ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মমতা ব্যানার্জি নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে ভূমিধস জয় পেয়েছে বিজেপি তথা ভারতীয় জনতা পার্টি। একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দুই বাংলার এই রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক যে পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল, নতুন সরকার গঠনের পর তা পুনরুদ্ধারে সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। ঠিক এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা বহন করছে- এ নিয়ে এখন নতুন আলোচনা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন শঙ্কার তেমনি সম্ভাবনাও আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন সরাসরি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কারণ, বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি, কলকাতা নয়। তবে তার মতে, উদ্বেগের জায়গা রয়েছে সীমান্ত রাজনীতিতে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একটি বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে আসছে। এই বয়ান যদি নতুন সরকার আরও জোরালোভাবে সামনে আনে, তাহলে তা সীমান্ত পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হলে তার প্রতিক্রিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া বিজেপি’র পরিচিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ও মুসলিম-বিদ্বেষী রাজনৈতিক অবস্থানও বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ ধর্মীয় মেরূকরণভিত্তিক রাজনীতি প্রায়ই সীমান্তের দুই পাশের জনমত ও কূটনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে।
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক এই পালাবদল ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে তেমন পরিবর্তন আনবে না বলে মনে করছেন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য মাত্র, তাই বাংলাদেশের জন্য মূল বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে নয়। পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এ রাজ্যের রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিক। চিকিৎসা, বিনোদন ও অন্যান্য প্রয়োজনে বাংলাদেশিদের পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াতও দীর্ঘদিনের। তবে কূটনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে দিল্লি। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে নেমে গিয়েছিল। এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে ভারত তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগও নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে দেখা যাচ্ছে।
তার ভাষায়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভারত এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব পুনরুদ্ধারে কাজ করছে। সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে তারা। একইসঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি’র উত্থান নিয়ে আব্বাসী বলেন, শুধু শুভেন্দু অধিকারী নন, অতীতে মমতা ব্যানার্জিও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মণিপুরসহ বিভিন্ন রাজ্যেও নির্বাচনী রাজনীতিতে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দেখা যায়।
একইভাবে বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যের চর্চা রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, এসব রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত বিনিয়োগের মতো বাস্তব সম্পর্ক রয়েছে। ফলে পারস্পরিক স্বার্থের জায়গা থেকেই দুই দেশ একে অপরের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
সীমান্তে সম্ভাব্য ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক লোক ঠেলে পাঠানোর ঘটনা বাড়তে পারে কিনা- এমন প্রশ্নে আব্বাসী বলেন, বিজেপি’র একটি কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কাঠামো রয়েছে এবং দিল্লির নীতির বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়িত হতে পারে। তবে ভারতকেও বুঝতে হবে, অতিরিক্ত বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, কলকাতার অর্থনীতিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ফলে ছোট রাজনৈতিক লাভের জন্য বড় ক্ষতির ঝুঁকি ভারত নিতে চাইবে না বলেই ধারণা করা যায়।
তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আব্বাসী বলেন, তিস্তা পানি বণ্টন বিষয়ক চুক্তির পথে এতদিন প্রধান বাধা ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় না থাকায় কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে বিরোধী রাজনীতিতে থেকেও তিনি পশ্চিমবঙ্গের কৃষকদের নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। ফলে তিস্তা চুক্তির জটিলতা পুরোপুরি কাটবে কিনা তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
