এবারো বামের ভোট রামে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির নেপথ্যে

এবারো বামের ভোট রামে

ফন্ট সাইজ:

অপ্রত্যাশিতভাবে দু’শর বেশি আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসতে চলেছে বিজেপি। কিন্তু কোন ম্যাজিকে এই গেরুয়া ঝড়? ভোট গণনার আগের সন্ধ্যায় এক ঘরোয়া আড্ডায় ভোটের ফলাফল নিয়ে জোর আলোচনা চলছিল। তবে সকলেই নির্ভয়ে মতামত জানাচ্ছিলেন, তারা কাকে ভোট দিয়েছেন। সেই আলোচনাতেই জানা গেল, বাম মনোভাবাপন্ন মানুষ ভোট নষ্ট করতে চান নি। তারা নির্দ্বিধায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। সেই সত্যটি গণনার দিন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কথায় স্পষ্ট হয়েছে। তিনি ভবানীপুরে জয় সম্পর্কে বলেছেন, এই কেন্দ্রে বামপন্থিদের প্রায় ১৩ হাজার ভোট ছিল। তার মধ্যে তিন হাজার বাদে সবটাই তার দিকে পড়েছে। আর তাই হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, মাড়োয়ারি ভোটের পাশাপাশি বামদের ভোটও তার বিপুল জয় নিশ্চিত করেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বিজেপি’র জয়ের পেছনের কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এবারো বাম ভোট রামের দিকে যাওয়ার বিষয়টি উপেক্ষা করেছেন। অথচ নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই বামফ্রন্টের বর্ষীয়ান নেতা বিমান বসু তৃণমূল কংগ্রেসকে হারাতে বিজেপিকে ভোট দেয়ার মোহ থেকে বেরিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে বামদের উল্লেখযোগ্য বিজয় সম্ভব নয় বুঝেই বামমনস্ক ভোটাররা আগের বারের মতোই রামের দিকেই মুখ ঘুরিয়েছেন। নির্বাচনী সংখ্যাতত্ত্ব থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। বামরা এবারের নির্বাচনে শতাংশের হিসেবে ভোট পেয়েছে ৫ শতাংশ। এর মধ্যে সিপিআইএম পেয়েছে ৪.৪৫ শতাংশ, সিপিআই ০.১৬ শতাংশ, সিপিআইএমএল ০.০৭ শতাংশ এবং ফরোয়ার্ড ব্লক পেয়েছে ০.২৮ শতাংশ ভোট। তাহলে বামমনস্ক ভোটের গন্তব্য কোথায়? অবধারিতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের ঔদ্ধত্যের শাসনের বিপরীতে বিজেপি’র দিকেই সেই ভোট গিয়েছে। ফলে হিন্দু ভোটের এক জোট হওয়ার সমীকরণের পাশে বাম ভোটও বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে বলে অনেক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মনে করেন।

এবারের নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট যে, গোটা উত্তরবঙ্গ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। বিজেপি তাদের শক্ত ঘাঁটিকে আরও পোক্ত করেছে। দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গেও বিজেপি একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গ্রাম এবং পূর্ব মেদিনীপুরের সব আসনে বিজেপি জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যের ২৩টি জেলার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস প্রভাবিত নয়টি জেলা থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে।

নিঃসন্দেহে সরকার বিরোধিতা বা যাকে বলা হয় প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ক্ষোভ এবার অনেকটাই তীব্র ছিল। দলীয় নেতা ও কর্মীদের ঔদ্ধত্য, কাটমানির রমরমা, সর্বস্তরে দুর্নীতি, সরকারি কর্মীদের ডিএ না দেয়ার মতো ঔদ্ধত্য, চাকরি বিক্রির মতো বিষয়গুলোকে এবার ভোটাররা দু’হাতে ঠেলে দিতে বিজেপি’র শরণাপন্ন হয়েছে। এমনকি যে নারী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী সাফল্যের মেরুদণ্ড হয়েছিল তারাও এবার বিজেপি’র প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করেছে। গত এক দশক ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভোটব্যাংককে নজরে রেখে নারীদের জন্য একাধিক কল্যাণ প্রকল্প চালু করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান কর্মসূচি এবং নারীদের সহায়তার জন্য কন্যাশ্রী প্রকল্প। কিন্তু এবারের নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় নারীকেন্দ্রিক প্রণোদনা এবং কল্যাণ প্রকল্পগুলোকে কেন্দ্র করে জোরদার প্রচার চালিয়েছে। আরজি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটিও এই নির্বাচনে একটি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে। ইস্যু হয়ে ওঠ নারী নিরাপত্তার বিষয়টিও। বিজেপি নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্রমাগত আক্রমণ করেছে। বিজেপি পানিহাটি আসন থেকে আরজি কর হাসপাতালের নির্যাতিতার মা’কেও টিকিট দিয়েছে। এসবের পাল্টা কোনো বক্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারে ভাষা পায়নি। এসবই নির্বাচনে সুফল তুলতে বিজেপিকে সহায়তা করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

তাছাড়া অনুপ্রবেশ ইস্যু ও রোহিঙ্গাদের বিষয়টি নিয়ে বিজেপি যেভাবে প্রচার করেছিল তা ভোটারদের অনেকটাই প্রভাবিত করেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিস ভোট প্রবল হারে পড়লেও তা নানা ভাগে বিভক্ত হয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে কাটাও গিয়েছে কয়েক লাখ মুসলিম ভোট। ফলে ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম ভোটের যে সমর্থন মমতা এতদিন পেয়েছেন তা এবার সম্ভব হয় নি। হুমায়ুন কবীরের আমজনতা উন্নয়ন পার্টি, নওশাদ সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ার সেক্যুলার ফ্রন্ট মুসলিম ভোটের একটা অংশ নিজেদের দিকে টেনেছে। মমতার প্রকাশ্যে মুসলিম তোষণ নীতিও মুসলিমদের একাংশকে অসম্মানিত করেছে। তবুও মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও দুই দিনাজপুরের বেশ কিছু আসনে তৃণমূল কংগ্রেস মুসলিমদের সমর্থন পেয়েছে ভালো ভাবেই।

নির্বাচনে রেকর্ড ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়াকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী আশার লক্ষণ বলে মনে করলেও এখন স্পষ্ট হয়েছে এসআইআর ভীতিতে ভোটের রেকর্ড হলেও তা মমতার দিকে যায় নি। মমতার বাঙালি অস্মিতার অজুহাত এবং এসআইআরের হয়রানি যে মমতার দলের সব কুকীর্তি ঢাকার কৌশল ছিল সেটা সকলেই বুঝে গিয়েছিলেন। ফলে হিন্দু ভোটের সমর্থনের বড় অংশই বিজেপি’র দিকে গিয়েছে। বিজেপি’র মেরূকরণের রাজনীতি সেখানে বেশ সফল হয়েছে।

Prabir Ghosh

২ মাস আগে

খুব ভালো লাগলো আপনার পর্যালোচনা 👍👍

Unnamed

২ মাস আগে

বাম কিভাবে ডানে যায়? আসলে ওরা আদর্শহীন।

মন্তব্য করুন