সহযোগীদের খবর

জ্বরের ৯৮% রোগীর ছিল চিকুনগুনিয়া

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো
দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার শিরোনাম ‘ক্ষমতার ‘আশীর্বাদে’ চলে ময়লা-বাণিজ্য’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে না পারলে কিংবা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা–কর্মীরা ‘অসন্তুষ্ট’ হলে একজন ব্যবসায়ীকে কী কী ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, সেই উদাহরণ হতে পারেন সাহাবুদ্দিন আলী। তিনি একসময় পুরান ঢাকায় পুরোনো লোহালক্কড় বিক্রির ব্যবসা করতেন। দেড় বছর আগে ওই ব্যবসা ছেড়ে বাড়তি কিছু লাভের আশায় মানুষের বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজে যুক্ত হন। কীভাবে তিনি কাজটি পেলেন, সেই গল্পের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ক্ষমতার ‘আশীর্বাদ’ পাওয়ার বিষয়টি।

তখন অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন চলছে। ওই সময় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরে দাপট দেখাতেন এমন কিছু ব্যক্তি, যারা কথায়-কথায় নিজেদের গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবি করতেন। যদিও তাদের মূল কাজ ছিল তদবির-বাণিজ্য। এ রকমই এক ব্যক্তির খোঁজ পান সাহাবুদ্দিন আলী। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের (কাপ্তানবাজার ও নবাবপুরের একাংশসহ আশপাশের এলাকা) বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পান তিনি।

সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, কাজটির জন্য জামানত হিসেবে ১২ লাখ টাকা (অফেরতযোগ্য) দিতে হয়েছিল সাহাবুদ্দিনকে। যদিও দরপত্রের মাধ্যমে কাজটি পাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু তখন তার সঙ্গে ক্ষমতার আশীর্বাদ থাকায় কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়নি তাকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করপোরেশন থেকে এক বছরের জন্য কাজের অনুমতি পাওয়ার পর মাত্র দুই মাস ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু এলাকার বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন তিনি।

সাহাবুদ্দিন আলীর সঙ্গে তিন দফায় চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কথা বলে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘আমাকে মারধর করার হুমকি দিছে। একরকম জোরজবরদস্তি করে বিএনপির লোকজন কাজটি নিয়ে গেছে। ছয় বছর লোহালক্কড়ের ব্যবসা করে ১২ লাখ টাকা জমিয়েছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, পুরো চালানটাই গেছে। লোকাল (স্থানীয়) বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের কাছে গিয়ে বিচার দিয়েছি, কোনো লাভ হয়নি।’
পুরোনো ব্যবসা ছেড়ে ময়লা সংগ্রহের কাজে কেন জড়িত হলেন, এমন প্রশ্নে সাহাবুদ্দিন আলী বলেন, ‘এই কাজে লস নাই, লাভ আছে।’

সাহাবুদ্দিন আলী বর্জ্য সংগ্রহের কাজের জন্য শুরুতে ২৪ জন কর্মী নিয়োগ দিয়েছিলেন, ভ্যানও কিনেছিলেন। কর্মীর পাশাপাশি ভ্যানের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন; কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই কাজটি তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর পর থেকে আর কোনো ব্যবসায় যুক্ত হতে পারেননি, বেকার সময় কাটছে তার। শুধু বললেন, পুরান ঢাকার ধূপখোলায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকেন। বাবার রেখে যাওয়া একটি দোকানের সামান্য ভাড়ায় কোনোরকমে সংসার চলছে।

সাহাবুদ্দিনের মতোই ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডে (শ্যামপুর এলাকা) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ পেয়েছিলেন আরেক ব্যবসায়ী (নারী)। তবে তিনি যুব মহিলা লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত-এমন অভিযোগ তুলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকেও কাজ করতে দেননি।

ময়লা-বাণিজ্যে নতুন নিয়ন্ত্রক
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ওয়ার্ড আছে ৭৫টি। সিটি করপোরেশন প্রতিটি ওয়ার্ডে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে (ভ্যান সার্ভিস)। একটি ওয়ার্ডের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের মাধ্যমে ঠিক করা হয়। এই কাজ পেতে ওয়ার্ডের আয়তন ও হোল্ডিং (বাড়ি) অনুযায়ী এখন করপোরেশনের তহবিলে অফেরতযোগ্য সর্বোচ্চ ১৭ লাখ এবং সর্বনিম্ন ১৫ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। আগে দিতে হতো ১২ লাখ টাকা।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই বছর ধরে মেয়র ও কাউন্সিলর নেই। আগে ময়লার কাজের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্থানীয় কাউন্সিলর এবং আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কিছু নেতাকর্মীর হাতে। এখন এই কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী।

সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছেন যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ পেয়েছেন আবদুর রহমান। তিনি ওই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে (যেখানে ২০২৪ সালে কাজটি পেয়েছিলেন সাহাবুদ্দিন আলী) কাজ পেয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাহফুজুর রহমান। ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছেন মাহবুবুর রহমান। তিনি এই ওয়ার্ডে বিএনপির সভাপতি। ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ পেয়েছেন ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি কাজী আবদুল কাইয়ুম। ৬১ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ পেয়েছেন আবদুস সালাম (হিরা)। তিনি ওই ওয়ার্ডে বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ফয়সাল হেদায়েত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, বেশির ভাগ ওয়ার্ডে বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্ব বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পেয়েছেন। কোথাও হয়তো ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির নামে নেওয়া হয়েছে, কোথাও আবার অন্য কোনো সহযোগী সংগঠনের নেতার নামে নেওয়া হয়েছে। কিছু ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানও কাজ পেয়েছে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের হাতে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি নিয়ন্ত্রণ করতেন দলটির কিছু নেতাকর্মী এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। এ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘রাজধানীতে ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে বছরে অন্তত ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় কাউন্সিলররা। সেদিন প্রথম পাতার পাশাপাশি ভেতরের পাতাতেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেসব প্রতিবেদনেও ময়লা-বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় গণ-অভ্যুত্থানে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এরপর ঢাকা দক্ষিণের ময়লা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ দলটির নেতাকর্মীদের হাতছাড়া হয়ে যায়। বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি কীভাবে হয়, কোন এলাকায় কত টাকা বিল নেওয়া হয়, কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা কতটা আছে-এসব বিষয়ে জানতে গত ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে ২১ দিন ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, বংশাল, আজিমপুর ও খিলগাঁওসহ ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১১টি ওয়ার্ড ঘুরেছেন এই প্রতিবেদক। এ সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও ময়লা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত কর্মী ও ভ্যানচালকদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে।

যেখানে যেমন খুশি
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শর্ত অনুযায়ী, বর্জ্য সংগ্রহের জন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান একটি বাসা (ফ্ল্যাট) থেকে নিতে পারবে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। তবে এই শর্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান মানে না। যেমন ধানমন্ডির ৮/এ এলাকার একটি বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী জিয়াউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ময়লার জন্য প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়।

আজিমপুর এলাকার একটি শরবতের দোকানি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি মাসে তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এই প্রতিবেদককে এক হাজার টাকার রসিদও দেখিয়েছেন তিনি।

ঢাকা দক্ষিণের কোন এলাকায় ময়লার জন্য কত টাকা নেওয়া হয়, সেই খোঁজ নিয়েছে প্রথম আলো। এতে দেখা যায়, পূর্ব জুরাইনের কমিশনার রোড এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ২০০ টাকা। আবার সেখানেরই কিছু বাড়ির প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ১০০ টাকা।

কাঁঠালবাগান ঢালের বিভিন্ন গলিতে প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ২৫০ টাকা। আবার কাঁঠালবাগানের কাছেই হাতিরপুল বাজারের পাশের বিভিন্ন ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ২০০ টাকা। আবার মুগদা-মান্ডা এলাকায় ময়লার জন্য প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ১২০ টাকা। রাজারবাগের শহীদবাগ এলাকায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে নেওয়া হয় ২০০ টাকা। খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় ময়লার বিল নেওয়া হয় ২০০ টাকা করে। পুরান ঢাকার কায়েতটুলী এলাকাতেও নেওয়া হয় ২০০ টাকা করে।
শর্ত ভঙ্গ করে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটির দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষমতায় যারা থাকে, সেই দলের কিছু নেতা-কর্মীর আয়ের উৎস এটি। আবার রাজনৈতিক যুক্ততা নেই এমন কাউকে কাজটি দেওয়া হলে নানাভাবে বাধা দেওয়া ও চাঁদা দাবি করা হয়-এ রকম সমস্যায় পড়তে হয় সেই ব্যক্তিকে। দেশের এই বাস্তবতা অস্বীকার করে লাভ নেই।

রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনোভাবে প্রভাব খাটিয়ে কেউ যদি বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজে বাড়তি টাকা নেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালাম। তিনি বলেন, কঠোরভাবে এ বিষয়টির তদারকি করা হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে যারা ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে, তাদের ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে-কোনোভাবেই ১০০ টাকার বেশি নেওয়া যাবে না। এর পরও যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

প্রভাব খাটিয়ে দখল
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বাসাবো ও মাদারটেক এলাকায় (৪ নম্বর ওয়ার্ড) বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে শহিদুল্লাহ কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের দুজন কর্মী (ব্যবস্থাপক পর্যায়ের) নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাস ময়লা সংগ্রহের কাজ করতে পেরেছেন তারা। গত ৫ এপ্রিল তাদের অফিসে এসে জোর করে এই কাজের নিয়ন্ত্রণ নেন ওয়ার্ড বিএনপির কয়েকজন নেতা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি (বাসাবো শাখা) হারুন অর রশিদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ওই ঘটনার একটা প্রেক্ষাপট আছে। এটা এখন বলা যাবে না। আর কিছু তিনি বলতে চাননি।

অন্যদিকে এই অভিযোগের বিষয়ে ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক (মাদারটেক শাখা) ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা এই ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহের কাজ পেয়েছে তাদের কাছ থেকে টাকা দিয়ে আমরা কিনে নিয়েছি। অতীতেও এ রকম কাজ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা মিলেমিশে করতেন। এখন আমরাও সেভাবে করছি।’
পরে বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। এই বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দরপত্রের মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ (বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ) দেওয়ার পর মাঝপথে কোনো কারণ ছাড়াই অন্য কাউকে ওই কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আর দরপত্রের শর্তে বলা আছে এক বছর মেয়াদী এই কাজ কোনোভাবেই হস্তান্তর বা বিক্রিযোগ্য নয়।

ময়লা-বাণিজ্যে লাভ কত
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১০ বছর দক্ষিণ সিটির একটি ওয়ার্ডে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করেছেন, এমন একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি বাসা থেকে ১০০ টাকা নিলেও ওয়ার্ড ভেদে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে তিন লাখ টাকা লাভ থাকে; কিন্তু বেশির ভাগ জায়গায় নেওয়া হয় ১৫০-২০০ টাকা। সেই হিসাবে প্রতিটি ওয়ার্ডে মাসে গড়ে সাড়ে লাখ টাকা লাভ হয়। যদি চার লাখ টাকাও ধরা হয়, তাহলে দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডে মাসে ময়লা-বাণিজ্য থেকে লাভ হয় তিন কোটি টাকা। বছরে লাভ হয় ৩৬ কোটি টাকা।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণে হোল্ডিং (ভবন/ফ্ল্যাট) আছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮১টি। প্রতিটি হোল্ডিং থেকে গড়ে ১৫০ টাকা নেওয়া হলে মাসে ময়লা-বাণিজ্য থেকে আয় কমপক্ষে ৪ কোটি ৪০ লাখ ৮২ হাজার টাকা। কোথাও কোথাও ছয় থেকে আটটি ফ্ল্যাট নিয়ে যে ভবন, সেই ভবনেরও হোল্ডিং নম্বর একটিই থাকে। আবার কোথাও কোথাও একটি ফ্ল্যাটেই একটি হোল্ডিং হয়। সিটি করপোরেশনে সাধারণত একটি হোল্ডিংয়ে ছয়টি ফ্ল্যাট থাকে, এভাবে হিসাব করে। সেটি বিবেচনায় নিলে ঢাকা দক্ষিণে ফ্ল্যাট আছে ১৭ লাখ ৬৩ হাজার ২৮৬টি। প্রতি ফ্ল্যাটের জন্য গড়ে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হলে ময়লা-বাণিজ্য থেকে মাসে আয় কমপক্ষে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বছর হিসাবে যা কমপক্ষে ৩১৭ কোটি টাকা।

সিটি করপোরেশনের মৌলিক কাজগুলোর একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা। এ জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর গৃহকর খাতে যে টাকা নেয়, তার ২ শতাংশ নেওয়া হয় পরিচ্ছন্নতা বাবদ।

নগর-পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সিটি করপোরেশনকে নগরবাসী প্রতিবছর যে গৃহকর দেয়, তার বিপরীতে পরিচ্ছন্নতাসহ মৌলিক নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। করপোরেশন ১০০ টাকা ফি নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক এলাকায় ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করছে। এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিশৃঙ্খলা দূর করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।

সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘জ্বরের ৯৮% রোগীর ছিল চিকুনগুনিয়া’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর সারাদেশে ব্যাপক মাত্রায় জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মশাবাহিত গুরুতর রোগ চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা ধরা পড়েনি।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাঁচটি হাসপাতালের ৪৪২ জন রোগীর ওপর একদল চিকিৎসক-গবেষক গবেষণা চালান, তাতে ওঠে আসে গত বছর জ্বরে আক্রান্ত ৯৮ শতাংশ রোগী পরবর্তী সময়ে চিকুনগুনিয়ায় সংক্রমিত হয়েছেন।
তারা জানান, তাদের গবেষণা ছিল বহুমাত্রিক ক্রস-সেকশনাল। গত বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে এটি পরিচালিত হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ। অনেককেই জ্বরে ভুগতে হয় টানা কয়েক সপ্তাহ।

বণিক বার্তা
বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৬৪,৪০৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে, যার পরিমাণ প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণও করতে পারছে না ব্যাংকটি।
এতে গত বছরের শেষে ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ৬৪ হাজার ৪০৬ কোটি টাকায় ঠেকে।
বিতরণকৃত ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ার ধাক্কায় জনতা ব্যাংকের আয়েও বিপর্যয় নেমেছে।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির সুদ খাতে লোকসান ৫ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটি এখন টিকে আছে সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদ আয়ের ওপর।
গত বছর বিনিয়োগ বা সরকারি কোষাগার থেকে ব্যাংকটি তিন হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা আয় করেছে। এরপরও বছর শেষে তিন হাজার ৯৩১ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে জনতা ব্যাংক।

আজকের পত্রিকা
আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘হামের চিকিৎসায় চাপে পরিবার।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি হিসাবেই চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ৫৯ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অন্তত পৌনে ৩৭ হাজার শিশু।
আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগের পরিবারই চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের কারণে চাপের মুখে পড়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুকে একটি হাসপাতালে নিলেই সুস্থ হচ্ছে, এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যাচ্ছে। শিশুদের নিয়ে ছুটতে হচ্ছে একাধিক জায়গায়।

এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে খরচ তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাস্তবে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর বড় অংশ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
নিউমোনিয়া , শ্বাসকষ্টসহ জটিলতা দেখা দিলে একাধিক হাসপাতাল যেতে বা নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ/পিআইসিইউ) সেবা নিতে খরচ কয়েক গুণ বাড়ছে। এর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স , যাতায়াত ও দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানের খরচ পরিবারগুলোকে বিপদে ফেলছে।

যুগান্তর
যুগান্তরের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘’অপপ্রচারের’ বিরুদ্ধে মাঠে নামছে বিএনপি।’ প্রতেবেদনে বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে ‘অপপ্রচারের’ বিরুদ্ধে মাঠে নামছে বিএনপি। একই সঙ্গে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ তৃণমূলে তুলে ধরতেও ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সারা দেশের জেলা ও মহানগরে কেন্দ্র থেকে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এই চিঠি সারা দেশের জেলা ও মহানগরে পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘সব জেলা-মহানগর এবং দলের স্বীকৃত অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে কর্মসূচি দেওয়ার জন্য আপনাদের নির্দেশ দেওয়া হলো।’ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে।

তবে সাংগঠনিক সভা ও কর্মী সভার মাধ্যমে দল ও সংগঠনকে সক্রিয় করাই চিঠি দেওয়ার উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির নিজস্ব কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি সরকারে থাকার কারণে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলো পালন করতে থাকব।’

নয়া দিগন্ত
নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার শিরোনাম ‘সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদের জন্য তৎপর সরকারদলীয় এমপিরা।’ প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় সংসদের আসন্ন বাজেট অধিবেশনেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ইতোমধ্যে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হলেও বাকি মন্ত্রণালয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটিগুলো নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও তদবির। বিশেষ করে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পেতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। আলোচনা হচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোটেও।

সাধারণত যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান না কিংবা জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পান না, তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মর্যাদা দেওয়া হয়।
যদিও এসব কমিটির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই, তারপরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নথিপত্র তলব এবং কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা থাকায় সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যত সরকারের ওপর সংসদের ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে দেখা হয়।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন