বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রেজারিপ্রধানদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সভায় সরাসরি জানতে চেয়েছেন, ডলারের বাজার কি আসলেই বাজারভিত্তিক, নাকি নির্দেশিত? উত্তরটি যা এসেছে, তা নতুন নয়, তবে এবার তা সরকারিভাবে স্বীকৃত হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ট্রেজারি প্রধানেরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের দাম নির্ধারণে নিয়মিত হস্তক্ষেপ করে, নিলামেও নির্দেশনা দেয়, এবং বিচ্যুতি ঘটলে পরিদর্শক পাঠানো হয়। এই বাস্তবতা স্বীকার করে গভর্নর বলেছেন, "হস্তক্ষেপ নয়, তদারকি চাই।" কিন্তু প্রশ্ন হলো এই দুইয়ের মধ্যে সীমারেখাটি আঁকা হবে কীভাবে এবং কখন?
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হওয়া সম্ভব নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, প্রবাসী আয় জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় স্তম্ভ, আর আমদানি নির্ভরতা এখনো অত্যন্ত বেশি। এই পরিস্থিতিতে ডলারের দাম হঠাৎ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ওঠানামা করলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা থাকে। সেই বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সক্রিয় ভূমিকা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই ভূমিকা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, নির্দেশনা অলিখিত থাকে এবং বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে স্থবির করে রাখে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ভারত একটি "ম্যানেজড ফ্লোট" ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া বাজারে হস্তক্ষেপ করে, কিন্তু তা নির্দিষ্ট নীতিকাঠামোর মধ্যে এবং প্রকাশ্যে স্বীকৃত। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াও একইভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। অন্যদিকে সম্পূর্ণ মুক্তবাজার ব্যবস্থায় পরিচালিত দেশগুলো, যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য, সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেবল চরম পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করে এবং তা সর্বদা ঘোষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সমস্যা হলো এই দুই মডেলের কোনোটিই পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে না হস্তক্ষেপ আছে, কিন্তু স্বচ্ছতা নেই; নির্দেশনা আছে, কিন্তু লিখিত নীতিমালা নেই।
এই দ্বৈততাই বাজারের প্রতি আস্থার সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যখন ব্যাংকের ট্রেজারিপ্রধানেরা নিজেরাই জানেন না কোন আচরণটি "কারসাজি" হিসেবে গণ্য হবে এবং কোনটি হবে না, তখন বাজারে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সভায় তাঁরা ঠিকই দাবি করেছেন "কারসাজির তালিকা দিলে সবাই নিয়ম মেনে চলতে পারব।" এই দাবিটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে একটি গভীর সত্য আছে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে বাজারে অংশগ্রহণকারীরা সবসময় অনিশ্চয়তায় থাকেন, যা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশীদার হতে হলে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে একটি স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক মুদ্রাবাজার গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সম্প্রতি আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্তের মধ্যেও এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু শুধু আইএমএফের চাপে নয়, দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থেই এই সংস্কার জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ ব্যাংককে তার হস্তক্ষেপের নীতি লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। কখন, কী পরিস্থিতিতে এবং কোন সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে প্রবেশ করবে তা স্পষ্ট করা না হলে বাজারের আস্থা তৈরি হবে না। পাশাপাশি ডলারের একাধিক দাম ব্যাংকিং চ্যানেলে ১২২ টাকা ৫০ পয়সা, আমদানিতে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা, ক্রেডিট কার্ডে ১২৪ টাকার বেশি এবং খোলাবাজারে ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা এই বহুস্তরীয় মূল্যকাঠামো নিজেই একটি অস্বাস্থ্যকর বাজারের লক্ষণ। একটি সুস্থ ও কার্যকর বাজারে এই ব্যবধান এতটা বিস্তৃত থাকার কথা নয়।
গভর্নরের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তিনি নিজে কর্মকর্তাদের বের করে দিয়ে সরাসরি বাজারের কণ্ঠস্বর শুনেছেন এটি সাহসী এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু সভাটি কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। বাজার সংস্কারের ক্ষেত্রে অভিপ্রায় ও উদ্যোগের মধ্যে যদি ব্যবধান থেকে যায়, তাহলে আস্থার সংকট কাটে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে, এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা নতুন করে দৃষ্টি দিচ্ছেন। এই মুহূর্তে একটি স্বচ্ছ, নিয়মভিত্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রাবাজার গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে কেবল বক্তৃতায় নয়, নীতিমালায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে তা প্রতিফলিত হতে হবে। ডলারের বাজার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক হওয়া মানে রাতারাতি সব নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া নয় বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নিয়মকানুন স্পষ্ট, হস্তক্ষেপ স্বচ্ছ এবং বাজারের অংশগ্রহণকারীরা নিশ্চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটুকু নিশ্চিত করা গেলেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গ্রামে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
