আমাকে যখন গুম করে জেআইসিতে বন্দি রাখা হয়, তখন এক কর্মকর্তা আমার উদ্দেশে বলেন, 'আপনি যখন বাইরে ছিলেন তখন কি খালে-বিলে বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পাননি? আপনি কি দেখেননি যে ঐ সময় ট্রেন লাইনে অতিরিক্ত মৃত মানুষের লাশ পাওয়া যায়? আপনি যদি আর কখনও এমন করেন তাহলে আপনাকে বস্তার ভেতরে ভরে পুকুরে ফেলে দেব'- ট্রাইব্যুনালে এমন সাক্ষ্য দিয়েছেন নাজিম উদ্দিন নামের এক ভুক্তভোগী।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ডিজিএফআই'র জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) ২৬ জনকে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক ও বর্তমান ১১ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এ সাক্ষ্য দেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তিনি এ সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে তার জেরা এখনও চলমান রয়েছে।
জবানবন্দিতে নাজিম উদ্দীন বলেন, আমি একজন কম্পিউটার ব্যবসায়ী। স্থানীয় বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি মনিরামপুর পৌর শাখা যুবদলের দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। এছাড়া, আমি মনিরামপুর উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ২০১৩ সালে একটি প্রজেক্টের অধীনে দুই বছরের জন্য মালয়েশিয়া গমন করি। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে আমি বাংলাদেশে চলে আসি। বাংলাদেশে আসার পর আমি সরাসরি স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করি এবং একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করি। আমি ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ এবং ভারতের বিপক্ষে ফেসবুকে লেখালেখি করতাম। সে কারণে আমি অনেকের শত্রু হয়ে যাই। এটা বুঝতে পেরে ব্যবসা শুরু করার জন্য ঢাকায় চলে আসি। মিরপুর ডিওএইচএস এর ভেতরে আমি একটি অফিস ভাড়া নেই। ২৫ মে, ২০১৬ সালে আনুমানিক সকাল ১১টার সময় মিরপুর-১২ বিআরটিএ বাস স্ট্যান্ডের বিপরীত দিকে মোল্লা টাওয়ার থেকে অফিস ভাড়া সংক্রান্ত চুক্তিনামার কিছু কাগজপত্র ফটোকপি করে বের হয়ে মোল্লা টাওয়ারের সামনে রাখা আমার মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হবো। এমন সময় কালো রংয়ের একটি হাইস মাইক্রোবাস আমার গতিরোধ করে। ঐ মাইক্রোবাস থেকে কয়েকজন বের হয়ে একজন আমার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে আমার ঘাড় ধরে ফেলে। একজন এসে আমার মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে যায়। আরেকজন আমাকে আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। আমি আমার নাম নাজিম বললে তারা আমাকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে। আমি তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে "আমাদের সাথে গেলে আমাদের পরিচয় জানতে পারবে"।
তাদের কথা না শুনলে তারা অস্ত্র বের করবে বলে হুমকি দেয়। সাহায্য চাওয়ার জন্য আমি চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। এমতাবস্থায় তাদের মধ্যে দুইজন আমার ঘাড় ধরে নিয়ে আমাকে মাইক্রোবাসে উঠায়। সেখান থেকে কালশীর মোড়ে এসে মাইক্রোবাসটি থামে। আমার নিকট থাকা একলাখ টাকা, দুইটি আইফোন, আমার মানিব্যাগ ও কিছু জরুরি কাগজপত্র তারা আমার কাছ থেকে নিয়ে নেয়। আমার দু হাত পেছনদিকে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরায় এবং কালো কাপড় দিয়ে আমার চোখ বেঁধে ফেলে এবং আমাকে জমটুপি পরায়। অতপর গাড়িটি ১০-১২ মিনিট চলার পর একজায়গায় থামিয়ে আমাকে গাড়ী থেকে নামায়।
আমাকে একটি বিল্ডিংয়ে উঠায়। তখন কেচিগেট খোলার শব্দ পাই। একটি লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরতে দেয়। পরে একটি রুমে নিয়ে আমাকে একটি চেয়ারে বসায়। সেখানে আমার নাম ও পুরো ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে। এরপর আমাকে বলে, "নাজিম উদ্দিন" নামক আইডিটা কে চালায়। আমি নিজে চালাই স্বীকার করলে তারা হাসাহাসি করে। হঠাৎ করে তারা একটি লাঠি দিয়ে আমার দুই উরুতে ও পিঠে আঘাত করতে থাকে এবং বলে আমরা যা বলবো তাই করবে। তারপর আমাকে ঐ রুম থেকে বের করে। প্রথমে বাম দিকে নিয়ে যায়। তারপর একটু সামনে নিয়ে একটি দরজা খোলে এবং একটু সামনে নিয়ে ডান পার্শ্বে একটি সেলের ভেতরে ঢুকায়। এরপর আমার চোখ এবং হাত খুলে দেয়। আমি নিজেকে আনুমানিক ৮ ফুট বাই ১১ ফুট একটি ঘরের ভেতর দেখতে পাই। যার এক কোনায় একটি কাঠের চৌকি আর একটি প্লাস্টিকের পট ছিল। প্রথম ২-৩ দিন আমি ঘোরের মধ্যে ছিলাম, বিধায় কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। এরপর আমি একটু স্বাভাবিক হলে খেয়াল করি যে, ঘরের দেওয়ালে প্রচুর লেখালেখি করা আছে। আমি সেগুলো পড়ি এবং সেখানে বিভিন্ন মানুষের নাম, মোবাইল নম্বর ও আর্তনাদ লেখা আছে। এর ভেতরে একটি লেখা ছিল "এটা ডিজিএফআই এর হেডকোয়ার্টার জেআইসি সেল”। আমি দীর্ঘ তিন বছর বনানীস্থ ড্যাফোডিল কম্পিউটার নামীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সুবাদে আমি পুরো এলাকাটি কমবেশি চিনি। আমি যখন ঐ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম তখন ডিজিএফআইয়ের ১৪তলা বিল্ডিংটি অনেকবার দেখেছি।
পরবর্তীতে পার্শ্ববর্তী মসজিদ থেকে মাঝে মধ্যে পূর্ব কাফরুল নিবাসী বিভিন্ন মানুষের মৃত্যু এবং জানাজা সংক্রান্ত ঘোষণা আমি শুনতে পেতাম। জেআইসি বন্দীশালায় থাকার সময় প্রতিনিয়ত বিমান উঠা-নামার শব্দ পেতাম। পরবর্তীতে আমি দেওয়ালের লিখন, বিমানের উঠা-নামা এবং পূর্ব কাফরুল মসজিদের ঘোষণা ইত্যাদির মাধ্যমে নিশ্চিত হই, আমি ডিজিএফআই এর অধীনে আছি। সেখানে থাকা অবস্থায় তারা আমার জীবনী লেখার জন্য কাগজ-কলম দিয়ে সময় বেঁধে দিত। সময়ের ভেতরে লেখা শেষ করতে না পারলে ঘুমাতে দিত না। প্রথম ১০ দিনে আমাকে ৪ বার উপরোক্ত রুমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পরবর্তীতে ১৫-২০ দিন পর পর ঐ রুমে নিয়ে একদিন জিজ্ঞাসাবাদ করতো। আমি কেন আওয়ামী লীগ ও ভারতে বিরুদ্ধে লেখালেখি করি তা জানতে চায়। আমার সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতিতে কারা কারা জড়িত আছে তাও জানতে চায়। আমার সাথে কারো সম্পর্ক নাই বললে আমার উপর নির্যাতন চালানো হত।
একদিন আমি আমার সেলের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় বাম পাশ থেকে একজন আমার নাম জিজ্ঞাসা করে। আমি তখন বুঝতে পারি আমি ছাড়াও আশেপাশে আরো অনেকেই এখানে আছে। আমি তাকে আমার নাম ও বাড়ির ঠিকানা বলি। পরবর্তীতে সেখানে গার্ড না থাকলে আমরা একে অপরের সাথে নিচু স্বরে কথা বলতাম। আমার বাম পাশের সেলে বাড্ডার লিটন, তার বাম পাশে তেহজীব এবং আমার ডান পাশে শামীম ও তোজো নামে একজন ছিলো। আমাদের সেলের বিপরীত দিকে ৫টি রুম ছিল, সেখানে প্রথম রুমে আবুজর, আরেক রুমে ইবতেশাম সামী, তারপর মামুন এবং হাসান থাকতো। দুই মাস পর শামীমকে অন্য রুমে নিয়ে যায়। শামীমের সেলে হাসান নামে রাজশাহীর একজনকে নিয়ে আসে। তিন মাস পরে শরিফুল নামে সিঙ্গাপুর প্রবাসী একজনকে আমার রুমে দেয়। একমাস পরে তাকে নিয়ে যায়। তার কয়েকদিন পর আমাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপরোক্ত রুমে নিয়ে যায় এবং বলা হয়, আপনার তদন্ত শেষ হয়েছে। আপনাকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিন্তু আরো কিছুদিন থাকতে হবে। একদিন আমার মাথা ব্যথা হলে আমি দেওয়ালে আস্তে করে মাথায় আঘাত করতে থাকি। ঐদিন গভীর রাতে আমাকে হাতকড়া পরিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। আমাকে বলে "আপনি যখন বাইরে ছিলেন তখন কি খালে-বিলে বস্তাবন্দি লাশ দেখতে পাননি? আপনি কি দেখেননি যে ঐ সময় ট্রেন লাইনে অতিরিক্ত মৃত মানুষের লাশ পাওয়া যায়? আপনি যদি আর কখনও এমন করেন তাহলে আপনাকে বস্তার ভেতরে ভরে পুকুরে ফেলে দেব"। এরপর কিছু নছিহত করে আমাকে আমার সেলে নিয়ে আসে।
পাঁচ মাস পরে একদিন বিকেলে আমাকে আমার প্যান্ট এবং গেঞ্জি দিয়ে বলে আজকে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। ঐদিন গভীর রাতে চোখ বেঁধে, হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রুম থেকে বের করে একটি গাড়িতে উঠায়। আমি বুঝতে পারি গাড়িতে আরো কয়েকজন আছে। আনুমানিক ২৫-৩০ মিনিট গাড়ি চালানোর পর এক জায়গায় থামে। সেখানে তিনটি সিঁড়ি বেয়ে আমাকে একটি রুমে নিয়ে যায়, যা লোহার রড দিয়ে তৈরি। পরের দিন জানতে পারি আমার সঙ্গে আবুজর, ইবতেশাম সামি ও মামুনকে নিয়ে এসেছে। ঐখানে চারটি কালো রুম ছিলো। তার একটিতে লক্ষীপুরের ডাঃ ইকবাল আগে থেকেই ছিলো। সেখানে যারা আমাদের দেখাশোনা করতো তাদের কাছে জানতে পারি যে, আমরা র্যাব-২ এ আছি। আনুমানিক ১৮-১৯ দিন পর লিটন সহ ৮-১০ জন কে আমার রুমে নিয়ে আসে। বিকেলে ডাঃ ইকবালকে নিয়ে যায় এবং আমাকে তার রুমে স্থানান্তর করে। রাতের বেলায় কোনো এক সময় লিটনসহ বাকিদেরও নিয়ে যায়। তখন সেখানে আমি, আবুজর, ইবতেশাম সামি ও মামুন চারজন ছিলাম।
আনুমানিক ২০-২২ দিন পর একদিন রাতে আমি, আবুজর ও ইবতেশাম সামিকে বের করে র্যাব-১০ এ নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের বাথরুমের মধ্যে আটকে রাখে। যার দরজা ছিলো লোহার শিকের এবং বাথরুমটি সিসি ক্যামেরা সংযুক্ত ছিলো। ওখানে চারটি বাথরুম ছিলো। বাকি দুইটি বাথরুমে তাজুল ইসলাম ও নূর আলমকে পাই। একটি বাথরুমে আবুজর ও আরেকটি বাথরুমে আমিসহ ইবতেশাম সামিকে রাখে। পরের দিন ভোরে আমাদেরকে ওখান থেকে বের করে একটি মাইক্রোবাসে উঠায়। মাইক্রোবাসে উঠানোর সময় আমার চোখের নিচ দিয়ে দেখতে পাই সেখানে একটি র্যাবের পিকআপ দাঁড়িয়ে। যার গায়ে র্যাব-১০ লেখা ছিলো। ওখান থেকে আমাদেরকে চট্টগ্রামে নিয়ে যায় এবং র্যাব-৭ এ হস্তান্তর করে।
৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ ভোরে একটি মাইক্রোতে তাজুল ইসলাম ও আমাকে উঠায়। মাইক্রোটি আকবরশাহ থানাধীন কর্নেল হাট এলাকায় গিয়ে থামে। সেখানে আমাদের চোখের বাঁধন খুলে দেয় এবং পেছন থেকে দুহাত সামনে এনে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। একটি গামছা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় যাতে হ্যান্ডকাফ দেখা না যায়। গাড়ি থেকে নামিয়ে সামান্য হেঁটে একজায়গায় দাঁড় করানো হয়। সেখানে একটি কাপড় বিছিয়ে দুইটি ব্যাগ, দুইটি পিস্তল এবং কিছু গুলি রাখা হয় এবং আমাদের ছবি তোলা হয়। অতঃপর আবার গাড়িতে উঠিয়ে চোখ বেঁধে আনুমানিক ১০-১৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে মুকিম তালুকদারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অনেক মানুষের পদচারণা ছিল। আমাদেরকে দ্বিতীয় তলার একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে আবুজর, ইবতেশাম সামি এবং নূর আলমকে দেখতে পাই। তখন পাশের বিল্ডিং থেকে কেউ আমাদের ভিডিও করছিল। র্যাব সদস্যরা তা দেখতে পেয়ে আমাদের মাথায় হেলমেট পরিয়ে দেয় এবং যে ভিডিও করছিলো তাকে ধরে আনার নির্দেশ দেয়। ওখানে কিছু নাটক করে আমাদেরকে নিচে নামিয়ে আনে এবং সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করা হয়। আমাদেরকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মাইক্রোতে উঠিয়ে র্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঐদিন রাত ৩ টার সময় আকবর শাহ থানায় আমাদের হস্তান্তর করে। আমি এবং তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দেয় এবং বাকিদের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা দেয়। যার মধ্যে একটি মামলায় খালাস পেয়েছি। বাকিগুলো বিচারাধীন আছে।
১৮ মাস জেল খাটার পরে আমি ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পাই। বাড়িতে যাওয়ার পরে আওয়ামী লীগ নেতাদের অত্যাচার এবং প্রশাসনের ঝামেলার কারণে আমি দেশ ত্যাগ করে সৌদিআরব চলে যাই। অতঃপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখে আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমি আমার আটক, নির্যাতন, হয়রানী ও মিথ্যা মামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার চাই। এসময় সাক্ষী অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন।

আমজনতা
২ মাস আগেএই রকম হাজারো গুম-খু*নের কুশীলবদের ধোয়া তুলসীপাতা বানানোর জন্য সরকারের ভেতরে. একটা শক্তিশালী গ্রুপ এখন সদা সক্রিয়র।