খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমারজেন্সি ওটিতে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নাসরিন নাহার নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগুনের আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আসার সময় অক্সিজেনের অভাবে তার মৃত্যু হয়। তিনি জেলার কয়রা এলাকার নেছার আলির মেয়ে।
এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়ায় রোগী এবং তাদের পরিজনদের মধ্যে। এ সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে অনেকে আহত হন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন— হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান (৫০), সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ। বুধবার ভোর ৬ টায় হাসপাতালের জরুরি অপারেশন থিয়েটারের আগুন ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট ১ ঘন্টার বেশি সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনে। গুরুতর আহত হয় ৩ জন নার্স। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্থ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে করেন। এর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল পরিদর্শন করেন এবং রোগীদের সার্বিক খোঁজ খবর নেন।
হাসপাতালের জরুরি অপারেশন থিয়েটারের (ইমারজেন্সি ওটি) দায়িত্বে থাকা সহকারি অধ্যাপক ডা. দিলীপ কুমার জানিয়েছেন, বুধবার সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে ইমারজেন্সি অপারেশন থিয়েটারের পাশে পোষ্ট অপারেটিভ রুম এবং পাশের স্টোর রুমের কোন একটিতে শর্টসার্কিট হয়ে থাকতে পারে। এতে এসির আউটডোর এবং পরে অক্সিজেন আউটডোরে আগুন লেগে যায়। অক্সিজেন আউটডোরের মুখে আগুন লাগার কারণে হয়তো দরজা বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ওটি তে থাকা দুইজন নার্স ও একজন ডাক্তার আগুন চলাকালীন সময় জালানা দিয়ে লাফ দিয়েছে। তিনজনই চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে বড় ধরনের কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওটি বিভাগে ১৫ টা সিট ১৫ টায় রোগী ছিল। আগুন লাগার পরপরই রোগীদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে কিভাবে কি কারনে আগুন লেগেছে তা সঠিক তথ্য এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। রোগের স্বজনরা জানান, আগুন লাগার ঘটনায় খুলনা মেডিকেল হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে স্বজনরা হাসপাতাল থেকে রোগীদের চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নিয়ে যান।
ওয়ার্ডবয় রেজাউল ইসলাম বলেন, ধারণা করা হচ্ছে স্টোর রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। কিভাবে হয়েছে বলা যাচ্ছে না। ধোয়ায় ওটি ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের কোন কিছু দেখা যাচ্ছিল না। পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে মুমুর্ষ রোগীদের পিছন দরজা থেকে বের করা হয়। আইসিইউ এর কিছু রোগী বের করা হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নার্সদের উদ্ধার করেন। ২ জন নার্স অসুস্থ হয়ে পড়েন তাদের বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। একজন নার্স তিন তলা থেকে নামানোর সময় পড়ে যান। তবে এ ঘটনায় কোন রোগী আহত হননি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট আগুন নির্বাপনে কাজ শুরু করে। এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
রোগী ও রোগীর স্বজনরা জানান, অগ্নিকান্ডের সময় বেশিরভাগ লোক ঘুমে ছিলেন। স্টোর রুমের আগুন লাগার পর তা ছড়িয়ে পড়ে ওটির সব কিছু পুড়ে যায়। সবাই আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে নিরাপদে নিচে নেমে হাসপাতালের মাঠে অবস্থান করেন। অনেকে তাদের রোগীদের অন্যান্য হাসপাতালে নিয়ে যান।
তারা অভিযোগ করেন, ওটিতে ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চলে। সেখানে এভাবে আগুন লেগে সব পুড়ে যাওয়ার ঘটনাটি রহস্যজনক। এর সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
জানা গেছে, আগুনের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন। এছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্স দিপালী ও শারমিনকে ভবন থেকে উদ্ধার করে নিচে নামানোর সময় ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ আহত হন। পরে দিপালী ও শারমিনকে চিকিৎসার জন্য খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. হোসেন আলী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শর্ট সার্কিট অথবা এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্তের পর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খুমেক হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী আনসার কমান্ডার এসিপি মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় গ্রিল কাটতে গিয়ে গ্রিল ভেঙে পড়ে দুইজন স্টাফ নার্স ও ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আহত হন। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ বলেন, ভোর ৬ টার দিকে আমরা আগুন লাগার খবর পেয়ে বয়রা থেকে ৩টি ইউনিট এসে কাজ শুরু করি। পরবর্তীতে আরও ৭টি ইউনিট এসে কাজ শুরু করে। প্রায় ১ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে চার তলা ভবনের ৩ তলার স্টোর রুমে আগুন ছিল। প্রথমে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সব গেটে তালা দেয়া ছিল যা ভেঙে ভিতরে ঢুকতে হয়েছে। প্রথমেই আমরা বেলকনি থেকে ৪/৫ জনকে উদ্ধার করি। পরবর্তীতে আগুন নির্বাপন শেষে আর কাউকে হতাহত পাইনি।
এ বিষয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, ঠিক কি কারণে আগুন লেগেছে এখনও জানা যায়নি। তবে আগুনের কারণে হাসাপাতালে অক্সিজেন সাপ্লাই ব্যহত হওয়ায় এই মুহুর্তে সকল ধরণের অপারেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। দ্রুত ঠিক করার চেষ্টা করা হবে।
