জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট

ফন্ট সাইজ:

ঈদুল-আজহাকে ঘিরে সারা দেশে জমে উঠেছে কোরবানির পশুর হাট। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই হাটে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম। খামারে কোরবানির পশুর পরিচর্যা করে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন খামারিরা। তবে, এবার পশুর হাটে চাহিদার তুলনায় অধিক পশুর সমাগম ঘটেছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ও খামারিরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে-

রাজশাহী
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজশাহীতে জমে উঠেছে পশুর হাট। জেলার ঐতিহ্যবাহী সিটি হাটসহ বিভিন্ন স্থানীয় হাটে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। তবে চাহিদার তুলনায় পশুর সরবরাহ বেশি থাকায় বাজারে ক্রেতার চেয়ে পশুর সংখ্যাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন খামারিরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর রাজশাহীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১১টি গবাদিপশু। এর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮৪১টি গরু, ৩ হাজার ৪২৫টি মহিষ, ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৩৯টি ছাগল এবং ৪৩ হাজার ৪০৬টি ভেড়া। বিপরীতে জেলার চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি পশু। ফলে প্রায় ৯২ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকছে, যা দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হবে। রাজশাহীর সিটি হাটে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে পশু নিয়ে হাটে ভিড় জমাচ্ছেন গরু ব্যবসায়ী ও খামারিরা। রাজশাহী জেলা ছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রাকভর্তি গরু নিয়ে সিটি হাটে আসতে দেখা যায় খামারিদের। তবে ঈদের আরও বেশ কয়েকদিন বাকি থাকায় সেভাবে ক্রেতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। তবে খামারিরা বলছেন, দু-একদিন পর থেকেই ভালো বেচাকেনা হবে।

এ ছাড়াও রাজশাহীর সোনাইচাঁদী, কাঁকনহাট, দামকুড়া, সাবাই, বানেশ্বর, কাটাখালী, নওহাটা, কেশরহাট ও তেবাড়িয়া হাটেও পশু বেচাকেনা জমে উঠেছে। অনেকে আবার সরাসরি খামার বা গার্হস্থ্য বাড়ি থেকেই পশু কিনে আগাম বুকিং দিচ্ছেন। হাটে থাকা খামারিরা বলছেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় এবার পশু লালন-পালনের খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে তারা ন্যায্যমূল্য না পেলে লোকসানের মুখে পড়বেন। সুরেন্দ্রনাথ নামের এক খামারি বলেন, “প্রতি কেজি মাংসের দাম যদি ৮০০ টাকার মধ্যে না পাই, তাহলে আমাদের লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হবে। কারণ এ বছর পশু লালন পালন করতে আমাদের অর্থ বেশি ব্যয় হয়েছে। পবা উপজেলার টিকর গ্রামের খামারি রমজান আলী জানান, খাদ্য ও পরিচর্যা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এবার পশু উৎপাদনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। তাই সরকারিভাবে বাজার মনিটরিং ও খামারিদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, হাটে সক্রিয় দালাল চক্র অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে পশুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত দামে পশু কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ছাড়া কয়েকদিনের তীব্র গরমে হাটে আসা মানুষজনও ভোগান্তিতে পড়েছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান বলেন, “একসময় ভারতীয় গরু আসায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। এবার সীমান্তে বাড়তি নজরদারি নেয়া হয়েছে, যাতে অবৈধভাবে গরু প্রবেশ করতে না পারে। স্থানীয় খামারিদের স্বার্থরক্ষায় প্রশাসন কাজ করছে। রাজশাহী অঞ্চলে এবার পশুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি থাকায় বাজার স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে হাটগুলোতে নজরদারি ও মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।

মাগুরা
মাগুরা প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মাগুরার খামারিরা। জেলার বিভিন্ন খামারে চলছে গবাদিপশু পরিচর্যা ও বাজারজাতের শেষ প্রস্তুতি। লাভের আশায় দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তারা। মাগুরা সদরের মঘী ইউনিয়নের ছয়চার গ্রামে ঈদের আগে খামারিরা ব্যস্ত সময় পার করছে। মাগুরা জেলার বিভিন্ন খামারে গিয়ে দেখা যায়, খামারিরা কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। সারা বছর লালন-পালন করা পশুগুলোকে ঈদ উপলক্ষে বিক্রির আশায় প্রস্তুত করা হচ্ছে। অনেকেই দেশীয় পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে পশু মোটাতাজা করছেন।

খামারি মো. খায়রুজ্জামান সবুজ বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় খরচও অনেক বেড়েছে। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে পশু আমদানি না হলে ভালো দামের পাশাপাশি খামারিরা লাভবান হবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন খামারিরা। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, এবার জেলায় কোরবানির চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত রয়েছে। খামারিদের পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিহির কান্তি বিশ্বাস জানান, খামারিদের নিরাপদ ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে মাগুরাতে গরু কোরবানির চাহিদা রয়েছে ৬২ হাজার ৫০৮টি, চাহিদার তুলনায় প্রস্তুত রয়েছে ৭৬ হাজার ৯৭৪টি গবাদিপশু। চাহিদার তুলনায় ১৪ হাজার পশু অতিরিক্ত থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহের কথা জানান জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা। এবারের ঈদে পশুর ন্যায্য দাম পেলে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সুফল মিলবে এমনটাই প্রত্যাশা করছেন জেলার খামারিরা।

শায়েস্তাগঞ্জ
শায়েস্তাগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি: হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে পবিত্র কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে জমে উঠেছে পশুর হাট। স্থানীয় খামারি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বেপারীদের হাঁকডাকে মুখরিত চারপাশ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পশু কেনাবেচা। হাটে পশুর রেকর্ড সরবরাহ ও বৈচিত্র্য এবারের হাটে পশুর সরবরাহ গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেক বেশি। শায়েস্তাগঞ্জের স্থানীয় খামারিরা সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালন করা পশু হাটে এনেছেন। হাটে আকর্ষণ বাড়াচ্ছে বিশালাকার সব শাহিওয়াল, নেপালি ও ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়। মাঝারি ও ছোট আকারের দেশি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকলেও, বড় গরু দেখতে উৎসুক জনতার ভিড় ও কম নয়। এ ছাড়া হাটের এক পাশে ছাগল ও মহিষের পর্যাপ্ত সরবরাহ লক্ষ্য করা গেছে।

খামারিরা জানান, বাজারে ভুসি, খৈল ও কুঁড়াসহ সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালনের খরচ আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে পশুর ন্যায্য মূল্য না পেলে অনেক প্রান্তিক খামারি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। তবে ভারতীয় বা অবৈধ বিদেশি পশুর অনুপ্রবেশ বন্ধ থাকায় দেশি পশুর ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন স্থানীয় বেপারীরা। ক্রেতাদের বাজেট ও কেনাবেচার ধরনহাটে আসা ক্রেতাদের বড় অংশই ঝুঁকছেন ছোট ও মাঝারি আকৃতির গরুর দিকে। মধ্যবিত্ত ক্রেতারা সাধারণত ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে পশু খুঁজছেন। অনেক ক্রেতা হাটের শুরুর দিকে দাম যাচাই করছেন এবং শেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। এদিকে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া হাটের বিভিন্ন পয়েন্টে ইজারাদারদের পক্ষ থেকে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিন বসানো হয়েছে, যাতে আর্থিক লেনদেনে কেউ প্রতারিত না হন।

ঘোড়াঘাট
ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ৪ ইউনিয়ন ও এক পৌরসভায় ৬৫৪টি ছোট-বড় খামারে প্রায় ৭ হাজার ২৪৮টি পশু ও গৃস্থ পরিবারে আনুমানিক ৮ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, কোরবানির জন্য খামার পর্যায়ে এবার ৭ হাজার ২৪৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ষাঁড় ১ হাজার ৫০৫, বলদ ৮০৩, গাভী ২ হাজার ৪০৮টি, মহিষ ২টি, ছাগল ৩ হাজার ৫৬০ ও ভেড়া ৭০টি এবং গৃস্থ পরিবারে আরও আনুমানিক ৮ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। এ উপজেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৬ হাজার ৫০০টি, তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও উদ্ধৃত থাকবে প্রায় ৯ হাজার পশু। বর্তমানে খামারিরা তাদের গরু পরিচর্যা ও মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। প্রাকৃতিক উপায়ে সবুজ ঘাস, খৈল, কুটা, দানাদার খাদ্য ও দেশীয় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের মাধ্যমে গরুসহ পশুগুলোকে হৃষ্টপুষ্ট করার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছেন।

এদিকে গরুর খামারিরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম অনেক বেশি হওয়ায় পশু পালন ব্যয় বেড়েছে। তারপরও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তারা আশা করছেন, বাজারে পশুর ভালো দাম পাবেন। উপজেলার রাণীগঞ্জ বাজার এলাকার খামারি ইমরান নাজির বাপ্পী বলেন, প্রথম দিকে গরুর ক্রেতা তেমন না মিললেও বর্তমানে গরুর বাজারে ক্রেতা বাড়তে শুরু করেছে। বাজারে বিভিন্ন আকার ও দামের গরু উঠছে, আর ভালো দাম পাওয়ার আশায় খামারিরা এখন বেশ আশাবাদী। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রবিউল ইসলাম জানান, উপজেলায় আমরা ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করেছি। উক্ত ভেটেরিনারি টিম উপজেলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তারা মূলত হাটে বিক্রির জন্য আসা গবাদিপশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন, হাটে অসুস্থ পশু থাকলে বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন। এ ছাড়া রোগাক্রান্ত বা কোরবানির অনুপযুক্ত পশু শনাক্ত করে তা বিক্রি বন্ধের ব্যবস্থা করেন।

কোনো গাভী গর্ভবতী কিনা তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হন, যাতে গর্ভবতী গাভী কোরবানি না হয়। এ ছাড়াও কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণে নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং ক্ষতিকর ওষুধ বা হরমোন ব্যবহার না করে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে, প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজাকরণ করতে খামারিদের পরামর্শ দিয়ে আসছি।


ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন