রবীন্দ্র-নজরুল আত্মার অনুসন্ধান

রবীন্দ্র-নজরুল আত্মার অনুসন্ধান

ফন্ট সাইজ:

রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল-এর জন্মদিন প্রায় কাছাকাছি সময়ে। ২৫শে বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ, ১১ই জ্যৈষ্ঠ নজরুল-এর জন্মদিন। দু’জনের জন্মদিন এলেই আমরা উৎসবের জন্য তোড়জোড় শুরু করি। কারণ আমরা মিডিয়া কর্মীরা নিত্যনতুন অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং লেখালেখি দিয়ে দিন দু’টিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাই।

যেমন চ্যানেল আইতে আমরা রবীন্দ্র এবং নজরুল নিয়ে প্রায় বিশ বছর ধরে দিনব্যাপী রবীন্দ্রমেলা এবং নজরুলমেলা করে থাকি। এটি অবশ্যই অন্যরকমের বিষয়, অভিনব প্ল্যানিং। বিষয়টি বেশ আলোচিত। বরং এখন সরকারি- বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্র-নজরুলের জন্মদিন নিয়ে অনুষ্ঠান করে থাকি। বিভিন্ন প্রকাশনী সংস্থাও নতুন নতুন গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করে। এই গ্রন্থগুলো আমাদের একেকটি সম্পদ। এ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের গান, নাটক, নজরুলের গান টেলিভিশন-রেডিওতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

ওদিকে রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার জন্য কিছু সংগঠনও তৈরি হয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথের গান করে সুরের ধারা, নজরুলের গান করে সুর সপ্তক। নতুন শিল্পীরা এসব সংগঠনের সঙ্গে থেকে সংগীত চর্চা করে যাচ্ছে। এসব সংগঠনের শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে প্রতি বছর অনেক নতুন শিল্পীর আগমন ঘটে। তবে আমার একটু কথা আছে। রবীন্দ্রনাথ একজন বিশ্ব বিখ্যাত কবি। তাকে এখন আমরা চিনি শুধু কয়েকটি গানের মাধ্যমে। তাও সেই কয়েকটি চিরচেনা গান দিয়ে। ঘুরে ফিরে এগুলোই শিল্পীরা গায় আমরা সেগুলোই শুনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে বিশ্বকবি, এত কবিতা লিখেছেন সেটা আমরা ভুলে যাই।

রবীন্দ্রনাথের ভালো কবিতা বিশেষ দিন ছাড়া কেউ পাঠ করে না। নজরুলের দু’চারটে কবিতা আবৃত্তি হলেও অসংখ্য কবিতা অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। আমি মনে করি রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের মূল পরিচয় হচ্ছে কবিখ্যাতি। কবিতাই যদি না পড়লাম, কবি হিসেবেই যদি না চিনলাম তাহলে অর্থ কী? এই যে এবার রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন কিংবা নজরুলের জন্মদিন আসছে আমরা যেন প্রত্যেকে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ি। ছোটগল্প পড়বো, নাটক পড়বো। উপন্যাস পড়বো। গান শুনবো। একই কথা নজরুলের বেলাতেও।
দুই

রবীন্দ্রনাথ আরও বেশি বহুমাত্রিক প্রতিভা। চিত্রকলাতেও রবীন্দ্রনাথের বিশ্বজোড়া খ্যাতি। তার ছবি বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তার এইসব ছবি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে। আমরা ছবির রবীন্দ্রনাথকে আলাদা করে চিনতে পারি। পেইন্টিংয়ে ঠাকুরবাড়ির সুনাম রয়েছে। আশা করি রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলাগুলো অনেক বেশি জনসম্পৃক্ত হবে। অনেক বেশি আমাদের চেতনার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে। বুদ্ধদেব বসুর একটি সমালোচনামূলক লেখায় পড়েছিলাম-রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন, বিশ্বসেরা ছোটগল্প লেখক।

এডগার এলান পো, ও হেনরি কিংবা অ্যানথন জ্যাকব প্রমুখ যে ধরনের গল্প লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের গল্প সেই ধরনের। কিন্তু বাংলা ভাষায় তার সেই গৌরব কে বহন করে? এসব নিয়ে প্রতি বছরই আমরা যখন রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবস পালন করি তখন এসব আলোচনা উঠে আসে। আমি কান পেতে অনুভব করি রবীন্দ্র-নজরুল আমাদের জাতীয় গৌরব হলে আমরা প্রকৃত অর্থে তাদের চিনে উঠতে পারিনি।

এবারো সাড়ম্বরে রাষ্ট্রীয়ভাবে কবিদ্বয়ের জন্মজয়ন্তী পালিত হবে। আরও অনেক বেশি বহুমাত্রিকতায় রবীন্দ্রনাথ-নজরুল আমাদের সামনে উপস্থিত হবেন সেই প্রত্যাশাই করি। দেশে- বিদেশে রবীন্দ্রনাথের নামে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। আমাদের বর্তমান প্রজন্মও রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা করছে জেনে আনন্দিত হই। রবীন্দ্র-নজরুল দু’জনের চেতনায় ছিল দেশ। দেশকে তারা প্রচণ্ড ভালোবাসতেন।

নজরুল তো কবিতা লিখে জেলও খেটেছেন। গান কবিতা গল্প উপন্যাস সবই দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতর রবীন্দ্র-নজরুলের চেতনা প্রবাহিত করতে হবে। দেশপ্রেম আসলে একটি বহমান প্রক্রিয়া। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা বহন করে চলে। আমরা দেখেছি, সেই বৃটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধ সেটাই প্রমাণ করে।

দেশের নানা সংকটে তরুণরাই এগিয়ে আসে। নেতৃত্ব দেয়। আমরা যে বাংলাদেশকে ভাবি হয়তো তরুণরা আরও বেশি করে ভাবে। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চা যত বেশি হবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ততই সমৃদ্ধ হবে। আমরাও সমৃদ্ধ হবো। সবার অন্তরে দেশপ্রেম প্রথিত থাকুক। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে তরুণ প্রজন্মকে কাজ করতে হবে। তরুণরাই পারে আমাদের এই বাংলাদেশকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী করে সাজাতে। দেশপ্রেমই হোক আমাদের প্রথম ও শেষ অঙ্গীকার।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন