২৩ শতাংশ হত্যা মামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি

সহযোগীদের খবর

২৩ শতাংশ হত্যা মামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি

ফন্ট সাইজ:

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘২৩ শতাংশ হত্যা মামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে খুনের মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় সাজানো ও মিথ্যা মামলা দায়েরের মতো ঘটনা ঘটছে। কাউকে হয়রানি বা সামাজিকভাবে হেয় করা, অর্থ আদায়, রাজনৈতিক বিরোধ ও শত্রুতাবশত এসব মামলা করা হয়। চলে ‘মামলা বাণিজ্য’। প্রচলিত আইনে মিথ্যা মামলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য– দুটোই ফৌজদারি অপরাধ। এ জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও এই প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না। পক্ষান্তরে, কেউ ন্যায়বিচার পেতে মামলা করলেও সাক্ষ্য, আলামতের অভাবে অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না।

পুলিশ সপ্তাহের শেষ দিন গত বুধবার অপরাধবিষয়ক সম্মেলনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হত্যা মামলা তদন্তের চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ১০ বছরে পিবিআই সাত হাজার ৪২৭টি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে। জেনারেল রেজিস্ট্রার বা জিআর হিসেবে এসব মামলার এজাহার (এফআইআর) সরাসরি থানায় করা হয়েছিল। সংস্থাটির তদন্ত করা ২২.৭১ শতাংশ হত্যা মামলায় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিপরীতে খুন বা ইচ্ছাকৃত হত্যার ঘটনায় চার হাজার ১৭৫টি মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী পিবিআই চার্জশিট দাখিল করেছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় অনেক মামলায় নিরপরাধ মানুষকে আসামি করে চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে। একেকটি মামলায় কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এ ধারা ১৭৩(এ) সংযোজন করে পরিপত্র জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর মাধ্যমে হয়রানিমূলক কারও নাম মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত করা হলে তদন্ত কর্মকর্তার অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও তা বিবেচনায় নিয়ে আদালতের অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়ার বিধান করা হয়েছে।

হত্যা মামলার চিত্র

পিবিআইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সাত হাজার ৪২৭টি হত্যা মামলার তদন্ত করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে হত্যার অভিযোগে ৫৬ শতাংশ মামলায় ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এর অর্থ, এজাহার দাখিলের সময় যে অভিযোগ ছিল, তদন্তে সেই অপরাধের প্রমাণ মিলেছে। ৩০৬ ও ৩০৪(ক) বা অন্যান্য ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় ৪৯৫টি মামলার। এ ছাড়া মিথ্যা অভিযোগে ১১৪টি, আইনগত ভুলে ২৩টি এবং তথ্যগত ভুলের জন্য এক হাজার ৫৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। অর্থাৎ ১ হাজার ৬৮৭টি মামলা প্রমাণ করা যায়নি।

এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে (সিআরপিসি) ও পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) অনুযায়ী মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে। এগুলো হলো– চূড়ান্ত রিপোর্ট (সত্য), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (মিথ্যা), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (তথ্যগত ভুল), চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আইনগত ভুল) ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আমল অযোগ্য)।

পিবিআই গত এক দশকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (তথ্যগত ভুল) দাখিল করেছে এক হাজার ৫৫টি মামলার। ঘটনার সত্যতা আছে, কিন্তু মামলা করার ক্ষেত্রে ভুল বা অজ্ঞতাবশত নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করা হলে, এমনকি ভুল তথ্য দেওয়া হলে তদন্ত কর্মকর্তা এ প্রতিবেদন দাখিল করেন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন (মিথ্যা) দাখিল করা হয়েছে ১১৪টি মামলায়। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়– মামলাটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা; তখন এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়। পিবিআইর তদন্তকৃত এক হাজার ৫৬৫টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল হয়েছে। কোনো মামলায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলেও চার্জশিট দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়া গেলে বা প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা না গেলে এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহরুন রুনি হত্যা মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই। এ মামলায় খুনি শনাক্ত না হলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (সত্য) দাখিল করতে হবে।

এ ছাড়া ২৩টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন (আইনগত ভুল) দাখিল করা হয়েছে। ঘটনা সত্য, তবে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়নি বা আইনের দৃষ্টিতে মামলাটি চালানোর কোনো ভিত্তি নেই– এমনটি প্রমাণিত হলে এ প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

পিবিআইর প্রধান অতিরিক্ত আইজি মো. মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত একটি শিল্পের সঙ্গে তুলনীয়। দিনের পর দিন নিবিড়ভাবে এ তদন্ত করতে হয়। চাপ, সময় বেঁধে দিয়ে মামলার সঠিক তদন্ত সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তার সততা, যোগ্যতার বিষয় যুক্ত। একটিতে বিচ্যুতি হলেই তদন্ত ভিন্ন দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’

মোস্তফা কামাল আরও বলেন, ‘অনেকে বিভিন্ন কারণে প্রকৃত অভিযুক্তদের সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের জড়িয়ে মামলা করেন। আবার পৃথিবীর কোনো দেশ শতভাগ হত্যা মামলার ক্লু উদ্ঘাটন করতে পারে না। আমাদের এখানেও এ ধরনের মামলা রয়েছে। ঘটনা সত্য হলেও দেড় হাজারের মতো মামলার ক্লু পায়নি পিবিআই। কীভাবে হত্যা মামলার তদন্তের মান আরও বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালে গত ১৬ এপ্রিল আইনমন্ত্রীর কাছে রুমিন ফারহানা জানতে চেয়েছিলেন, ‘বিগত ১৭ বছর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিথ্যা ও ভুয়া মামলার মধ্যে কত সংখ্যক মামলা তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়েছে?’

জবাবে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেন, ‘মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ভুয়া মামলাগুলোর মধ্যে কত সংখ্যক মামলা তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে– তার সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা সম্ভব নয়।’

আদালতে করা মামলার ৬২.৬৫% আসামি নির্দোষ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা (সিআর) ১৯৫টি মামলার তদন্ত করেছে পিবিআই। এতে ৮২টি মামলার অভিযোগ প্রমাণিত। এসব মামলায় মোট সাত হাজার ৬৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্তে দুই হাজার ৮৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত। চার হাজার ৭৯৫ জনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ মোট অভিযুক্তের ৬২ দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্দোষ।

পিবিআইপ্রধান মো. মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, ‘ওই সময় একটি বিশেষ পরিস্থিতি ছিল। এমন উদাহরণ আছে, একই ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। এখন দেশের কোথাও এ ধরনের মামলা করার সুযোগ নেই। অনেক যাচাই-বাছাই করে মামলা নেওয়া হয়।’

সঠিক তদন্তে যা করণীয়

পিবিআই তাদের মতামতে অজ্ঞাতপরিচয় কোনো লাশ উদ্ধারের পর কিছু করণীয় উল্লেখ করেছে। প্রথমে ক্রাইম সিন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। এরপর অননুমোদিত ব্যক্তির প্রবেশ রোধ করতে হবে। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে মৃতদেহের অবস্থান, পরিবেশ, সময় ও সাক্ষীদের বিবরণ তুলে ধরতে হবে। রক্ত, চুল, কাপড়, অস্ত্রসহ অন্যান্য বস্তুগত আলামত সঠিকভাবে সংগ্রহ করতে হবে। এসব সাক্ষ্য পরবর্তী সময়ে মামলা চলাকালে আদালতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর পর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে দ্রুত জাতীয় ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠাতে হবে। আঘাতের ধরন, সময় নির্ধারণ ও ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। ডিএনএ প্রোফাইল করতে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া তদন্তকালে প্রথমে জিডি করতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অপমৃত্যু বা নিয়মিত মামলা করতে হবে। মৃতদেহের ছবি সংগ্রহ করে দেশের সব থানায় বেতার বার্তা পাঠাতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা বা এ-সংক্রান্ত জিডি যাচাই করতে হবে।

লাশ শনাক্ত

২০১৯ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অজ্ঞাত লাশ শনাক্ত করে ২২৮টি মামলা করেছে পিবিআই। এর মধ্যে ১৫৬টি পুরুষের লাশ, ৭২টি নারীর। গত সাত বছরে অজ্ঞাত লাশ শনাক্তের হার ২৭.৬৭ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ে দুই হাজার ৩৪০টি লাশ শনাক্ত করা গেছে। শনাক্ত হয়নি ছয় হাজার ১১৬টি।

শাস্তির বিধান

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫০ ধারায় মিথ্যা অভিযোগে শাস্তির বিধান আছে। ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামিকে খালাস দেওয়ার সময় প্রমাণ পান– মামলাটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক; বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন। দণ্ডবিধির ১৯১ ও ১৯৩ ধারায় মিথ্যা সাক্ষ্যদানের শাস্তির জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের কথা বলা আছে। দণ্ডবিধির ২০৯ ধারামতে, মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে।

দণ্ডবিধির ২১১ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা মামলার সাজা হলো দুই বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় ধরনের দণ্ড। যদি মিথ্যা মামলা কোনো মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সাত বছর বা তার বেশি মেয়াদের কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ সম্পর্কে দায়ের করা হয়, তাহলে মামলা দায়েরকারী বা বাদী সাত বছর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। এর সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরকারীকে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৭ ধারাতেও মিথ্যা মামলা দায়েরের শাস্তির কথা উল্লেখ আছে।

এখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কারও ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে এই আইনের অন্য কোনো ধারায় মামলা করার জন্য আইনানুগ কারণ নেই জেনেও মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন অথবা করান, তবে সেই অভিযোগকারী অনধিক সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

প্রথম আলো

‘ক্যাম্পাসে ভয়ের সংস্কৃতি যেন আর না আসে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপাদান ছিল ভয়ের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির সূতিকাগার ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো। আবাসিক হলে গণরুম- গেস্টরুম সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করা হতো ক্যাম্পাসগুলোতে। ফ্যাসিবাদী সেই ভয়কে প্রতিরোধ করেই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল জুলাইয়ে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে শেখ হাসিনার পলায়ন পর্ব শেষে জুলাইয়ের ঐক্য নানাভাবে বিনষ্ট হয়েছে, যার ঢেউ ক্যাম্পাসগুলোতে এসেও লেগেছে। নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি শুরু হয়েছে এবং প্রতিরোধের শক্তি বিভক্ত ও দুর্বল হয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোর বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে এমন মূল্যায়ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের। গতকাল শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

এই গোলটেবিল আলোচনায় অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ভার্চ্যুয়ালি অংশ নেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও অংশ নেন আলোচনায়। আলোচনায় এসেছে, জুলাইয়ে সারা দেশ নিপীড়নের বিরুদ্ধে জেগেছিল। তখন ক্যাম্পাসগুলোতেই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। নিপীড়ন এবং মবের যে ঘটনাগুলো আবার ক্যাম্পাসে দেখা যাচ্ছে, তাতে ভয়ের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সজাগ থাকতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি সম্পর্কে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ‘প্রেশার গ্রুপ’ নাম দিয়ে ক্যাম্পাসে–ক্যাম্পাসে নীতি-পুলিশিংকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন করে আক্রমণকারী শক্তি হিসেবে নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের আবির্ভাবও দেখা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনদের পদত্যাগে বাধ্য করা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ‘সাংবাদিক’ এবং শিক্ষকসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের আক্রমণ ও হামলার পর উল্টো সেই নারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন।

কুয়েটের (খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) প্রশাসন বিভিন্ন ছাত্র ও শিক্ষকসংগঠনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার ঘটনাও দেখা গেছে বলে নিজেদের মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তারা বলেছে, সেখানে (কুয়েট) বারবার উপাচার্য বদল করেও অচলাবস্থা নিরসন হয়নি। খুলনা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম বদলের সংস্কৃতি আবার ভিন্নমতের প্রতি আক্রমণের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রীর বিষয়ে শিক্ষকের ন্যক্কারজনক মন্তব্যের পরও সেই শিক্ষকের বহাল তবিয়তে থাকা মনে করিয়ে দেয় হাসিনার আমলে ক্ষমতার কাছে থাকা ‘রাজশিক্ষকদের’ দৌরাত্ম্যকে।

শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, বেসরকারি উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া-প্যাসিফিকে জুলাইয়ে রাজপথে থাকা প্রগতিশীল শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া-প্যাসিফিকে মবের চাপে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে শিক্ষাঙ্গনগুলো ভয়ের সংস্কৃতির নতুন স্তরে প্রবেশ করেছিল, এমন মূল্যায়ন শিক্ষক নেটওয়ার্কের। সংগঠনটি বলেছে, ছাত্র সংসদের কেউ কেউ ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলা ও আক্রমণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। উদীচী ও ছায়ানটের ওপরে হামলার ডাক এসেছে রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কোনো কোনো নেতার কাছ থেকে। এসব ঘটনা ভয়াবহ উদ্বেগ ও আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে

লিখিত বক্তব্যে শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা হকার উচ্ছেদ থেকে শুরু করে একাধিক শিক্ষককে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছে। এমনকি নানা সময়ে তারা শাহবাগে ‘মব’ করে অন্য শিক্ষার্থীদের মারধর করে থানায় দিয়েছে। সবটাই যেন ছাত্রলীগের আমলে শিবির সন্দেহে পেটানো এবং শাহবাগ থানায় মামলা দেওয়ার স্ক্রিপ্টের (চিত্রনাট্য) পুনরাবৃত্তি। এই পরিস্থিতি নির্বাচিত সরকারের আমলে খুব বেশি পাল্টেছে বলে মনে হয় না। নির্বাচিত সরকারের আমলেও একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। হাসিনার আমলের নিপীড়নের বিচার হয়নি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও নিপীড়ন চলেছে আর বিএনপি সরকারের আমলেও তার পুনরাবৃত্তি শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষে আলোচনার শুরুতে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী। পরে গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৯ শতাংশ সমস্যা শিক্ষকদের কারণে। শিক্ষকেরা নিজেদের উচ্চাভিলাষ বা রাজনৈতিক স্বার্থের কথা চিন্তা না করে কাজ করলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির দিকে যাবে।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘উচ্চশিক্ষায় আবাসিক সংকট’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আবাসন সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো শিক্ষার্থী। প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও আবাসন সক্ষমতা না বাড়ায় ঢাবি, রাবি ও চবিতে মাত্র ২৭ থেকে ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের সুবিধা পাচ্ছেন। অন্যদিকে জবির ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি ছাত্রীহল। যারা হলে থাকছেন, তাদেরও দিন কাটছে গাদাগাদি গণরুম, নিম্নমানের খাবার আর স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে। বাধ্য হয়ে বাকি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে মেস বা ভাড়া বাসায়। অতিরিক্ত খরচ, নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চরম ভোগান্তি ও মানসিক চাপে ব্যাহত হচ্ছে তাদের শিক্ষাজীবন।

ঢাবি হলে গাদাগাদি, দূষিত পানি পুষ্টিহীন খাবার

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) আবাসন সংকটের সঙ্গে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। ৪২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পান। যারা হলে থাকছেন, তাদেরও দিন কাটছে চারজনের কক্ষে আটজনের গাদাগাদি পরিবেশে। এছাড়া নিম্নমানের খাবার, দূষিত পানি, অপরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন এবং অস্বাস্থ্যকর কক্ষ তাদের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে ছাত্রী হলগুলোয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তির অভাবে শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৮৮১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ২২ হাজার ১৫২ এবং ছাত্রী ২০ হাজার ৭২৯ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল ১৯টি। ছাত্রদের ১৩টি, ছাত্রীদের পাঁচটি এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক হল রয়েছে।

ছাত্রী হলগুলোয় থাকছেন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী আর ছাত্র হলে প্রায় ১২ হাজার। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈধভাবে হলে থাকা আবাসিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজার ৮১৭ জন। বাকিদের থাকতে হচ্ছে মেস বা ভাড়া বাসায়। কিন্তু যারা হলে থাকার সুযোগ পেয়েছেন, তারাও স্বস্তিতে নেই। প্রতিনিয়ত তারা নানারকম সংকট মোকাবিলা করেই টিকে আছেন। হলের ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অধিকাংশ হলে প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকে নিম্নমানের ভাত, পাতলা ডাল, সামান্য সবজি, ব্রয়লার মুরগি কিংবা ছোট মাছের টুকরা। অনেক সময় পচা বা পোকায় ধরা সবজি, অতিরিক্ত তেল-মসলা, অপরিষ্কার পরিবেশে রান্না এবং টেস্টিং সল্ট ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যায়।

পুষ্টিবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, আয়রন ও ক্যালসিয়াম থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এ বয়সে মানসিক শ্রম বেশি থাকে এবং দীর্ঘসময় পড়াশোনার জন্য শরীর ও মস্তিষ্কের পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োজন হয়। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিয়মিত সুষম খাদ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, শিক্ষার্থীদের পুষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। খাবারে বৈচিত্র্য না থাকলে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এদিকে নিরাপদ পানির সংকটও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন হলে বিশুদ্ধ পানির ফিলটার অকার্যকর, অপরিষ্কার কিংবা অপর্যাপ্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক শিক্ষার্থী ট্যাপের পানি পান করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাস এলাকার পানিতে মলমূত্রজনিত জীবাণু ‘কলিফর্ম’ পাওয়া গেছে। ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার মোহাম্মদ ইয়ামিনের উদ্যোগে পরিচালিত পরীক্ষায় ২ থেকে ১৪ মাত্রা কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এ ধরনের জীবাণু ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ‘পানিজনিত কারণে’ শতাধিক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকদিন ধরে জ্বর, বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়াজনিত উপসর্গ নিয়ে শিক্ষার্থীরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মাহবুবা সুলতানা বলেন, সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ফিল্টার পরীক্ষা, কিট পরিবর্তন ও রিজার্ভার পরিষ্কার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ বলেন, সব হলের পানি পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার সক্ষমতা যদি ১৫ থেকে ১৭ হাজার শিক্ষার্থীর হয়, সেখানে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। অথচ হল, লাইব্রেরি, ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের সুবিধা তার চেয়েও কম। তিনি বলেন, শিক্ষাবিজ্ঞান অনুযায়ী একজন শিক্ষক ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে যথাযথ মনোযোগ দিতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, হলগুলোয় আবাসন সংকট, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী যুগান্তরকে বলেন, হলগুলোর সমস্যা প্রাধ্যক্ষরা দেখছেন বলে আমার বিশ্বাস। আমি আমার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চাহিদা ও জীবনমান যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমার সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

চবিতে হলের বাইরে ৭৩ ভাগ শিক্ষার্থী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মোট শিক্ষার্থীর ২৭ শতাংশ পাচ্ছেন আবাসন সুবিধা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ধাপে ধাপে বিভাগ, ইনস্টিটিউট, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি আবাসন সুবিধা। ফলে আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় এ ক্যাম্পাসে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে হলের বাইরে। বাইরে থাকা এসব শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে শুধু বঞ্চিতই হচ্ছেন না, অনেক ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন শাটল ট্রেনে ‘গাদাগাদি’ করে। বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও মেয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েন। হলে সিট না পেয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ১নং গেট, ২নং গেট, ফতেপুর, জোবরা, হাটহাজারীসহ চট্টগ্রাম শহরে বাসা ভাড়া করে থাকেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় সময়ই এসব ভাড়া বাসায় সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। এছাড়াও রয়েছে নিরাপত্তা সংকট।

চবিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী প্রায় ১২ হাজার এবং পুরুষ প্রায় ১৬ হাজার। হলে থাকেন ৭ হাজার ৫শ জন, অর্থাৎ ৭৩ ভাগ শিক্ষার্থীই হলের বাইরে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের আটটি হল ও একটি হোস্টেল এবং মেয়েদের পাঁচটি রয়েছে। ছেলেদের হলে আছে ৩৭৬৭টি আসন, আর মেয়েদের হলে আছে ২৬৪১টি আসন। হলগুলোতে আবার অনেক রুম বসবাসের অনুপযোগী। ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন আবাসিক সুবিধা। তবে মেয়েদের হলে ডাবলিংয়ের সুযোগ থাকায় সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ছয় শতাংশ শিক্ষার্থী বেশি পাচ্ছেন আবাসিক সুবিধা।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আবাসিক হলগুলোতে আট বছর পর আসন বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। এর আগে ২০১৭ সালের জুনে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

চবির ছাত্র হলগুলোর মধ্যে আলাওল হলে আসন রয়েছে ২৬০টি, এএফ রহমান হলে ২৫৮টি, শাহজালাল হলে ৪৭৫টি, শাহ আমানত হলে ৬৩২টি, সোহরাওয়ার্দী হলে ৩৭৫টি, শহীদ আব্দুর রব হলে ৫০৯টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ১৭৬টি, শহীদ ফরহাদ হোসেন হলে ৭০০টি ও অতীশ দীপঙ্কর হলে ৩১২টি আসন রয়েছে। এছাড়া চাকসুর উদ্যোগে সম্প্রতি চালু হওয়া শহীদ ফরহাদ হোসেন হলের নবনির্মিত বর্ধিত অংশে (এক্সটেনশন) আরও ৮৮ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ছাত্রী হলগুলোর মধ্যে শামসুন নাহার হলে ৪৮১টি, প্রীতিলতা হলে ৫৩১টি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হলে ৫০৮টি, বিজয় ২৪ হলে ৭৫০টি, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে (আংশিক) ৩৯টি, নবাব ফয়জুন্নেছা হলে ৩১২টি আসন রয়েছে। এছাড়া চারুকলার শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্পী রশীদ চৌধুরী হোস্টেলে আছে ৩৫টি আসন।

আবাসন ভাতা দাবি শিক্ষার্থীদের : আবাসন সংকট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় আন্দোলনে নেমেছে। তাদের দাবি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভাতার ব্যবস্থা করা। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, বাম ছাত্র সংগঠন, অন্যান্য ইসলামী ছাত্র সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন সময় এসব দাবি তুলেছেন।

নতুন ১০টি হল নির্মাণের পরিকল্পনা : চবিকে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার লক্ষ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল এবং পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডিপিপি পাঠাতে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. রিয়াদ গাজী বলেন, এখন হলে গণরুম, গেস্টরুম কালচার নেই। মেধার ভিত্তিতেই সিট দেওয়া হচ্ছে। তারপরও আবাসন সংকটের কারণে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। স্নাতকোত্তরের আরেক শিক্ষার্থী মারজান বেগম বলেন, আমরা শহর থেকে এসে ক্লাস করি। চার বছরেও হলে সিট পাইনি। শাটল ট্রেনে গাদাগাদি করে আসতে হয়। পাশাপাশি নিরাপত্তা হুমকি তো আছেই।

চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক মো. ইসহাক ভূঁঞা বলেন, ইতোমধ্যে চাকসুর উদ্যোগে ফরহাদ হলের এক্সটেনশন ৮৮ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া শাহজালাল হলে সংস্কার কাজ চলমান। অনেক হলে এক্সটেনশন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি হল নির্মাণের জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

চবির বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জান্নাত আরা পারভীন বলেন, আমাদের হলে ৭৫০ জন মেয়ে শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা থাকলেও ১৩০০ জন অবস্থান করছে। নানা কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের রাখতে হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কিছু হলে এক্সটেনশনের কাজ করা হচ্ছে। পুরাতন শামসুন্নাহার হল সংস্কার করে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০ তলা বিশিষ্ট পাঁচটি ছাত্র হল এবং পাঁচটি ছাত্রী হল নির্মাণের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে।

রাবিতে আবাসন সংকট কাটেনি ৭৩ বছরেও

প্রতিষ্ঠার ৭৩ বছর পেরিয়ে গেলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে হলে জায়গা পাচ্ছেন মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ জন। অর্থাৎ, ৬৮ শতাংশ শিক্ষার্থীকেই হলের বাইরে থাকতে হচ্ছে। সংকট সবচেয়ে প্রকট ছাত্রী হলগুলোতে; যেখানে গণরুমে একটি সিঙ্গেল বেডে দুজন করে চরম মানবেতর ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া ১৬০ জনের জন্য রয়েছে মাত্র চারটি গ্যাসের চুলা ও তিনটি ওয়াশরুম। নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চললেও ধীরগতির কারণে এ সংকট সহসাই কাটছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ ও ৬টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য আছে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি আন্তর্জাতিক ডরমেটরি। এর মধ্যে ছেলেদের জন্য ১১টি এবং মেয়েদের জন্য ৬টি হল। আন্তর্জাতিক ডরমেটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকেরা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩টি নতুন বিভাগ, ৭টি অনুষদ এবং ৪টি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৫ বছরেই চালু হয়েছে ১৪টি বিভাগ ও একটি ইনস্টিটিউট। একই সময়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজারে। তবে এ দীর্ঘ সময়ে নতুন আবাসিক হল নির্মিত হয়েছে মাত্র তিনটি।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল আহাদ বলেন, তৃতীয় বর্ষে উঠেও সিট পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবেই ৭৩ বছরেও ৫০ শতাংশ আবাসিকতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রী ও হল প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়টি ছাত্রী হলেই আসন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রায় প্রতিটি হলেই চালু রয়েছে গণরুম, যেখানে একটি সিঙ্গেল বেডে দুজন করে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রহমতুন্নেছা হলের শিক্ষার্থী সাদিকা ইয়াসমিন বলেন, ছোট জায়গার মধ্যে জামা-কাপড়, বইপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখতে দারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়। রান্নার হাঁড়ি-পাতিলসহ সবকিছু এর মধ্যেই রাখতে হয়, একদম বস্তির মতো পরিবেশ। গরমের মধ্যে এই কষ্ট আরও বেড়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, গণরুমে প্রায় ১৬০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র চারটি চুলা ও তিনটি ওয়াশরুম। এর মধ্যে দুটি নিচতলায়। রান্না করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এত কষ্টের পরও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা খরচ কমানোর জন্য গণরুমে থাকতে বাধ্য হন।

এ বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নাহিদা শারমিন বলেন, গণরুমের বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই আদর্শ নয়। আমরাও তাদের এভাবে রাখতে চাই না। কিন্তু অনেক ছাত্রী এসে অনুরোধ করে-‘ম্যাডাম, খাট না হলেও চলবে, শুধু থাকার জায়গা চাই।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালে ১০ তলা বিশিষ্ট বিজয় একাত্তর হল ও শেখ হাসিনা হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। এর মধ্যে বিজয় একাত্তর হল প্রস্তুত হলেও শেরেবাংলা ফজলুল হক হলের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ওই হলের শিক্ষার্থীদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে, ছাত্রীদের মন্নুজান হলের বিভিন্ন দেওয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ায় ওই হলের ছাত্রীরা নিরাপদ আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভও করেছেন। এদিকে নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের কাজ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

এ বিষয়ে রাকসু সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, আবাসন সংকট বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। নিয়মিত প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে। সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমরা আন্দোলনে যাব।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা কমিটি থেকে ইউজিসি, সেখান থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকে অনুমোদন নিতে হয়। দুটি হল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া আরও পাঁচটি হল নির্মাণে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

কালের কণ্ঠ

‘বাঙালি সংস্কৃতির ওপর মরণাঘাত’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর পরিস্থিতি অস্থির ও আতঙ্কময় হয়ে ওঠে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতেই একদল সুযোগসন্ধানী মানুষ হামলা চালায় বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছায়ানট ভবনে। এর আগে দুর্বৃত্তের গুলিতে জখম ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি ওই দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে।

কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী সেলের সংগৃহীত বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন রাতে কয়েক শ মানুষ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ধানমণ্ডির ছায়ানট ভবনে। তাদের বেশির ভাগের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল।

কারো কারো মাথায় ছিল হেলমেট। বেশির ভাগের হাতে ছিল লাঠিসোঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। ছায়ানটের ছয়তলা ভবনের বিভিন্ন তলায় ঢুকে ঢুকে প্রতিটি কক্ষে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় তারা। একটি দল ভাঙচুরে লিপ্ত থাকে; অন্য দল লুটপাটে অংশ নেয়।

পরে ছায়ানট ভবনের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর ভাঙচুর ও অগ্নিসন্ত্রাসে তছনছ করা হয় দেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও।

শুধু ছায়ানট কিংবা উদীচী নয়, শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বেশির ভাগ শিল্প-সংস্কৃতির সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে। হামলা-ভাঙচুরের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়েছে।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয় পরিকল্পিত আক্রমণ। ৫ থেকে ২০ আগস্ট দেশের বেশির ভাগ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়। সে বছরের ৮ আগস্ট প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে সবাই আশা করেছিল, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের অবাধ মহোৎসব দেখে মনে হয়েছে, দেশ আরেক অন্ধকার যুগে পড়ে গেছে। ইউনূস জামানায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সিনেমা হল, পাঠাগার, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন, জাদুঘর, ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বাড়ি ও স্মৃতিস্মারকে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর ক্ষত, অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

নাট্যজন মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনূসের শাসনামলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে বর্বরোচিত হামলা হয়েছে। এসব হামলাকে পরিকল্পিত আক্রমণ মনে করি। এসব শুধু স্থাপনার ওপর নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপরও আঘাত। দেশের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীকগুলোকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।’

ইত্তেফাক

‘জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান হাম সংকট’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এটি শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ আয়োজিত ‘হামে শিশুমৃত্যু : জনস্বাস্থ্য সংকট ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘হামে এখনো যেভাবে শিশুমৃত্যু হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। টিকাদানে গাফিলতি, জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং কিছু ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণেই আমরা এ সংকটে পড়েছি। জনস্বাস্থ্যকে অবহেলার ফলই বর্তমান হাম সংকট। জনস্বাস্থ্যকে কোনো সরকারই কখনো গুরুত্ব দেয়নি।’

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কাজী রকিবুল ইসলাম বলেন, দেশে বয়স্ক ও নবজাতকদের জন্য আইসিইউ থাকলেও পর্যাপ্ত পিআইসিইউ নেই। এবার ৯ মাস বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক। তিনি আরো বলেন, মায়ের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে আগের মতো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় ব্রেস্টফিডিংয়ের হার কমে গেছে। পাশাপাশি কোভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য ও মাতৃ পুষ্টিহীনতা বাড়ায় তার প্রভাব শিশুদের ওপরও পড়ছে। শিশুমৃত্যু ঠেকাতে আইসোলেশন ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, হামের জটিলতা প্রতিরোধে ভিটামিন-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগে সরকারি কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের প্রতি ছয় মাস অন্তর ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মৃত্যুঝুঁকি বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সারা দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার, সরকারি হাসপাতালে বিশেষ হাম কর্নার চালু, নিয়মিত ভিটামিন-এ কর্মসূচি পুনরায় চালু, প্রান্তিক শিশুদের বিনা মূল্যে চিকিত্সা, টিকা উত্পাদনে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানান বক্তারা। তারা আরো বলেন, জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকে জনগণের মৌলিক অধিকার হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বানও জানান তারা।

এদিকে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৬১ শিশু। তাদের মধ্যে ১০৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গে দেশে ৩৭৯ শিশুর মৃত্যু হলো। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৭৪ শিশু। হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ৪৫৩ শিশু। গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দেয় ৫৬ হাজার ৫৭২ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় ৪১ হাজার ২৮ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরে ৩৬ হাজার ৬৪৫ শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৭ হাজার ৫২৪ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম সংক্রমণ রোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা’। খবরে বলা হয়, চলমান ইরান সঙ্কটকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে। কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে আরো বিস্তৃত সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সূত্রে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক- তিনটি ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

চীন সফর শেষে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবের প্রথম অংশই তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। একই সাথে তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো সমঝোতা না হলে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দেয়া হতে পারে। তার এ বক্তব্যের পরপরই ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান আরো কঠোর হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুদ্ধের রূপরেখার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের

মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগন এরই মধ্যে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের রূপরেখা প্রস্তুত করেছে। পূর্বে স্থগিত হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নতুন কাঠামো ও আরো বিস্তৃত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আবার চালু হতে পারে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেয়ার সময় জানান, প্রয়োজন হলে যুদ্ধকে আরো তীব্র করার পূর্ণ প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য এ অভিযানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সমন্বিত বিমান হামলা চালানো হতে পারে। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে থাকবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, সামরিক অবকাঠামো, কমান্ড সেন্টার এবং ভূগর্ভের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। বিশেষভাবে ইস্পাহানের ভূগর্ভের পারমাণবিক স্থাপনায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী মোতায়েনের বিকল্পও বিবেচনায় রয়েছে। যদিও সামরিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এ ধরনের স্থল অভিযান দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে এবং এতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।

মার্কিন সামরিক সূত্র বলছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার মেরিন সেনা ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার প্যারাট্রুপার প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি দু’টি বিমানবাহী রণতরী, একাধিক ডেস্ট্রয়ার ও বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন রাখা হয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলোচনায় স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন সহজ হবে না। কারণ সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তেহরান তাদের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও ভূগর্ভের সামরিক অবকাঠামো আবার সচল করতে সক্ষম হয়েছে।

ইরানের পাল্টা প্রস্তুতি

এ দিকে ইরানও পাল্টা যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যেকোনো আগ্রাসনের ‘উপযুক্ত ও কঠোর জবাব’ দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি আবার সক্রিয় করা হয়েছে। এর ফলে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও আন্তর্জাতিক তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘পছন্দের যুদ্ধ’ চালিয়ে গেলে ওয়াশিংটনকে আরো বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ইরান ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, ভবিষ্যতে ‘বন্ধু ও নিরপেক্ষ’ দেশগুলোর জন্য প্রণালী খোলা রাখা হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।

ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, শিগগিরই নতুন ট্রানজিট নীতিমালা ঘোষণা করা হবে। সেই নীতির আওতায় হরমুজ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে বিশেষ ফি আদায় এবং সামরিক জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকর হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।

বণিক বার্তা

দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৪৬ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে গত এপ্রিলে ৪৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার। এ অর্থের বড় অংশই আবার ব্যয় হয়েছে এর আগে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে নেয়া ঋণ পরিশোধে।

মূলত কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় সরকারকে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। তাছাড়া অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সরকারি ব্যয়ের গতি বাড়ার কারণেও এ সময় সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়। তবে দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যয় মেটাতে ঋণ করার পুরনো কৌশল থেকে বের হয়ে আসার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, এ বছরের মার্চে সরকার ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৩৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এক মাসের ব্যবধানে গত এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নেয়া অর্থের পরিমাণ ৩৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এর আগে ইস্যু করা ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধে ব্যয় হয়েছে। ফলে এপ্রিলে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।

ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ বাড়ার কারণে গত এপ্রিলে এর সুদের হারও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের তুলনায় শেষ সপ্তাহে ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার বেড়েছে। এর মধ্যে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ৯ দশমিক ৮৮ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ১০ দশমিক শূন্য ২ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ হয়েছে এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ১০ দশমিক শূন্য ৮ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে সরকারি ব্যয়ের গতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবে এ সময়ে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণও বেড়ে যায়। যার প্রতিফলন দেখা গেছে গত এপ্রিলে। ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ায় গত এপ্রিলে এ খাতের সুদহারও ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সরকার যে অর্থ সংগ্রহ করেছে তার বেশির ভাগই এসেছে ব্যাংকের কাছ থেকে। উচ্চ সুদের কারণে ভালো মুনাফা আসায় ব্যাংকগুলোও বর্তমানে বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতেই বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি শেষে দেশের ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের স্থিতি ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে তা ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় ঠেকেছে। সে হিসাবে এক্ষেত্রে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ স্থিতি ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বেড়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যেখানে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি এখন মাত্র ৬ শতাংশ।

অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যে ঋণ নিচ্ছে তার মূল সুবিধাভোগী হচ্ছে ব্যাংক। সহজে মুনাফা করার মাধ্যম হিসেবে ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করছে। অথচ ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ভালো গ্রাহক খুঁজে বের করে তাকে অর্থায়ন করা।’

ট্রেজারি বিল-বন্ডের ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংক নয়, যেন সাধারণ মানুষও সুবিধা পেতে পারে সেদিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে সাবেক এ সিনিয়র সচিব আরো বলেন, ‘সরকারকে যদি ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিতে হয় তাহলে সেটি জনগণের কাছ থেকে সংগ্রহ করা উচিত। কোটার কারণে বর্তমানে ট্রেজারি বিল-বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। নিশ্চিত মুনাফার গ্যারান্টি থাকায় ব্যাংকগুলো গ্রাহক খুঁজে ঋণ দেয়ার পরিবর্তে ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করতেই বেশি আগ্রহী। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না আসার এটি একটি কারণ।’

আজকের পত্রিকা

‘হামের মৃত্যুর গতি ছাড়াল করোনাকে’-এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, মাত্র ৬২ দিনে সংক্রামক রোগ হাম ও এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে চার শ ছাড়িয়ে গেছে। গত কয়েক দশকে এত অল্প সময়ে সংক্রামক কোনো রোগে এত বেশি শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। বিশ্বেই সম্পূর্ণ নতুন রোগ করোনা সংক্রমণের শুরুর প্রথম নয় সপ্তাহে (৬৩ দিন) দেশে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় সোয়া তিন শ মানুষের। সম্ভাব্য প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গুতেও এত কম সময়ে মৃত্যুহারের এমন দ্রুত বৃদ্ধি বা তীব্রতা দেখা যায়নি।

রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, করোনা, ডেঙ্গু ও হামের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও স্বল্প সময়ে হামে মৃত্যুর এই দ্রুত বৃদ্ধি সংক্রমণের তুলনামূলকভাবে বেশ উঁচু গতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও লক্ষণীয় তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। মার্চে এসে অতি সংক্রামক এই রোগের বিস্তার আরও বাড়তে থাকে। সরকার ১৫ মার্চ থেকে প্রতিদিন হালনাগাদকৃত হামের তথ্য প্রকাশ করছে। যেখানে নিশ্চিত রোগী, উপসর্গজনিত রোগী ও মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সরকারি হিসাবের বাইরে সারা দেশে আরও অনেক মৃত্যু ও রোগী থাকতে পারে, যা আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বিশেষ করে অনগ্রসর ও প্রত্যন্ত এলাকায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গে গতকাল শনিবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৯৬১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। ১০৮ শিশুর ক্ষেত্রে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। এতে এ সময়ে মোট আক্রান্ত ও উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯টি।

সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ শিশুর। মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৩টি।

অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৬ হাজার ৫৭২ শিশুর শরীরে। তাদের মধ্যে ৪১ হাজার ২৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ৩৬ হাজার ৬৪৫ শিশু চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। একই সময়ে ৭ হাজার ৫২৪ শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে।

বিভিন্ন রোগের প্রকৃতি, বিস্তারের ধারা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভিন্ন হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বল্প সময়ে মৃত্যুর ‘তীব্রতা’ বা ‘আউটব্রেক ইনটেনসিটি’ বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি নির্ধারণ করেন। নতুন বা পুনরায় সক্রিয় হওয়া সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক সপ্তাহে মৃত্যু বৃদ্ধির গতি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবকে কোভিড-১৯ ও অন্যান্য বড় প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক ধাপের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি দেখা দেয়। বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হয় সে বছরের ৮ মার্চ এবং প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। রোগটি নতুন হওয়ায় শুরুতে কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নির্দেশিকা ছিল না। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার প্রোটোকল নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। করোনায় গুরুতর ক্ষেত্রে একাধিক অঙ্গ বিকল হওয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দিলেও স্বল্প সময়ে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রথম ৯ সপ্তাহে করোনায় ৩১৪ জনের মৃত্যু হয়।

অন্যদিকে মশাবাহিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ক্রমে বাড়লেও তার গতি সাধারণত ধীর। দীর্ঘ সময়জুড়ে তা ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৩ সালের দীর্ঘস্থায়ী ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় যেমন ঘটেছিল। এ সময় সোয়া তিন লাখের বেশি রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যু ঘটে ১ হাজার ৭০৫টি। তবে ডেঙ্গুর সংক্রমণ মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও এডিস মশার বিস্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বছরজুড়ে ওঠানামা করেছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেই বিবেচিত।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর সংক্রমণ সাধারণত ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায় বলে মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর বিপরীতে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণের ভাষায় একে ‘র‌্যাপিড স্পাইক’ বলা হয়। এ ধরনের দ্রুত ঊর্ধ্বগতি সাধারণত টিকাদান কভারেজে ঘাটতি, রোগীর শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা এবং চিকিৎসাসেবায় বিলম্বের ইঙ্গিত দেয়।

দেশ রূপান্তর

দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দৌড়ে পারছেন না অন্যরা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন। গত ২ এপ্রিল টানা ১৬ ঘণ্টা দাপ্তরিক কাজ করে তিনি প্রশাসনে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাজের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মন্ত্রী, এমপি ও আমলারা। দেশ রূপান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন তারা নিজেরাই।

সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টার মধ্যে সচিবালয়ে প্রবেশ করছেন। তিনি সকালেই চলে আসায় আমাদেরকে একই সময়ে, অনেক ক্ষেত্রে আগেভাগেই সচিবালয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। কখন কোন মন্ত্রীকে তিনি ডেকে পাঠান সেটা তো আর বলা যাবে না। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করতে হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। প্রাথমিক পর্যায়ে কষ্ট হলেও এখন মানিয়ে নিচ্ছি। আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি আমরা। এর ফল শুধু বিএনপি সরকার নয়, দেশের মানুষ ভোগ করতে পারবে। ভালো ফলাফল বয়ে আনবে।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী কাজে প্রধানমন্ত্রীর এই অভাবনীয় গতি এবং কড়া নজরদারির সঙ্গে মানিয়ে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন অনেক মন্ত্রী, এমপি ও আমলা। বিশেষ করে জনপ্রশাসন, জ্বালানি ও আইন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের কাজে প্রধানমন্ত্রী যে কঠোর সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিচ্ছেন, তা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের নাভিশ্বাস উঠছে।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে নতুন সরকার। সে হিসেবে সরকারের আজ তিন মাস পূর্ণ হলো। তিন মাসের এই সময় পর্যালোচনায় সবার আলোচনার মধ্যেই এসেছে প্রধানমন্ত্রীর গতিশীল নেতৃত্ব। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্য সবাই দৌড়াতে পারলে অনেক কিছুই পরিবর্তন সম্ভব।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নেতা দেশে ফিরে ঘোষণা দিয়েছিলেন “আই হ্যাভ এ প্ল্যান”। জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই কর্মযজ্ঞের সারথি হয়েছি আমরা। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছি। এর সুফল শিগগিরই দেশবাসী পাবে। তার এই কাজের গতি মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেছে এবং সাধুবাদ জানাচ্ছে। তার স্বপ্ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। অতীতে কোনো সরকারের প্রধান এভাবে কাজ করেছে কি না তা জানা নেই।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

‘ব্যবসায় বড় বাধা আমলাতন্ত্র’-এটি দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে নতুন ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে খাতভেদে ২৩টি বা তার বেশি দপ্তর থেকে ১৫০টির মতো অনাপত্তি, লাইসেন্স বা ছাড়পত্র নিতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে। দিতে হয় ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স। সেই ট্যাক্স আবার নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কমিটি।

এরপর আছে কোম্পানি নিবন্ধন, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধন জটিলতা। এসবের পাশাপাশি পরিবেশ ছাড়পত্র, পরিবেশ সনদ, ফায়ার লাইসেন্স, ফায়ার লে আউট প্ল্যান, নির্মাণ অনুমোদন ও শিল্প আইআরসি-সংক্রান্ত নানা ইস্যু।

এসব ঝামেলা মোকাবিলা করে বাংলাদেশে ব্যবসা-বিনিয়োগে এখন আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন উদ্যোক্তারা। অনেকে কারখানা বন্ধ করে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে ফেলছেন। অনেকে কর্মসংস্থানের চিন্তা করে সামাজিক দায়বদ্ধ থেকে লোকসান দিয়েও পুরোনো ব্যবসা কোনো রকমে ধরে রেখেছেন।

বিকেএমইএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার নানা ধরনের নীতিসহায়তার কথা বললেও বাস্তবে ব্যবসা-বাণিজ্য অনেক কঠিন হয়ে গেছে। ব্যবসার প্রধান বাধা আমলাতন্ত্র। একটি পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নানারকম কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। আর ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি আরও বেশি।

তৈরি পোশাক খাতের এই ব্যবসায়ী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার নিজের কারখানা স্থাপনে নারায়ণগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন পাঁচ বছর আটক রেখেছিলেন।’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় হয়রানি হয় আয়কর ও ভ্যাট আদায়ে। প্রতি বছর নিয়মিত আয়কর-ভ্যাট পরিশোধ করা হলেও হঠাৎ করে পাঁচ থেকে ছয় বছর পর ব্যবসায়ীর কাছে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার ভ্যাট প্রাপ্তির নোটিস পাঠানো হয়। এটা দেখে অনেক ব্যবসায়ীর প্রেসার (রক্তচাপ) বেড়ে যায়। শেষে হিসাব করে দেখা যায়, প্রাপ্তির পরিমাণ হয়তো ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা অথবা কোনো প্রাপ্তি নেই। অথচ নোটিস আসে কোটি টাকার। এ হয়রানির জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো জবাবদিহি নেই।

দোকান মালিক সমিতির এই ব্যবসায়ী নেতা জানান, আয়করের ক্ষেত্রেও আচমকা এ ধরনের নোটিস চলে আসে-যেটি দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য বড় আতঙ্কের বিষয়। আমাদের আবেদন- প্রতি বছরের ট্যাক্সের হিসাব সেই বছরেই নিষ্পন্ন করা হোক। পরে যেন হয়রানি করা না হয়। ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলাদেশে ব্যবসার চিত্রটি এমনই হতাশাজনক ও আতঙ্কের। আর এ আতঙ্কজনক পরিস্থিতির জন্য সরকারি ও সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনায় উদ্যোক্তাদের নানা দপ্তরে ঘুরতে হয়। নানা সংস্থার হয়রানিও নানা রকম। এসব হয়রানি কমাতে হলে ঘাটে ঘাটে দিতে হয় টাকা।

জানা যায়, বিভিন্ন দপ্তরের ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তির খরচ বিভিন্ন রকম। এর মধ্যে রয়েছে আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধন, সাইনবোর্ড খরচ, লাইসেন্স ফি ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার স্থানীয় কর অর্থাৎ যে জায়গায় লাইসেন্স নেওয়া হয়, সে জায়গায় ফ্যাক্টরি বা দোকান অথবা কোনো স্থাপনা করতে চাইলে সে স্থানের অনুমোদন বাবদ খরচ। আছে ভূমি কর ও হোল্ডিং ট্যাক্স। অর্থাৎ ব্যবসা মানেই খরচের বোঝা।

ব্যবসা শুরুর এই জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে (২০২০) ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৮তম। যদিও বিশ্বব্যাংক এ মূল্যায়ন বন্ধ রেখেছে। তবে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণ হচ্ছে না, বিনিয়োগও বাড়ছে না।


ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন