কলকাতা, ইস্ট বেঙ্গল, রশিদের মুনাজাত

কলকাতা, ইস্ট বেঙ্গল, রশিদের মুনাজাত

ফন্ট সাইজ:

কলকাতার আকাশে তখন লাল-হলুদের উল্লাস। কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষের গর্জন। ম্যাচের বয়স ৭৩ মিনিট। বিপিনের পাস থেকে রশিদের ডান পায়ের আলতো টাচ। বল জালে। ইন্টার কাশীর গোলকিপার পরাস্ত। মুহূর্তেই যেন বিস্ফোরিত হলো আবেগ, ইতিহাস, স্মৃতি আর অপেক্ষা। বাজির শব্দে, পতাকার ঢেউয়ে, কান্না-মেশানো হাসিতে ডুবে গেল গ্যালারি। পিছিয়ে থেকেও ২-১ গোলে জয়। ভারতসেরা ইস্ট বেঙ্গল এফসি। ২২ বছর পর আবার সর্বভারতীয় ট্রফি।

কিন্তু গোলের পর আরেকটি দৃশ্য আরও বড় হয়ে ওঠে। রশিদ দুই হাত প্রসারিত করে মুনাজাতে হাত তুলেছেন। কোনো উল্লাস নেই, কোনো প্রদর্শন নেই। আছে কৃতজ্ঞতা, বিনয়, মানুষের ভেতরে ভালোবাসা জাগানোর প্রয়াস আর আল্লাহর প্রতি আস্থা তথা ঈশ্বরবিশ্বাস। সেই মুনাজাত যেন শুধু একটি গোলের জন্য ছিল না—ছিল সহাবস্থানের পক্ষে, বাংলার বহুত্ববাদী আত্মার পক্ষে এক বিদেশি মুসলিম ফুটবলারের নীরব প্রার্থনা।

আজকের ভারতীয় তথা পশ্চিবঙ্গের রাজনীতির বাস্তবতায় এই দৃশ্যের তাৎপর্য গভীর। এমন এক সময়ে এই মুনাজাত দেখা গেল, যখন পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের নানা জায়গায় সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় আক্রান্ত হয়ে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলন নিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির খবর শোনা যায়। কোথাও কোরবানি বন্ধের দাবি, কোথাও আজানের শব্দ নিয়ে উত্তেজনা, কোথাও রাস্তায় নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে হামলা, কোথাও দাড়ি-টুপি দেখেই হেনস্তা। রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্রতিবেশীও কখনো কখনো অপরিচিত হয়ে উঠছে। বাড়িঘর, দোকানপাটে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও মানুষের মনে ভয় তৈরি করছে। দিয়েছে রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা, যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সঙ্কুল পরিস্থিতিতে শান্তিবাদী মানুষ পেরিয়ে এসেছে।

এই আবহে রশিদের মুনাজাত কেবল একজন ফুটবলারের ধর্মীয় অনুভূতি নয়। এটি বাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের প্রতীক। কারণ বাংলা—বিশেষত অখণ্ড বাংলা—শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সহাবস্থান, মিলন ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণের ভূখণ্ড। এখানে লালন ফকির যেমন ছিলেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথও। এখানে কীর্তনের সুরের পাশে আজানের ধ্বনি অপরিচিত ছিল না। এখানে দুর্গাপূজার মণ্ডপে মুসলমান কারিগরের হাত ছিল, আবার ঈদের সেমাই পৌঁছে যেত হিন্দু প্রতিবেশীর ঘরেও।

ইস্ট বেঙ্গল এফসি নিজেও তো সেই ইতিহাসের ধারক। “ইস্টবেঙ্গল” নামটি কেবল একটি ক্লাব নয়; এটি উদ্বাস্তু স্মৃতি, পূর্ববঙ্গের মানুষের বেদনা, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। দেশভাগের পর যাঁরা ভিটেমাটি হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলেন, তাঁদের কান্না, অপমান, সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ক্লাবের ইতিহাস। সেই পূর্ববঙ্গ ছিল বহুত্ববাদী, লোকজ, অসাম্প্রদায়িক এক সামাজিক জগত। তাই ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে যখন রশিদের মতো একজন মুসলিম ফুটবলার গোল করে মুনাজাত করেন, তখন সেটি আসলে পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্যের সঙ্গেই মিলে যায়।

খেলাধুলার সৌন্দর্য এখানেই—এটি পরিচয়ের দেয়াল ভাঙতে পারে। গ্যালারিতে তখন কেউ রশিদের ধর্ম দেখেনি; সবাই দেখেছে তাঁর গোল, তাঁর নিবেদন, তাঁর ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা এবং মানবিক সহাবস্থানের বার্তা। লাল-হলুদের উল্লাসে ধর্মের বিভাজন মুছে গিয়েছিল। ফুটবল তখন মানুষকে আবার মনে করিয়ে দেয়—সহাবস্থান সম্ভব, সম্প্রীতি সম্ভব, একসঙ্গে জয় উদযাপনও সম্ভব।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যদি উগ্র হিন্দুত্বের ছাপ ক্রমশ প্রবল হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বাংলার আত্মার ওপর। কারণ বাংলা কখনো একরৈখিক পরিচয়ের ভূখণ্ড ছিল না। এই ভূখণ্ডের শক্তি তার বৈচিত্র্যে। এখানে ধর্মীয় পরিচয় ছিল, কিন্তু সেটি মানবিক সহাবস্থানকে গ্রাস করেনি। আজ সেই ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করার প্রয়োজন রয়েছে।
রশিদের মুনাজাত তাই শুধু ফুটবলের মুহূর্ত নয়। এটি উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মিলন, ঐক্য ও সম্প্রীতির একটি প্রতীক। এই প্রতীক মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রার্থনা ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, বরং বোঝাপড়ার সেতু হতে পারে। যদি একটি স্টেডিয়ামে হাজারো মানুষ একজন মুসলিম ফুটবলারের মুনাজাতের আনন্দ ও আকুতি নিজেদের বিজয়ের মধ্যে খুঁজে পায়, তবে সমাজ-রাজনীতিও কি সেই সহনশীলতা শিখতে পারে না?

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণে ফুটবলার রশিদের মুনাজাত সবাইকে একটি বড় সত্যের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়—মানুষের সহাবস্থানই বাংলার প্রকৃত শক্তি। সম্প্রীতি মানে সবাই একরকম হয়ে যাওয়া নয়; বরং ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন পরিচয় নিয়েও পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রাখা। যে বাংলায় মসজিদের পাশেই পূজার ঢাক বেজেছে, যে বাংলায় ঈদের সেমাই ও দুর্গাপূজার প্রসাদ একই প্রতিবেশিতার অংশ হয়েছে, সেই বাংলাকে ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতির কাছে সমর্পণ করা যায় না। স্টেডিয়ামের লাল-হলুদ গ্যালারিতে যেমন রশিদের গোল ও মুনাজাত একসঙ্গে উল্লাসের জন্ম দিয়েছে, তেমনি সমাজেও হিন্দু-মুসলমান, নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মিলিত সহাবস্থানই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় জয়। পশ্চিমবঙ্গেরর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনা আজ যেন আবারও বিভাজিত সমাজকে সেই পথেই আহ্বান জানাচ্ছে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন