত্তরে এই চিকিৎসক বলেন, ১৯৯৯ সালে আমি কক্সবাজার এলাকায় একটি ক্লিনিক চালু করি। সেই ক্লিনিক পরে কক্সবাজার এলাকায় হোপ হাসপাতাল নামে মা ও শিশু স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা দেয়া শুরু করে। ২০১০ সালে ওই হাসপাতালে কাজ করতে দুই সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন ধাত্রী এসেছিলেন। হাসপাতালে কাজের সময় ও গ্রামে ঘুরে তিনি জানতে পারেন, কক্সবাজার এলাকায় বহু নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আমাকে বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেন। পরে বুঝতে পারি যে এ সমস্যা শুধু কক্সবাজার এলাকার সমস্যা নয়, পুরো বাংলাদেশের বহু নারীই ফিস্টুলায় আক্রান্ত। পরে আমি যুক্তরাষ্ট্রের ফিস্টুলা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তারা ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করার জন্য আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়।

আরও পড়ুন:
Measles (হাম)

বৈশ্বিকভাবে ফিস্টুলার প্রকোপ কেমন এবং বাংলাদেশে সমস্যাটি কত বড় জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সারা বিশ্বে প্রায় ২০ লাখ নারী ফিস্টুলায় আক্রান্ত। আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোতে ফিস্টুলার প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় এক হাজার থেকে ১২শ’ নারী নতুন করে প্রসবজনিত সমস্যার কারণে ফিস্টুলায় আক্রান্ত হচ্ছেন।

দেশে ফিস্টুলা নিয়ে কেমন কাজ হচ্ছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফিস্টুলার ব্যাপারে সরকারের একটি কৌশলপত্র আছে। ২০১৬ সালে সরকার এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্সও করেছিল। সরকার ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে আছে ম্যাপস (ঢাকা), কুমুদিনী হাসপাতাল (টাঙ্গাইল), হোপ (কক্সবাজার), ল্যাম হাসপাতাল (দিনাজপুর), আদ্-দ্বীন হাসপাতাল (ঢাকা)। এ ছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফিস্টুলার সার্জারি হওয়ার কথা।

হোপের বর্তমানে ফিস্টুলা কার্যক্রমের পরিধি কেমন জবাবে ডা. ইফতিখার মাহমুদ বলেন, হোপ ফাউন্ডেশন ২০১০ সালে ফিস্টুলা নিয়ে কাজ শুরু করে। ২০২৩ সাল থেকে কক্সবাজারে হোপ ম্যাটারনিটি অ্যান্ড ফিস্টুলা সেন্টার নামে একটি ১২০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করছে, যেখানে একজন ফিগো অ্যাডভান্স লেভেল প্রশিক্ষিত সার্জনের নেতৃত্বে ফিস্টুলা চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষায়িত দল রয়েছে। এই ফিস্টুলা দলে দু’জন সার্জন ও ১৩ জন নার্সসহ প্রায় ৪০ জন সদস্য রয়েছেন। ফিস্টুলা নির্মূল করার লক্ষ্যে হোপ চট্টগ্রাম, বরিশাল, ঢাকা ও সিলেট বিভাগে ফিস্টুলা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ফিস্টুলা সার্জারি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, সাভার পাইলেরিয়া হাসপাতাল, বরিশাল শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল, বরিশাল মমতা হাসপাতাল।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূলে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী জানতে চাইলে তিনি জানান, হোপ চট্টগ্রাম বিভাগে ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করছে এক দশকের বেশি। সম্প্রতি বরিশাল, ঢাকা ও সিলেট বিভাগে ফিস্টুলা কার্যক্রম সম্প্রসারিত করেছি। দেশে হাতে গোনা কয়েকটি সংগঠন বা হাসপাতাল ফিস্টুলা নিয়ে কাজ করছে। এদেরকে নিয়ে একটি মোর্চা গড়ে তোলা সম্ভব হলে ফিস্টুলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শক্তি বাড়বে এবং এর মাধ্যমে দেশ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল করতে চাই।

দেশ থেকে কীভাবে ফিস্টুলা নির্মূল করা সম্ভব- প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফিস্টুলা অপারেশন করে ভুক্তভোগী মায়েদের সুস্থ করার পাশাপাশি আমাদেরকে অবশ্যই প্রতিরোধের দিকেও নজর দিতে হবে। এই লক্ষ্যে মানসম্মত মাতৃত্ব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে সার্বজনীনভাবে। সকল মায়েদের একজন দক্ষ মিডওয়াইফ দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে যাতে করে সবাই গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব এবং প্রসবোত্তর সেবা পান। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ মিডওয়াইফ প্রশিক্ষিত করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওনাদের কাজের ব্যবস্থা করলেই একমাত্র সার্বজনীন মাতৃস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারি, বেসরকারি সংস্থাসহ সবার সহযোগিতা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় দেশের সমস্ত ফিস্টুলা রোগীকে চিকিৎসার আওতায় এনে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করা সময়ের দাবি। ফিস্টুলা বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশকে ফিস্টুলা মুক্ত করতে হলে দেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার কারিকুলামে ফিস্টুলাকে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং দেশে ফিস্টুলা চিকিৎসার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক বলে তিনি মনে করেন।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন