দলে চ্যালেঞ্জের মুখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী

দলে চ্যালেঞ্জের মুখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী

ফন্ট সাইজ:

বৃটেনে ক্ষমতাসীন লেবার দলের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইংল্যান্ডের স্থানীয় কাউন্সিল, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দলটির পরাজয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছেন দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার। এমনকি দলের কিছু এমপি তার পদত্যাগও দাবি করেছেন। এমন অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার দায়িত্বে তিনি ডেকে এনেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন ও সাবেক উপনেতা হ্যারিয়েট হারম্যানকে।

পার্লামেন্টের ব্যাকবেঞ্চাররা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তার মধ্যে লেবার পার্টির এক এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট সতর্ক করে বলেছেন, সোমবারের মধ্যে কেউ যদি দলীয় নেতা কিয়ের স্টারমারকে চ্যালেঞ্জ না করেন, তাহলে তিনি নিজেই নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করার চেষ্টা করবেন। বিবিসিকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ক্যাথরিন ওয়েস্ট বলেন, তার পছন্দের পথ হবে ক্যাবিনেট নিজেদের মধ্যে পুনর্গঠন করবে এবং তাদের সেরা বক্তা ও যোগাযোগ দক্ষতাসম্পন্ন কাউকে স্যার কিয়েরের পরিবর্তে সামনে আনবে, যাতে আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব নির্বাচন এড়ানো যায়।

তবে লেবারের ভয়াবহ নির্বাচনী ফলাফলের পর ক্যাথরিন ওয়েস্ট বলেন, তিনি ক্যাবিনেটকে সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। সোমবারের মধ্যে যদি কোনো নেতৃত্বপ্রত্যাশীর কাছ থেকে সাড়া না পান, তাহলে তিনি নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য লেবার এমপিদের সমর্থন চাইবেন। এটি ঘটাতে হলে লেবার এমপিদের কমপক্ষে ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৮১ জনকে তার পক্ষে আসতে হবে। সাবেক জুনিয়র পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাথরিন ওয়েস্ট বলেন, বর্তমানে তার সমর্থনে ১০ জন এমপি রয়েছেন। তারা নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিতে তাকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত। তবে তিনি আত্মবিশ্বাসী যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক এমপি সামনে আসবেন।

হর্নসি অ্যান্ড ফ্রিয়ার্ন বারনেটের এমপি রেডিও ৪-এর পিএম অনুষ্ঠানে বলেন, আমার পছন্দের পথ হলো ক্যাবিনেট নিজেদের মধ্যে রদবদল করবে, যেখানে প্রচুর মেধাবী মানুষ আছেন এবং কিয়েরকে এমন একটি ভিন্ন দায়িত্ব দেয়া হবে যা তিনি হয়তো উপভোগ করবেন। সম্ভবত আন্তর্জাতিক কোনো ভূমিকা। তিনি বলেন, তারপর এমন ব্যক্তিদের সামনে আনা হবে যারা মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম, যারা খুবই দক্ষ, যাতে ন্যূনতম ঝামেলায় পরিবর্তন আনা যায়।

তবে ক্যাবিনেট অফিসমন্ত্রী নিক থমাস-সাইমন্ডস এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে আমরা দেখেছি, ক্ষমতায় থাকা কোনো দল যখন বারবার নেতা বদলাতে শুরু করে তখন কী হয়। রেডিও অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, এতে শুধু অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সরকারের কাজ বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগ নষ্ট হয়। ক্যাথরিন ওয়েস্ট নিজে লেবার নেতা হতে চাইছেন না, তবে তার পদক্ষেপ অন্যদের নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে উৎসাহিত করতে পারে। তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে এবং লেবার এমপিরা যদি উল্টো স্যার কিয়েরের পেছনে একজোট হন, তাহলে স্টারমারের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।

ইংল্যান্ডের স্থানীয় কাউন্সিল, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পরও স্যার কিয়ের বলেছেন, তিনি দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে চলে যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী এ সপ্তাহে বড় একটি ভাষণ এবং নতুন আইন প্রণয়ন কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে নিজের সরকারকে নতুনভাবে শুরু করার চেষ্টা করবেন। অবজারভার এবং মিরর পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও কাছাকাছি যাওয়ার ইচ্ছার বিষয়ে তিনি জোরালো অবস্থান নেবেন। তিনি রিফর্ম ইউকের সঙ্গে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি করতে চান। এ জন্য তিনি বলবেন, ব্রাসেলসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে তিনি পিছপা হবেন না এবং আগামী বছর এমন একটি কর্মসূচি চালুর আশা করছেন যার মাধ্যমে তরুণ ইইউ নাগরিকরা সাময়িকভাবে বৃটেনে কাজ করতে পারবেন এবং বৃটিশ তরুণরাও ইউরোপে একই সুযোগ পাবেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা সামাজিক মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সমর্থন জানান। তবে শুক্রবার থেকে নির্বাচনের ফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর প্রায় ৩০ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে নেতা পরিবর্তন বা স্যার কিয়েরের বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণার দাবি তুলেছেন। ইংল্যান্ডের কাউন্সিল নির্বাচনে লেবার ১ হাজার ৪৬০টির বেশি আসন হারিয়েছে। উত্তর ইংল্যান্ড ও মিডল্যান্ডসের সাবেক লেবার ঘাঁটিগুলোতে রিফর্ম ইউকে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে। এদিকে গ্রিন পার্টি লন্ডনের ওয়ালথাম ফরেস্ট, লুইশাম এবং হ্যাকনির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যেখানে আগে লেবারের প্রভাব ছিল প্রবল। এছাড়া দলটি প্রথমবারের মতো হ্যাকনি ও লুইশামে মেয়র পদেও জয় পেয়েছে। ওয়েলসে সেনেড (ওয়েলস পার্লামেন্ট) নির্বাচনে লেবার ঐতিহাসিক পরাজয়ের মুখে পড়ে। তারা প্লেইড কামরি ও রিফর্ম ইউকের পেছনে তৃতীয় স্থানে শেষ করে। স্কটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনেও দলটি বড় ধাক্কা খায়। সেখানে এসএনপি টানা পঞ্চমবারের মতো জয় পায় এবং লেবার দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও রিফর্মের সঙ্গে সমান অবস্থানে থাকে। স্যার কিয়েরের বিকল্প হিসেবে কাকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেন- এ বিষয়ে ওয়েস্ট কোনো নাম বলেননি। তিনি বলেন, আমার কোনো প্রার্থী নেই। এটাই সমস্যার অংশ। তিনি আরও বলেন, তবে আমি মনে করি কয়েকজন আছেন যারা এটি করতে চান এবং মাসের পর মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি যে আজ পর্যন্ত কেউ সামনে এসে বলেননি- আমি এটি করব। ক্যাথরিন ওয়েস্ট বলেন, লেবার পার্টিকে পুনর্গঠন এবং পররাষ্ট্রনীতিতে স্যার কিয়ের চমৎকার কাজ করেছেন।

তবে তার মতে, অভ্যন্তরীণ ইস্যুগুলোতে স্টারমারের নিয়ন্ত্রণ কম এবং দলটির উচিত রিফর্মের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামা। ক্যাথরিন ওয়েস্টের এই মন্তব্য অনেক লেবার এমপিকেই বিস্মিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সমালোচক এক মন্ত্রী বিবিসিকে বলেন, সে পাগল হয়ে গেছে। স্যার কিয়েরের এক প্রভাবশালী ব্যাকবেঞ্চ সমালোচক এটিকে পুরোপুরি দায়িত্বজ্ঞানহীন একক অভিযান বলে মন্তব্য করেন। অভিবাসনমন্ত্রী মাইক ট্যাপও ক্যাথরিন ওয়েস্টের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যখন আপনার নিজের ঘরের মানুষই দরজা খুলে দিতে শুরু করে, তখন শত্রুর আর ব্যাটারিং র‌্যামের প্রয়োজন হয় না। তিনি আরও বলেন, রিফর্ম এটা দেখে আনন্দ করছে। ক্যাথরিন ওয়েস্টের এই আচরণ ভয়াবহ, তার আরও ভালো বোঝা উচিত ছিল।

তবে স্যার কিয়েরের ঘনিষ্ঠ সমালোচক নন- এমন এক লেবার এমপি বিবিসিকে বলেন, সোমবার তিনি ক্যাথরিন ওয়েস্টকে সমর্থন দেবেন। তিনি বলেন, আমি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী যে তিনি ৮১ জন সমর্থক জোগাড় করতে পারবেন। তার ভাষায়, ব্যাকবেঞ্চে ক্ষোভ অনেক বেশি বিস্তৃত, শুধু যারা প্রকাশ্যে কথা বলছেন তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও অনেক মধ্যপন্থি ও কেন্দ্রপন্থি লেবার এমপিও মনে করেন, তার সময় শেষ। তবে ডাউনিং স্ট্রিটের সূত্রগুলো মনে করছে না যে ক্যাথরিন ওয়েস্ট সেই সীমা অতিক্রম করতে পারবেন। সরকারের কিছু সদস্য মনে করছেন, ক্যাবিনেটের সেরা বক্তাকে সামনে আনার আহ্বানের মাধ্যমে ক্যাথরিন ওয়েস্ট পরোক্ষভাবে ওয়েস স্ট্রিটিংকে সমর্থন করছেন। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠরা তা অস্বীকার করেছেন।

শুক্রবার স্ট্রিটিং বলেন, স্যার কিয়ের তার সমর্থন পাচ্ছেন, তবে সরকার হিসেবে আমাদের ভুলের দায়ও নিতে হবে। বিবিসি জানতে চাইলে তিনি নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেন, স্যার কিয়ের ২০১৯ সালের ভয়াবহ পরাজয়ের পর এমন একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছেন, যা মানুষ একেবারেই অসম্ভব মনে করেছিল। ক্যাবিনেটের বাইরে সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রার্থী হিসেবে সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যানজেলা রেইনারের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে ফ্ল্যাট কেনার সময় পর্যাপ্ত কর না দেয়ার অভিযোগে তিনি গত সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি এখনও এইচএমআরসির তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন এবং তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত নেতৃত্বের লড়াইয়ে নামতে চাইবেন না। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের প্রতিও অনেক এমপির সমর্থন রয়েছে। তবে নেতৃত্বপ্রার্থী হতে হলে তাকে সংসদ সদস্য হতে হবে।

এ বছরের শুরুতে গর্টন অ্যান্ড ডেন্টন উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি। ফলে এমপি হতে হলে তাকে নতুন আসন খুঁজতে হবে এবং লেবারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির অনুমোদনও পেতে হবে। বার্নহামের সমর্থকরা আশা করেছিলেন, সাময়িকভাবে স্টারমারকে টিকিয়ে রেখে তাকে বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করতে রাজি করানো যাবে। এতে বার্নহাম সংসদে ফেরার সময় পেতেন। তারা ওয়েস্টকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, যেন তিনি এখনই নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়েস্ট মনে করছেন, বার্নহামের ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরতে খুব বেশি সময় লাগবে।

তাই তিনি নিজের পরিকল্পনা চালিয়ে যাবেন। নিজের অবস্থান শক্ত করতে শনিবার স্যার কিয়ের সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন এবং সাবেক উপনেতা হ্যারিয়েট হারম্যানকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেবেন। তবে লেবারের বেশ কয়েকজন এমপি এই নিয়োগে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সাধারণত অনুগত হিসেবে পরিচিত এক মন্ত্রী বলেন, এটা একটা কৌতুক। এই দু’জনকে ফিরিয়ে আনা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।

লিভারপুল ওয়েভারট্রির লেবার এমপি পাউলা বার্কার বলেন, গর্ডন ও হ্যারিয়েট- দু’জনের প্রতিই আমার প্রচুর শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু তারা যদি এই তথাকথিত নামমাত্র চাকরি গ্রহণ না করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতেন যে এখন পরিবর্তনের সময় এসেছে এবং তাকে বিদায়ের সময়সূচি ঘোষণা করা উচিত, তাহলে আমি আরও বেশি শ্রদ্ধা করতাম।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন