ট্রাইব্যুনালে মায়ের জবানবন্দি

‘ছেলের গুলিবিদ্ধ ছবি দেখেই অজ্ঞান হয়ে যাই’

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ১৯ জুলাই রাত আনুমানিক ১০টার দিকে রাজধানীর বনশ্রী হাউজিংয়ের গ্যারেজে হাঁটাহাঁটি করছিলাম ছেলের জন্য। এমন সময় একটি ছেলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে—‘আন্টি কী হয়েছে?’। আমি বললাম—‘আমার ছেলে এখনো বাসায় ফেরেনি, ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না’। তখন ওই ছেলেটি তার মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে বলে—দেখেন এইটা আপনার ছেলে কী না। আমার ছেলের ডান কানের দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কানের দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। রাতেই লাশ নিয়ে দিনাজপুর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই এবং পরদিন ২০ জুলাই তার লাশ দাফন করা হয় বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর জবানবন্দিতে আরিশা আফরোজ নামের এক মা এসব কথা বলেন।

বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলামসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন।

এ মামলায় রেদোয়ানুল ছাড়া গ্রেপ্তার অপরজন হলেন-বিজিবির সাবেক কর্মকর্তা মেজর মো. রাফাত বিন আলম। এছাড়া পলাতক আসামিরা হলেন, ডিএমপির খিলগাঁও অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান।

জবানবন্দিতে আরিশা আফরোজ বলেন, ‘আমি শহীদ আশিকুল ইসলামের আম্মু। আমার ছেলে বনশ্রী নিবরাশ মাদ্রাসায় নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতো। আমি টেইলার্সের কাজ করি। আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই শুক্রবার আমার ছেলে শহীদ আশিকুল ইসলাম (১৪) জুম্মার নামাজ শেষে বাসায় এসে আমার সঙ্গে খাবার খেয়েছে। বনশ্রী হাউজিংয়ের জি ব্লকের ৩ নম্বর রোডে আমার এক ছোট বোনের বাসায় (৪ নম্বর বাসায়) খাবার খেয়েছি। আন্দোলনকারীদের আওয়াজ শুনে আমার ছেলে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে যায়। আমি দেখতেছিলাম যে, আমার ছেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অ্যাভিনিউ রোডে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে গোলাগুলি শুরু হলে আমার ছেলেসহ আন্দোলনকারীরা ধাওয়া খেয়ে দৌড়ে ২ নম্বর রোডের দিকে চলে যায়। আমি কয়েকজনের গায়ে গুলি লাগতে দেখি। কারও হাতে, কারও পায়ে, কারও মাথায় গুলি লেগেছে। ওদের ক্ষতস্থানে কাপড় দিয়ে বেঁধে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। অতঃপর অনেক গোলাগুলি হয় এবং অনেক মানুষকে পাখির মতো মারা হয়। অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছেলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। রাত পর্যন্ত ছেলে আসে নাই। রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে আমি ৪ নম্বর হাউজের গ্যারেজে হাঁটাহাঁটি করছিলাম ছেলের জন্য। এমন সময় একটি ছেলে আমাকে জিজ্ঞাসা করে—‘আন্টি কি হয়েছে?’ আমি বলি—‘আমার ছেলে এখনো বাসায় ফেরেনি, ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না’। তখন ওই ছেলেটি তার মোবাইলে একটি ছবি দেখিয়ে বলে—দেখেন এইটা আপনার ছেলে কী না। তখন মোবাইলে ছবিটি দেখেই চিনতে পারি যে, এটি আমার ছেলে। ছবিতে তার মাথায় ব্যান্ডেজ ছিলো, চোখ বন্ধ ছিলো। ছবি দেখেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। আনুমানিক রাত ১২ টার দিকে আমার ছেলেকে দেখতে এ্যাডভান্স হাসপাতালে যাই। কর্তব্যরত ডাক্তাররা জানায় যে, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। আমি দেখি আমার ছেলের ডান কানের দিক দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কানের দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। রাতেই লাশ নিয়ে দিনাজপুর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই এবং ২০ জুলাই তার লাশ দাফন করা হয়।’

পরবর্তীতে জানতে পারি যে, কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাফাত, এডিসি রাশেদ আর মশিউর শেখ হাসিনার নির্দেশে গুলি চালিয়েছে। এর সঙ্গে আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদের জড়িত ছিলো। আমি এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও আন্দোলনকারীদের মাধ্যমে জেনেছি। আমি নিজেও দেখেছি। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন