দেশ আজ এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের বেডে ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা। মায়ের বুক খালি হয়ে যাচ্ছে, বাবার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা যেন নির্বিকার। আমাদের মুখে অনুশোচনা নেই, বিবেকবানদের কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই, আর মানবতার নামে যারা এতদিন রাজপথ কাঁপিয়েছেন, তাদের বড় একটি অংশ আজ অদ্ভুতভাবে নীরব।
হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এখন আর শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, প্রশাসনিক অবহেলা এবং নৈতিক পতনের নির্মম প্রতীক। যে রোগ পৃথিবীর বহু দেশের বাংলাদেশ বহু আগেই নিয়ন্ত্রণে এনেছে, সেই হামই আজ বাংলাদেশে শত শত শিশুর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৭৫ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ জনের। বাকি শিশুরাও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
এই মৃত্যু কোনো প্রাকৃতিক দুর্ভাগ্য নয়; এগুলো অবহেলার মৃত্যু, ব্যর্থতার মৃত্যু। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই বিপর্যয়ের আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। UNICEF অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে লেখা অন্তত পাঁচটি চিঠিতে সম্ভাব্য টিকা সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছিল। শুধু চিঠিই নয়, অন্তত ১০টি বৈঠকে সরকারের কর্মকর্তাদের একই সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছিল। ইউনিসেফ স্পষ্টভাবে বলেছিল, টিকা সংগ্রহের বিদ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা পরিবর্তন করে জটিল উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে গেলে সময়মতো টিকা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা শোনা হয়নি।
ফলে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়েছে, তারপর শুরু হয়েছে শিশু মৃত্যুর মিছিল। দেশে চলতি বছর হামে আক্রান্ত হয়েছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের বেশির ভাগই শিশু। ইতিমধ্যে মারা গেছে ৪৭৫ জন। গত আড়াই দশকে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ কখনো ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় ২৬ হাজার মানুষ। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এমনকি ২০২৫ সালে শনাক্ত রোগী ছিল মাত্র ১৩২ জন। অথচ আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ আবার মহামারির রূপ নিয়েছে।
এটি কি শুধু প্রশাসনিক ভুল, নাকি এটি ভয়াবহ দায়িত্বহীনতা?
ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, উন্মুক্ত টেন্ডার পদ্ধতিতে টিকা আনতে প্রায় এক বছর সময় লাগে, অথচ ইউনিসেফের মাধ্যমে দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেছেন, ইউনিসেফ সব সময় সত্যের পক্ষে। এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি স্পষ্ট করে দেয়—সতর্কবার্তা ছিল, আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল, বিকল্প সমাধানের পথও দেখানো হয়েছিল। তবুও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
অর্থাৎ এই মৃত্যুগুলো কেবল দুর্ভাগ্যের ফল নয়; এগুলো রাষ্ট্রীয় অবহেলার ভয়ংকর পরিণতি।
একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণ হারানো নয়; একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া। যে মা বহু বছরের অপেক্ষার পর সন্তান কোলে পেয়েছিলেন, সেই সন্তানকে হাম কেড়ে নিলে তার কান্না শুধু ব্যক্তিগত শোক থাকে না—তা পুরো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ হয়ে ওঠে। হাসপাতালের করিডরে সন্তানের নিথর দেহ বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার চোখের জল আসলে এই রাষ্ট্রের ব্যর্থতার নীরব সাক্ষ্য।
এই কারণেই দেশের উচ্চ আদালতও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছেন। হাইকোর্ট জানতে চেয়েছেন—শিশুদের বাঁচাতে সরকার কী করেছে? কেন একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে না? কেন নিহত শিশুদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না? অর্থাৎ বিষয়টি এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
প্রাসঙ্গিকভাবে এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, যারা একসময় মানবতা, পরিবেশ, নারী অধিকার, গণতন্ত্র আর ন্যায়ের কথা বলে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন, তাদের বড় একটি অংশ আজ নিশ্চুপ। ওসমানী উদ্যানে গাছ কাটার প্রতিবাদে কান্না হয়েছিল, গাছ জড়িয়ে ধরে ছবি তোলা হয়েছিল, ‘বৃক্ষ হত্যা অপরাধ’ লেখা ফেস্টুন উড়েছিল। অথচ আজ যখন শিশুরা মারা যাচ্ছে, তখন সেই চোখে জল নেই কেন? গাছের জন্য কান্না আছে, কিন্তু শিশুর জন্য নেই কেন?
ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের সময় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় রাস্তায় নেমেছিল তারকারা। ২০২৪ সালের আন্দোলনে বৃষ্টিভেজা আবেগে রাজপথ মুখর হয়েছিল। কিন্তু আজ হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা শিশুদের জন্য সেই আবেগ কোথায়? মানুষ এখন এই নীরবতার অর্থ বুঝে গেছে।
বাংলাদেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশ বহু বছর ধরে নির্বাচিত কিছু ইস্যুতে মানবতার কথা বলেছে। যেখানে ক্যামেরা আছে, আন্তর্জাতিক ফান্ডিং আছে, মিডিয়ার আলো আছে—সেখানে প্রতিবাদ আছে। কিন্তু গ্রামের হাসপাতালের বারান্দায় কান্নারত মা, টিকা না পেয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া শিশু কিংবা ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা—এসব যেন তাদের বিবেককে স্পর্শ করে না।
আজ মানুষ আরও একটি ভয়ংকর বাস্তবতা দেখছে। ক্ষমতা বদলায়, মুখ বদলায়, স্লোগান বদলায়; কিন্তু লুণ্ঠনের চরিত্র বদলায় না। শেখ হাসিনার আমলে যেসব অভিযোগ উঠেছিল—দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার, গুম-খুন ও দমন-পীড়ন। অর্থাৎ মানুষ হত্যা, গুম, খুন, নির্যাতন, ব্যাংক লুটপাট এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবি ওঠেছে। একইভাবে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং ভয়াবহ ব্যর্থতার অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হতে হবে—এমন প্রশ্ন এখন জনমনে আরও জোরালো হচ্ছে।
কারণ অভিযোগ হলো, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল। আর ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে—তারা চরম উদাসীনতা, অদক্ষতা এবং নীতিগত ব্যর্থতার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের বৃহৎ অংশের কাছে এই ব্যর্থতা কেবল প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি এক নির্মম নৈতিক অপরাধ।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগগুলোও সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতায় থাকার সময় একাধিক উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনিক নিয়োগ, টেন্ডার, প্রকল্প, ব্যাংকিং ও ব্যবসায়িক সুবিধা নিয়ে অনিয়মে জড়িয়েছেন। বিপুল অর্থ পাচার করেছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রেও
একই ধরনের অভিযোগ উঠলে সেটার তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বিচার প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে বড় কথা, এই লুণ্ঠন আর অবহেলার সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। একটি সভ্য রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিককে রক্ষা করে। কিন্তু বাংলাদেশে আজ শিশুর জীবনও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, অবহেলা আর অদক্ষতার কাছে পরাজিত।
এই মৃত্যুগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। টিকা সংকট কেন তৈরি হলো, কারা দায়ী, কেন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলো—সব সত্য জনগণের সামনে আসতে হবে। যদি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, দুর্নীতি বা দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্র যদি শিশুদের জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং কাল বিলম্ব না করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ, ওরা শিশু হত্যাকারী, ওরা লুণ্ঠনকারী, ওদের ক্ষমা নেই।
