উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলে চলতে ও সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নে টেলিকম ও আইসিটি সেক্টরে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা এআইয়ের ওপর আরো গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। একইসঙ্গে শুধু গ্রাহকসংখ্যায় নয়, সেবার মানেও বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। শনিবার রাজধানীর রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ : নতুন সরকার কী ভাবছে’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভায় এমনটাই জানান বক্তারা।
আয়োজিত অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, নতুন সরকার টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতকে নতুনভাবে সাজানোর কাজ শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফ্রিল্যান্সিং খাত নিয়ে সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে তরুণদের দক্ষ করে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়। সরকার লাস্ট-মাইল ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পাহাড়ি ও চরাঞ্চলে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট, বিভাগীয় শহর ও শিল্পাঞ্চলে ধাপে ধাপে ৫জি সম্প্রসারণ এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো শেয়ারিং ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। টেলিটক বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, আসলে টেলিটক বিক্রির কোনো কথা আমার জানা নেই। তিনি বলেন, টেলিটক থাকায় বেসরকারি অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে না। তবে আমরা ইনভেস্টার খুঁজছি। যদি টেলিটককে ৫/৬ হাজার কোটি টাকা দেয়া যায় বা কোনো প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ পাওয়া যায় তাহলে টেলিটককে গ্রামীণফোন ও রবির মতো শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তোলা যাবে।
এসময় প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম ও আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, টেলিকম ও আইসিটি খাতকে সরকার ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে দেখছে। সরকারের সবচেয়ে বেশি আয়ের মধ্যে এই খাত অন্যতম। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী টেলিকম ও আইসিটি খাতের জিডিপিতে অবদান ১ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ধরা হয়। তবে সরকার মনে করে, সঠিক নীতি, অবকাঠামো ও সমন্বিত উদ্যোগ নিলে এই অবদান দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। এই খাত থেকে ১৫ শতাংশ অবদান অর্জন বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন মোবাইল ও ফিক্সড লাইনের গ্রাহকসংখ্যায় বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের একটি। কিন্তু সেবার মানের সূচকে অবস্থান ৯০-এর পরে। আগামী পাঁচ বছরে সেবার মানে শীর্ষ ২০-এ যাওয়াকে সরকার লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে।
উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, মোবাইল অপারেটরদের কার্যকর করহার ৫৫ থেকে ৫৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ২২ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে। যদিও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ায় কর কমানো চ্যালেঞ্জিং। তারপরও আসন্ন বাজেটে গ্রাহক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি বলেন, দেশে এখনো স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার প্রায় ৫০ শতাংশ। অথচ ৪জি-৫জি বিস্তারে এটি বড়ো বাধা। সরকার দেশীয় উৎপাদনে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি সহজ কিস্তিতে (ইএমআই) ফোন কেনার সুযোগ তৈরির জন্য মোবাইল অপারেটর ও ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
স্পেকট্রাম নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য শুধু স্পেকট্রাম বিক্রি করে রাজস্ব আয় নয়। বরং অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক প্রভাব নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে ডেটা সেন্টার, কনটেন্ট ডেলিভারি, ক্লাউড অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তাকে এখন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সংযোগের চেয়ে নিরাপদ সংযোগ বেশি জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গড় বয়স ২৭ বছর। তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও প্রযুক্তি দক্ষতাকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে টেলিকম ও আইসিটি খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে। ২০৪৮ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে এবং এই রূপান্তরে টেলিকম-আইসিটি খাত বড় ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপকালে মোবাইল সিম কোম্পানি রবি’র হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম বলেন, গত এক দশকে মোবাইল গ্রাহক, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ডাটা খরচের ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশ এখনো একটি প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার বা ডিজিটাল কনজাম্পশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ নাগাদ দেশের মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৬০ লাখে উন্নীত হয়েছে। যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৮৬ জিবিপিএস থেকে ১২৭ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯৫৪ জিবিপিএসে দাঁড়িয়েছে এবং গ্রাহক প্রতি মোবাইল ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ এমবি থেকে ৮০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮ জিবিতে।
তিনি বলেন, সংযোগ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় সাফল্য এলেও বাংলাদেশ এখনো মূলত একটি ‘ডিজিটাল কনজাম্পশন বা প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার’ হিসেবেই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মতো উচ্চ-মূল্যের প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা সেবা রপ্তানি হাব হিসেবে পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টেলিকম খাতের অবদান ৮ শতাংশ থেকে আরও বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব, যদি সঠিক নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা ছিল ১৪ হাজার ৮৩৩ জিবিপিএস, যার ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ৫জি প্রযুক্তির প্রসারের কারণে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই চাহিদা ১২০ টিবিপিএস (টেরাবিটস পার সেকেন্ড) ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বিশাল চাহিদা পূরণে সাবমেরিন কেবল সি-মি-উই-৬ (যা ২০২৬ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা) এবং বেসরকারি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ফাইবারের বিস্তৃতি এবং ডেটা সেন্টারের আধুনিকায়নে একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমানে জাতিসংঘের ‘টেলিকমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনডেক্স ২০২৪’ অনুযায়ী ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম, যা পরিকাঠামো উন্নয়নের বড় প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
সাহেদ আলম বলেন, টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ৫ জিবি ডাটার খরচ মাথাপিছু জাতীয় আয়ের মাত্র ০ দশমিক ৮৩ শতাংশ, যা বৈশ্বিক সাশ্রয়িতার সূচকে মোবাইল ব্রডব্যান্ডে বাংলাদেশকে ৬ষ্ঠ এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ৩য় স্থানে রেখেছে। বাংলাদেশে প্রতি গিগাবাইট (জিবি) ডাটার গড় দাম মাত্র ৭ সেন্ট (প্রায় ৯ টাকা), যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের (১২ সেন্ট বা ১৪.৭ টাকা) চেয়েও কম। তবে এই সাশ্রয়ী মূল্যের বিপরীতে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের মান এবং স্মার্টফোনের পেনিট্রেশন (যা বর্তমানে প্রায় ৫৬ শতাংশ) বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সাথে ইন্টারনেটের ট্র্যাফিক জেনারেশনে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ) এবং আমাজনের মতো গ্লোবাল ডিজিটাল জায়ান্টদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মোট মোবাইল ও ফিক্সড ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের একটি বড় অংশই এই প্ল্যাটর্ফমগুলো দখল করে রাখছে বলেও জানান সাহেদ আলম। এমন অবস্থায় নীতি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমেই কেবল টেলিকম খাতকে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলেও উপস্থাপন করেন তিনি।
টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দে’র সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। এছাড়াও মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী, মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (এমটব) মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার প্রমুখ।
