নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে নেতাদের সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যুদ্ধ একটি শেষ হয়েছে, এখন আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কী সেই যুদ্ধ? সেই যুদ্ধটি হচ্ছে আমরা মানুষের কাছে যে কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম, সে কমিটমেন্টগুলোর বাস্তবায়ন করা। শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপিসহ তিনটি অঙ্গসংগঠনের জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সকাল পৌনে ১১টায় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগের দিন পর্যন্ত এই ম্যানিফেস্টোটি ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ম্যানিফেস্টো। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এবং ফলাফল প্রকাশের পর আমরা বিশেষ করে, সরকার গঠন করার পর এই ম্যানিফেস্টোটি আমাদের সরকারের তথা বাংলাদেশের জনগণের ম্যানিফেস্টোতে পরিণত হয়েছে। কারণ ৫২ শতাংশ মানুষ যারা ভোট দিয়েছেন, তারা এই ম্যানিফেস্টোর পক্ষে রায় দিয়েছেন। কাজেই প্রিয় নেতৃবৃন্দ এই ম্যানিফেস্টোতে আমরা যা যা বলেছি, আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে এই ম্যানিফেস্টোর বাস্তবায়ন করার জন্য।
তিনি বলেন, নির্বাচনে আমরা মানুষকে বলেছিলাম যে, আমরা সুশাসন দেবো। মানুষকে আমরা বলেছিলাম যে, আমরা একটি দেশ তৈরি করতে চাই; যে দেশে শিক্ষার্থীরা একটি সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ পাবে। আমরা মানুষকে বলেছিলাম, আমরা একটি দেশ তৈরি করতে চাই; যেখানে নারী-পুরুষ-শিশু সকলে নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারবে। তারেক রহমান বলেন, আমরা চাই দেশে এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি হোক, যেখানে আমরা ডিবেট করবো, কথা বলবো। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি আমরা তৈরি হতে দেবো না- এ রকম অনেকগুলো কথা আমরা বলেছিলাম। যুদ্ধ একটি শেষ হয়েছে, এখন আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কী সেই যুদ্ধ? সেই যুদ্ধটি হচ্ছে আমরা মানুষের কাছে যে কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম, সে কমিটমেন্টগুলোর বাস্তবায়ন করা।
তিনি আরও বলেন, আপনারা প্রত্যেকে খেয়াল করে দেখবেন, ১২ই ফেব্রুয়ারি (ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন) যে নির্বাচন হয়েছে, সেই নির্বাচনে আপনারা মাঠে ছিলেন। আমি বলেছিলাম, যে নির্বাচনটি হবে সেটি কঠিন হবে। আপনারা প্রত্যেকেই পরে সেটা অনুভব করেছিলেন। মানুষ আমাদের দলের পক্ষে, আমাদের ম্যানিফেস্টোরার পক্ষে আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছে।
বিএনপি’র চেয়ারম্যান বলেন, যে সরকারটি গঠন হয়েছে, আমরা কী বলি? আমরা বলি বর্তমান সরকার বিএনপি সরকার। অর্থাৎ সরকার ঠিকই আছে। কিন্তু বিএনপি সরকার। সেজন্য বিএনপি যদি সহযোগিতা না করে অনেক ক্ষেত্রেই সরকার সফল হতে পারবে না। বিএনপি’র সফলতা তখনই নির্ভর করছে যখন আপনারা এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ এবং আপনারা যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা সরকারের পেছনে এসে না দাঁড়ান। এর বাইরে হলেই আমরা সরকারকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারবো না। সেজন্যই উপস্থিত সকল নেতৃবৃন্দকে আপনাদের সহযোগিতা করতে হবে।
সভায় নেতাদের উদ্দেশ্যে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আপনারা বড় রকমের যুদ্ধ শেষ করে এসেছেন। সেই যুদ্ধটি হচ্ছে মানুষ এবং দেশকে রক্ষা করার এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার। সেই যুদ্ধে আপনারা জয়ী হয়েছেন। সংসদে আপনারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন, আমরা সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছি আমাদের নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে।
তিনি বলেন, আজকে আমাদের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা একটা ধবংসস্তূপের মধ্য থেকে সরকারে এসেছি। যে দিকে তাকাবেন সেদিকে শুনবেন নাই নাই নাই। আসলে অবস্থাটা তাই। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা, টেনে তোলা- দলকে শুধু নয় সরকারকে এবং রাষ্ট্রকে- এটাই আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ।
মির্জা ফখরুল বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাই হচ্ছে আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, আমাদের নেতা তারেক রহমান যিনি নির্বাসনে থেকেও আমাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশে সফল একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন এবং একইসঙ্গে সফল নির্বাচন জয়লাভের মধ্যে সরকারে এসেছেন। আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে যে, আমরা তার এই নেতৃত্ব, দলের নেতাকর্মীদের যে আত্মত্যাগ- এ সবগুলোকে স্মরণ করে আমরা যেন দলকে আরও সুসংগঠিত করি। তৃণমূল পর্যায়ে সকল মানুষের কাছে আমাদের দলের যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো পৌঁছে দেই এবং একটা যোগসূত্র রক্ষা করি।
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে সভায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বেগম সেলিমা রহমান ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলের মাঠপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বিএনপি’র চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটি প্রথম মতবিনিময় সভা।
দলের নেতাদের যে বার্তা দিলেন তারেক রহমান
খুব শিগগিরই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে বছরে তিনবার বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব মতবিনিময়ে নিজেদের ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা হবে। সেই আলোকে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করবে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। ওদিকে সরকারের আড়াই মাসের অগ্রগতির বিষয়েও সভায় সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়।
শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপিসহ তিনটি অঙ্গসংগঠনের জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এসব কথা বলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সকাল পৌনে ১১টায় বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভা হয়। রাত ৮টার দিকে শেষ হয়।
সূত্রে জানা গেছে, রমজান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে দেশের পরিবেশ খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। এই পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সেভাবে মনোনিবেশ করা সম্ভব হয়নি। তবে খুব শিগগিরই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে অগ্রসর হবে বিএনপি। এজন্য নেতাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আহ্বান জানিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
সূত্রে আরও জানা গেছে, সভায় সরকারের এই আড়াই মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুতের রিজার্ভ, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতির কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা নেতাদের জানান। এককথায় আড়াই মাসের মন্ত্রীরা নিজেদের কাজের জবাবদিহিতা করেন দলের নেতাদের কাছে। এ সময় প্রশ্নোত্তর পর্বে নেতারা যার যার এলাকার সমস্যার কথা তুলেন ধরেন। কী করলে এলাকায় উন্নয়ন হবে। কী কী করলে জনগণ, এলাকা এবং দলের জন্য খারাপ- তাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন নেতারা।
জানা গেছে, সভায় মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো এবং কাজের বিষয়ে নেতাদের অবহিত করেন। মন্ত্রীদেরকে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক এবং ছাত্রদলের ৬ জন নেতা প্রশ্ন করেন। এরমধ্যে নেতারা নিজ এলাকার অবস্থা তুলে ধরে তা উন্নয়নের জন্য পরামর্শ দেন। পাশাপাশি নেতারা বর্তমান শিক্ষার মান নিয়েও হতাশা প্রকাশ করে তা পরিবর্তন করে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পরামর্শ দেন।
সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী যে, আমাদের নেতা তারেক রহমান নির্বাসনে থেকেও আমাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশে সফল একটা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। একইসঙ্গে সফল, নির্বাচনে জয়লাভের মধ্যে সরকারে এসেছেন। আমরা তার এই নেতৃত্ব, দলের নেতাকর্মীদের যে আত্মত্যাগ- এ সবগুলোকে স্মরণ করে আমরা দলকে আরও সুসংগঠিত করি। তৃণমূল পর্যায়ে সকল মানুষের কাছে আমাদের দলের যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলো পৌঁছে দিই এবং একটা যোগসূত্র রক্ষা করি।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণের বানানো ‘স্মার্ট কারে’ চড়লেন প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন তরুণ ওয়াকিমুল ইসলামের বানানো ‘স্মার্ট কারে’ চড়ে তাকে উৎসাহ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ওয়াকিমুল ইসলাম। এ সময় তার বানানো ছোট এই বাহনটি দেখেন প্রধানমন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে স্মার্ট কারটি চালিয়ে দেখান ওয়াকিমুল ইসলাম। ব্যাটারিচালিত বিশেষ এই যানের নাম দেয়া হয়েছে ‘এ টু আই স্মার্ট কার’। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বাহন তৈরি করায় ১৭ বছরের তরুণের প্রশংসা করেন। একইসঙ্গে তিনি কম খরচে আরও আধুনিক ও সহজে ব্যবহারযোগ্য স্মার্ট কার তৈরির পরামর্শও দেন। এই ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগে সরকারের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীকে স্মার্ট কার তৈরির গল্প শুনিয়েছেন ওয়াকিমুল ইসলাম। এই তরুণ জানান, ‘একসময় তিনি সারাদিন বাসায় বসে থাকতেন, বাইরে বের হতে পারতেন না। কীভাবে বাইরে একা চলাফেরা করা যায়, সেই চিন্তা থেকে তিনি কারটি বানানো শুরু করেন।’
ওয়াকিমুল ইসলাম যশোরের চৌগাছা সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়েন। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থীর পিতা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ওয়াকিমুল ইসলাম আরও জানান, সহযোগিতা পেলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও উন্নতমানের স্মার্ট কার বানানো সম্ভব। এটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিরাও ব্যবহার করতে পারবেন।
ওয়াকিমুল ইসলামের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির (বিপিকেস) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আবদুস সাত্তার দুলাল। তিনি জানান, গাড়িটি বৈদ্যুতিক চার্জে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতি ৪৫ কিলোমিটার।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
