বেপরোয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা, উত্তপ্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড

বেপরোয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা, উত্তপ্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড

ফন্ট সাইজ:

ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার, এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, খুন-খারাবিতে মেতে উঠেছে তারা। এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর অনুসারীদের হাতে নিহত হচ্ছেন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। প্রকাশ্য গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। একেকটি খুনের ঘটনায় আড়ালে-আবডালে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কলকাঠি নাড়ার তথ্য বের হয়ে আসছে। তবে তথ্য প্রমাণ না থাকায় তারা সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর অপরাধ করে বারবার পার পাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন তারা। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়া সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপও নিতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে পড়া আন্ডারওয়ার্ল্ড ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর চাঙ্গা হয়। ওই সময় দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা খুব সহজে জামিন পেয়ে যায়। জামিনে বের হয়েই তারা পুরনো স্টাইলে জীবনযাপন শুরু করে। ফের তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করে। জেলে থেকেও তারা তাদের অনুসারী সৃষ্টি করে নানা অপকর্ম করছে। বের হওয়ার পর সেটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। আগের মতোই তারা তাদের এলাকার দখল ও অবৈধ কার্যক্রম করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। একসঙ্গে একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পাওয়াতে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ৬১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চে ২৪টি। এপ্রিলের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ২৮শে এপ্রিল। ঢাকার নিউমার্কেটের পশ্চিম পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে বটতলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঢাকার অপরাধজগতের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ধারণা করছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন ঢাকার ‘সিটি অব গড’ খ্যাত মোহাম্মদপুর অঞ্চলের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল ও সানজিদুল ইসলাম ইমন। নিহত টিটন সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক। ২০০১ সালে সরকারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে ছিল তার নাম। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ১৩ই আগস্ট জামিনে মুক্তি পায় সে। টিটনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত জড়িত দুই শুটারসহ কাউকেই শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া সন্ত্রাসীরা কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের অনুসারী কি না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টিটনকে গুলি করেছেন একজন এবং আরেকজন সহযোগী ছিলেন। তারা একটি মোটরসাইকেল করে ঘটনাস্থলে এসেছিলেন। দু’জনের মুখেই মাস্ক ছিল। যিনি গুলি করেছেন তার মাথায় ক্যাপ ছিল এবং পরনে সাদা শার্ট ছিল। পূর্বপরিকল্পিতভাবে টিটনকে নিউমার্কেট এলাকায় ডেকে আনা হয় এবং তার ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তি তাকে সেখানে যেতে প্ররোচিত করে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কিলার আব্বাস ও তাজ বর্তমানে মিরপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণ করছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমাম মহাখালী, বনানী-গুলশান এলাকায়। সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, হাজারীবাগ, লালবাগের কিছু অংশ, নিউমার্কেট, এলিফেন্ট রোড নিয়ন্ত্রণ করছে, তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী পিচ্চি হেলাল। এ ছাড়া মালিবাগ-মৌচাক এলাকার দায়িত্বে রয়েছে রাসু। ফোর স্টার গ্রুপের মামুনের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা, ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১৩, ১৪, ভাষানটেক ও কালশী, শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণে মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭, সর্বশেষ মুক্তারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর ১০ ও ১১। সূত্র মতে, তালিকাভুক্ত পলাতক অপরাধী রবিন রাজধানীর বাড্ডায় চাঁদাবাজদের একটি চক্র নিয়ন্ত্রণ করে।

সম্প্রতি কাওরান বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোছাব্বির হত্যাকাণ্ডে নাম আসে বিদেশে পলাতক দীলিপ ওরফে দাদা দীলিপের। এর আগে তার নাম শোনা না গেলেও বিদেশে পলাতক অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের হয়ে তিনি কাওরান বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। কারাগারে বসেই মগবাজারের কিছু এলাকা এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে সুব্রত বাইন, তার মেয়ে খাদিজা ও সুব্রত বাইনের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোল্লা মাসুদ। তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের ক্যাডাররা। যদিও মালিবাগ, রামপুরা, খিলগাঁও, পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জিসানের। নতুন করে মগবাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন সুব্রত বাইন ও জিসান। এ নিয়ে মগবাজারের মধুবাগে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। সেই মামলায় বাইনের মেয়ে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে।

শুধু টিটন নয়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্তি পায়। জামিন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা হলোÑ ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন, মিরপুরের আব্বাস আলী, তেজগাঁওয়ের শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, হাজারীবাগের খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন (নিহত), খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু ও তারিক সাঈদ মামুন (নিহত)। ফ্রিডম রাসু পরে আবার গ্রেপ্তার হয়। অবশ্য বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মগবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী ত্রিমাতি সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কারামুক্তির পর এসব সন্ত্রাসী নিজেদের প্রভাব বিস্তার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পিচ্চি হেলাল ও ইমনের মধ্যে বিরোধ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। ইমন বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে, তবে সেখান থেকেই তিনি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ১০ই নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফটকের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে। এর আগে, ২০২৪ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে সাদিক খান আড়তের সামনে নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নাম আসে পিচ্চি হেলালের। এরপর ২০২৫ সালের ১০ই জানুয়ারি রাতে নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টার বিপণিবিতানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কোপানোর ঘটনায় নাম আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের।

গোয়েন্দাসূত্রে জানা গেছে, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর টিটন বুঝতে পারে তার জীবন ঝুঁকিতে আছে। সে দেশ ছেড়ে পালানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর কারাগারে থাকায় তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ছিল না। এনআইডি কার্ড করতে না পারায় পাসপোর্ট তৈরি করতে পারেনি। ফলে দেশত্যাগে ব্যর্থ হয় সে। এরপরই নিউমার্কেট ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ‘লাপাত্তা’ হয়ে থাকতো। ওই সূত্র বলছে, টিটনের আপন ভাই টুটুলকে ‘ক্রসফায়ারে’ দেয়ার নেপথ্যের মূল কারিগর ছিল ইমন। ভাইয়ের এই করুণ মৃত্যুর জেরে টিটন ও ইমনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়েও টিটনের সঙ্গে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলালের বিরোধ তৈরি হয়। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এই দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর যেকোনো একটি পক্ষই পূর্বশত্রুতার জেরে টিটনকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। পুলিশের তথ্যমতে, টিটন হত্যায় নাম আসা ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ নব্বইয়ের দশকে একই অপরাধী দলে যুক্ত ছিল। এই অপরাধী দলের নিয়ন্ত্রক ছিল সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ছোট ভাই জোসেফ। টিটনও এই বাহিনীর সদস্য ছিল।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে ইমন ও পিচ্চি হেলাল আলাদা সন্ত্রাসী দল গঠন করেন। ১৯৯৭ সালে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয় জোসেফ। তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমা পেয়ে মুক্তি পায়। সে কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৯৯ সালের ১৩ই মার্চ ইমন বাহিনীর হাতে খুন হয় জোসেফের ভাই আবু সাঈদ টিপু ও তার বন্ধু এমরান। ইমন ও টিটন এ হত্যা মামলার আসামি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে পুলিশ। ওই তালিকায় ছিলেন- মোহাম্মদপুরের ইমন, টিটন, পিচ্চি হেলাল ও হারিস আহমেদ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী তেমন নেই, যারা আছে তারা আগের শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী বা ওরকম সাজতে চাইছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না বা পুলিশের তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, সব সময় আমাদের তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে। আমাদের মনিটরিং, অবজারভেশনসহ সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং হালনাগাদ করা হচ্ছে। যারা তাদের (শীর্ষ সন্ত্রাসীদের) নাম ভাঙাচ্ছে অথবা যারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, আমরা আগেই তাদেরকে দমন করবো।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন