সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন আগামীকাল। নেই রাজনৈতিক উত্তাপ। বারের নির্বাচন এলেই সুপ্রিম কোর্টে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক বলয়ের আইনজীবীদের সরব উপস্থিতি, আদালতপাড়া জুড়ে পোস্টার-ব্যানার, প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ আর টানটান উত্তেজনা বিরাজ করতো। তবে এবার সেই চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে নেই তেমন নির্বাচনী আমেজও। ভোট নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যেও দেখা যায়নি তেমন আগ্রহ। আগামীকাল বুধবার ও বৃহস্পতিবার দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সমর্থিত আইনজীবীরা পৃথক প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পাশাপাশি রয়েছেন কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও। তবে রাজনৈতিক মেরূকরণে বড় একটি পক্ষ অনুপস্থিত থাকায় নির্বাচন কার্যত একপেশে ও নিরুত্তাপ হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আইনজীবীদের অনেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় সপ্তাহ জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। প্রার্থীদের গণসংযোগ, মতবিনিময়, পোস্টারিং, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশও চলতো। কিন্তু এবার নির্বাচনের কয়েকদিন আগেও সেই সরব উপস্থিতি চোখে পড়েনি। আদালতপাড়ার অনেক আইনজীবী বলছেন, নির্বাচনের পরিবেশে প্রাণ নেই। ভোট নিয়ে আলোচনা-আগ্রহও সীমিত।
আইনজীবীদের একটি অংশের আশঙ্কা, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের মতো সুপ্রিম কোর্ট বারেও ভোটার উপস্থিতি কম হতে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশের অভাব এবং নির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম ধারণা ভোটারদের অনাগ্রহ বাড়িয়েছে। অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা নির্বাচনে না থাকায় বড় অংশের ভোটার ভোটদানে বিরত থাকবেন।
কয়েকজন আইনজীবী বলেন, আগে সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ঘিরে আদালতপাড়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। প্রার্থীদের সরব প্রচারণা, ভোটারদের দৌড়ঝাঁপ এবং বিভিন্ন গ্রুপের সক্রিয়তা চোখে পড়তো। কিন্তু এবার সেই পরিবেশ অনুপস্থিত। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ভোট নিয়ে সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ নেই। আগের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই, উত্তেজনাও নেই। আরেক আইনজীবীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা না থাকায় নির্বাচনের মূল আকর্ষণ কমে গেছে। ফলে অনেক ভোটারই নির্বাচন থেকে মানসিকভাবে দূরে রয়েছেন। তাদের মতে, এ পরিস্থিতিতে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের মতো সুপ্রিম কোর্ট বারেও ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আওয়ামী লীগপন্থি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু গণমাধ্যমকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বারের ৭৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বড় একটি দলের সমর্থকদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। এই স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে কলঙ্কজনক। আওয়ামীপন্থি ৪২ আইনজীবীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল মানবজমিনকে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বার নতুন কোনো আইন তৈরি করেনি। সরকার যে আইন করেছে এবং গেজেট প্রকাশ করেছে, সেই আইনের ভিত্তিতেই নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নির্বাচন থেকে বাদ দিয়েছে।
সবমিলিয়ে এবারের সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ও পেশাগত গুরুত্ব থাকলেও মাঠের বাস্তবতায় সেই পুরনো উত্তাপ আর নেই। এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত ভোটের দিন আইনজীবীদের উপস্থিতি কতোটা হয় এবং নিরুত্তাপ এই নির্বাচন কতোটা সাড়া ফেলে আদালতপাড়ায়। সুপ্রিম কোর্ট বারের এই নির্বাচনে ১৪টি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সভাপতি, দুই সহ-সভাপতি, সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ, দুই সহ-সম্পাদক এবং সাত সদস্য পদ।
বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল: সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। দু’টি সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন মো. মাগফুর রহমান শেখ ও মো. শাহজাহান। সম্পাদক পদে মোহাম্মদ আলী এবং কোষাধ্যক্ষ পদে মো. জিয়াউর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সহ-সম্পাদক পদে রয়েছেন মাকসুদ উল্লাহ ও মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম মুকুল। সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এ কে এম আজাদ হোসেন, এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী, মো. কবির হোসেন, মো. টিপু সুলতান, মো. জিয়া উদ্দিন মিয়া, রিপন কুমার বড়ুয়া ও ওয়াহিদ আফরোজ চৌধুরী।
জামায়াত সমর্থিত সবুজ প্যানেল: সভাপতি পদে রয়েছেন আবদুল বাতেন। সহ-সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আব্দুল হক ও মইনুদ্দিন ফারুকী। সম্পাদক পদে এ কে এম রেজাউল করিম খন্দকার এবং কোষাধ্যক্ষ পদে এস এম জাহাঙ্গীর আলম প্রার্থী হয়েছেন। সহ-সম্পাদক পদে রয়েছেন মো. তারিকুল ইসলাম ও যোবায়ের আহমদ ভূঁইয়া। সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী, ফারজানা খানম, ইসরাত জাহান অনি, মো. ফয়েজউল্লাহ, মো. জুবায়ের টিটু, মাহমুদুল হাসান ও মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন লিংকন।
এনসিপি সমর্থিত লাল-সবুজ প্যানেল: এনসিপি সমর্থিত আইনজীবীরা এবার আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছেন। সম্পাদক পদে আজমল হোসেন বাচ্চু, সহ-সম্পাদক পদে মোস্তফা আসগর শরীফী এবং সদস্য পদে আমিনা আক্তার লাভলী, কাজী আকবর আলী, মো. বনি আমিন ও মাজহারুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ ছাড়া প্যানেলের বাইরে সভাপতি পদে ইউনুছ আলী আকন্দ এবং সম্পাদক পদে ফরহাদ উদ্দিন ভূঁইয়া, মো. আবু ইয়াহিয়া দুলাল, মো. ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ আশরাফ উজ-জামান খান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সদস্য পদে রয়েছেন মো. জোবায়ের তায়েব ও তপন কুমার দাস।
