জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০শে জুলাই বিকালে ডিউটি শেষে থানা ব্যারাকে আসলে অফিসার ও ফোর্সদের মধ্যে বলাবলি করতে শুনি যে, যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন যাত্রাবাড়ি থানার কাজলা এলাকায় একজন ছাত্রকে গুলি করেছে বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দি দিয়েছেন পুলিশের একজন এসআই। আন্দোলন চলাকালে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় কর্মরত ছিলেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ তিনি এ জবানবন্দি দিয়েছেন। এদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসানকে (তাইম) হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৬ ও ১৭ নাম্বার সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ মামলায় আসামি ১১ জন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান প্রমুখসহ ৯ জন পলাতক। সাবেক ওসি আবুল হাসান ও সাবেক ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ২০শে জুলাই যাত্রাবাড়ি থানার পুরাতন ভবনের ছাদের উপরে আমি থানার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম। এসময় আমি জানতে পারে ডিএমপি এর জয়েন্ট কমিশনার সুদ্বীপ কুমার চক্রবর্তী ও ওয়ারী বিভাগের ডিসি ইকবাল হোসেন এর নেতৃত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবরোধ উঠানোর জন্য যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন ও পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওয়াহিদুল হক মামুনসহ আরো অফিসার ও বিভিন্ন ইউনিট থেকে আসা ফোর্স ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অবস্থান নেয়। ডিউটি শেষে থানা ব্যারাকে আসলে অফিসার ও ফোর্সদের মধ্যে বলাবলি করতে শুনি যে, যাত্রাবাড়ি থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন যাত্রাবাড়ি থানার কাজলা এলাকায় একজন ছাত্রকে গুলি করেছে।
এ মামলায় আরেক সাক্ষী তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আমি যাত্রাবাড়ি থানায় কনস্টেবল হিসাবে অস্ত্রাগার ইনচার্জের সহকারী হিসাবে কর্মরত ছিলাম। যাত্রাবাড়ি থানার তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ আবুল হাসান এর নির্দেশ ক্রমে অস্ত্রাগার ইনচার্জ এসআই মিজবাহ স্যার, এএসআই রবিউল, কনস্টেবল আনোয়ার মুন্সি সহকারি হিসাবে অস্ত্রাগার রেজিষ্টারে স্বাক্ষর নিয়ে অফিসার ও ফোর্সদের অস্ত্র ও গুলি বিতরণ করতাম।
১৭ই জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পূর্বাঞ্চল পুলিশ লাইন ও এপিবিএন থেকে ৫০০/৬০০ অফিসার ও ফোর্স যাত্রাবাড়ি থানায় ডিউটি করার নিমিত্তে আসত। ডিসি ইকবাল স্যার, এডিসি মাসুদ স্যার, এডিসি শামীম স্যার, এসি নাহিদ ফেরদৌস স্যার, ওসি আবুল হাসান স্যার, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জাকির স্যার, ইন্সপেক্টর (অপারেশন) মামুন স্যারদের বডিগার্ড এর মাধ্যমে অথবা অফিস সহকারী কনস্টেবল ও মনোনীত আনসার সদস্যদের মাধ্যমে যাত্রাবাড়ি থানার অস্ত্রাগার হতে অস্ত্র ও গুলি সংগ্রহ করতেন। ডিসি ইকবাল স্যার, এডিসি মাসুদ স্যার, এডিসি শামীম স্যার, এসি নাহিদ হাসান স্যার বিভিন্ন পোস্টে ওয়ারলেস এর মাধ্যমে অথবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অস্ত্র ও গুলি চাইতেন অথবা পাঠাতে বলতেন। আমরা যে ডিউটিতে থাকতাম তারা উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ (ওসি স্যার ও অস্ত্রাগার ইনচার্জ) মোতাবেক অস্ত্র ও গুলি ইস্যু করতাম। তারই ধারাবাহিকতায় ২০শে জুলাই ওসি আবুল হাসান স্যারের নির্দেশক্রমে ওসি স্যারের বডিগার্ড কনস্টেবল হাসিনুর কে ২৫ রাউন্ড শর্টগানে শিসা কার্তুজ এবং এসআই মৃগাংক শেখর তালুকদার কে ১০০ রাউন্ড চায়না রাইফেলের গুলি, ২৫০ রাউন্ড শর্টগানের শিসা কার্তুজ এবং ৪০ টি গ্রেনেড ইস্যু করে দেই, যা তারা স্বাক্ষর করে গ্রহণ করেন। ৩১শে জুলাই এএসআই ওমর ফারুক, এএসআই অমৃত চন্দ্র সেন ও এসআই মিজবাহ স্যার সহ কয়েকজন অফিসার অস্ত্রাগারে এসে আমাকে বলেন, “আমরা তো গুলি করতেছি না, তবুও আমাদের নামে ফায়ার দেখাচ্ছে, আমরা অস্ত্রাগার রেজিষ্টারের ছবি উঠাবো”। আমি রেজিষ্টার এগিয়ে দিলে তারা ছবি উঠায়। ০৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে ডেমরা থানায় আমরা যোগদান করিলে আমি এএসআই ওমর ফারুক, এএসআই অমৃত চন্দ্র সেন ও এসআই মিজবাহ স্যার কে জিজ্ঞাস করি, যারা অস্ত্রাগার রেজিষ্টারের যে ছবি তুলেছিলেন তা তখনো আছে কিনা। তারা বলে যে, তাদের মোবাইলে ঐ ছবি সংরক্ষিত আছে। আমি তখন হোয়াটসঅ্যাপ এর মাধ্যমে ঐ ছবিগুলো সংগ্রহ করে রাখি।
