বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ সামান্য, ক্ষতিই বেশি

সহযোগীদের খবর

বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ সামান্য, ক্ষতিই বেশি

ফন্ট সাইজ:

প্রথম আলো

‘বাণিজ্যচুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ সামান্য, ক্ষতিই বেশি’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কারণে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে, বেশি দরে পণ্য কিনতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী নীতি ঠিক করতে হবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে অসংখ্য শর্ত পালন করতে হবে।

বিপরীতে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বাড়বে, নিজের ভূরাজনৈতিক কৌশল অনুযায়ী বাংলাদেশকে নীতি নিতে বাধ্য করতে পারবে এবং এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তেমন কোনো ছাড় দিতে হবে না। সব মিলিয়ে এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের লাভ অতি সামান্য, ক্ষতি বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোক্যাল ট্রেড-এআরটি) সই হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে। তখন দায়িত্বে ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার; আর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করা হয়।

পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপ বাতিল করে দেন। এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) আইনের অধীন। এই আইন সাধারণত ব্যবহৃত হয় জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায়। যেমন সন্ত্রাসবাদ, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। আদালত বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই শুল্ক আরোপে আইনি ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। বাণিজ্য–ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি অবস্থা দেখিয়ে শুল্ক বসানো যায় না। শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মূলত কংগ্রেসের।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথমে ১০ শতাংশ এবং পরদিন ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এটি করা হয় ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪-এর আওতায়। এই আইনে জরুরি পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে আমদানি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক বসানো যায়। তবে এরও মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পারস্পরিক শুল্ক বাতিল করলেও এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। তবে এটি এখনো কার্যকর হয়নি। এর কারণ হচ্ছে, চুক্তিতে বলা আছে যে দুই পক্ষ নিজেদের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা লিখিতভাবে জানাবে। এর ৬০ দিন পর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে। তবে চাইলে তারা অন্য তারিখও ঠিক করতে পারবে। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর করতে হলে প্রথমে আইনি প্রক্রিয়া ঠিক করতে হবে। সেটিই এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে কেন এই চুক্তি করা হলো—এ নিয়েই রয়েছে নানা প্রশ্ন। চুক্তির একতরফা বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। আবার চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই নানা রকম কেনাকাটার চুক্তি করা হচ্ছে। এসব কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই চুক্তি বাতিলের দাবি তুলছে; আর অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধান হওয়া দরকার।

চুক্তির যত কেনাকাটা

মূল চুক্তির একদম শেষ অনুচ্ছেদ হচ্ছে বাণিজ্যিক নানা বিষয় নিয়ে। এর মূল কথা হচ্ছে কেনাকাটার অঙ্গীকার; আর সেই অঙ্গীকারই দিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর রাখতে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট বেশ কিছু পণ্য কিনতে বাধ্য। চুক্তিতে যেমন বলা হয়েছে—

১. রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি যাত্রীবাহী বিমান, যন্ত্রাংশ ও সেবা কিনবে। তারা ১৪টি বোয়িং কেনার কথা বলেছে। এর বাইরে আরও কিছু বিমান কেনার সুযোগও রাখবে।

২. বাংলাদেশ বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করবে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনতে পারে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) থাকবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি কেনার চুক্তি থাকবে। ১৫ বছরে এর সম্ভাব্য মূল্য ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

৩. বাংলাদেশ বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে সাহায্য করবে, যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কিনতে পারে। এর মধ্যে গম, সয়াবিন, সয়া থেকে তৈরি পণ্য এবং তুলা থাকবে। গম প্রতিবছর অন্তত সাত লাখ মেট্রিক টন করে পাঁচ বছর কিনতে হবে। সয়াবিন ও সয়া পণ্যের ক্ষেত্রে এক বছরে অন্তত ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বা ১২৫ কোটি ডলার মূল্যের ২৬ লাখ মেট্রিক টন—যেটি কম হয়, সেটি কিনতে হবে। এসব পণ্যের মোট সম্ভাব্য মূল্য ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার।

৪. বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম আরও বেশি কিনবে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাবে।

৫. চুক্তি কার্যকর হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে দেশে কী কী ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানাবে।

বেশি দামে যা কিনতে হবে

চুক্তিতে কৃষি খাতে আগামী পাঁচ বছর প্রতিবছর ৭ লাখ টন গম এবং বছরে ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন পণ্য বা ২৬ লাখ টন কেনার কথা আছে। এসবের মূল্য বছরে প্রায় সাড়ে ৩ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার হতে পারে, অথচ বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসব পণ্য বছরে ১০০ কোটি বা ১ বিলিয়ন ডলারের কম কেনে। এ ছাড়া এলএনজি আমদানি, ১৪টি বোয়িং বিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম কেনার কথা রয়েছে চুক্তিতে। একই সঙ্গে কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ গম, সয়াবিন, এলএনজি ও তুলা অন্য দেশ থেকে কেনে। কারণ, সেগুলো তুলনামূলক সস্তা ও দ্রুত আসে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনতে খরচ ও সময় বেশি হতে পারে। সরকারি কেনাকাটায় বেশি দামে কিনলে বাড়তি খরচ করদাতাদের বহন করতে হবে। আর বেসরকারি খাতকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে উৎসাহিত করতে হলে সরকারকে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।

ফলে বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি কেনা বাংলাদেশের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এ বিষয়ে চুক্তির মধ্যেই এক ধরনের স্ববিরোধিতা রয়েছে। যেমন একদিকে চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে প্রতিযোগিতামূলক দেশ থেকে পণ্য আনতে না বলা হয়েছে; অন্যদিকে মার্কিন পণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক করতে বাংলাদেশকেই ভর্তুকি দিতে হতে পারে।

আগেই যত কেনাকাটা

চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর না হলেও বাংলাদেশ এরই মধ্যে কেনাকাটার জন্য আলাদা চুক্তি করেছে। এর মধ্যে বেশ কটি চুক্তি ও সমঝোতা সই হয় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। আর বিএনপি সরকারের সময় চুক্তি হলো বোয়িং কেনা নিয়ে।

বাণিজ্য চুক্তিতেই ১৪টি বোয়িং কোম্পানির উড়োজাহাজ কেনার কথা রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এ জন্য গত ৩০ এপ্রিল ১৪টি বোয়িং কেনারই চুক্তি করেছে। এর দাম ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। রয়টার্স ওই দিনই এ নিয়ে তাদের রিপোর্টে বলছে, এই পদক্ষেপকে ওয়াশিংটনের বাণিজ্যচাপের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের এয়ারবাস থেকে সরে এসে বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, ২০২৩ সালে ফ্রান্স থেকে ১০টি এয়ারবাস কেনার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ব্যবধান কমানোর কৌশলগত চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের পক্ষেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আর সেই চুক্তিই করা হলো বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে।

এর আগে ২০২৫ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির চুক্তি করেছিল। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের মধ্যে এ নিয়ে করা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত লাখ টন গম আমদানি করবে। হুবহু এ কথাটিই মূল চুক্তিতে রয়েছে। আর মূল চুক্তি করা হয় এর সাড়ে ছয় মাস পরে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ টন গম আমদানি করে। কম দামের কারণে এর বড় অংশ আসে কৃষ্ণসাগর অঞ্চল, অর্থাৎ মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও অল্প কিছু গম আমদানি করা হয়।

আবার ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক বছরে ১২৫ কোটি ডলারের সয়াবিন ও সয়াবিন মিল আমদানির জন্য চুক্তি করেছিল। এ নিয়ে ইউনাইটেড স্টেটস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের সঙ্গে চুক্তি সই হয়। তখন বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে দুই দেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যঘাটতি কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানির চুক্তি হয় ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। সেদিন ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও মার্কিন কোম্পানি আর্জেন্ট এলএনজির মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা সই হয়। এতে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ লাখ টন এলএনজি সরবরাহের কথা বলা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা মূল বাণিজ্য চুক্তিতেও এলএনজি আমদানির বিষয়টি যুক্ত হয়।

চুক্তিতে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের এই পারস্পরিক শুল্ক চুক্তির অর্থনৈতিক প্রভাব নানামুখী। সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে জ্বালানি, বিমান বা কৃষিপণ্য কোথা থেকে কেনা হবে, তা ঠিক হয় দাম, পরিবহনসুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিরাপত্তা দেখে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্য কিনতে হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সাধারণত নির্দিষ্ট দেশ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে কেনার শর্ত থাকলে এতে শিল্পে উৎপাদনের খরচ বাড়ে, সরকারও প্রতিযোগিতামূলক দরে পণ্য কেনার সুযোগ হারায়। আবার এসব বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের প্রভাব ফেলতে পারে।

চুক্তির কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির বাইরে গিয়ে পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলবে। কেননা, বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য বা ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করবে, কোথা থেকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা জ্বালানি কিনবে—এসব বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর, সোর্স কোড, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও ভর্তুকির তথ্য প্রকাশের শর্ত বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতাও সীমিত করবে।

আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে চুক্তির মেধাস্বত্ব–সংক্রান্ত ধারাগুলো। এর মধ্যে ১২টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে যোগ দেওয়ার শর্তে ছোট কৃষকের বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের সুযোগ কমাবে, এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। ওষুধ খাতেও এফডিএ অনুমোদন ও পেটেন্ট-সংক্রান্ত বাড়তি নিয়ম জেনেরিক ওষুধশিল্পের ওপর চাপ তৈরি করবে। এসব শর্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া সুবিধাও কমিয়ে দেবে। এমনিতেই এই চুক্তি করার সময় বাংলাদেশের এলডিসি থাকাকে আদৌ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

ডব্লিউটিওর সঙ্গে সাংঘর্ষিক

যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিওর নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, এমএফএন নীতিতে একই পণ্যে সব দেশের জন্য একই শুল্ক থাকার কথা, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দেশভেদে আলাদা বাড়তি শুল্ক বসিয়েছে। এমএফএন বা মোস্ট ফেভারড নেশন নীতি হলো বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার একটি মৌলিক নিয়ম। এর অর্থ হচ্ছে একটি দেশ কোনো একটি দেশকে যে শুল্ক বা সুবিধা দেবে, একই পণ্যে সেই সুবিধা অন্য সব ডব্লিউটিও সদস্যকেও দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের ভিত্তি দুর্বল। কারণ, এতে শুধু পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি দেখা হয়েছে; কিন্তু সেবা বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্বৃত্ত বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রযুক্তি, আর্থিক সেবা, মেধাস্বত্ব ও ডিজিটাল খাতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে বড় আয় করে। যেমন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যঘাটতি ছিল ৯৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু সেবায় উদ্বৃত্ত ছিল ২৯ বিলিয়ন ডলার। তাই শুধু পণ্যে ঘাটতি দেখিয়ে কোনো দেশকে অন্যায্য সুবিধাভোগী বলা অর্থনৈতিকভাবে একপেশে।

আবার পাল্টা বা পারস্পরিক শুল্ক ডব্লিউটিওর নিয়মের বিরুদ্ধে গেলেও এই চুক্তিতে বাংলাদেশকে ডব্লিউটিওতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সমর্থন করতে বলছে। যেমন ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর স্থায়ীভাবে শুল্ক না বসানোর প্রস্তাব সমর্থন করতে বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। আবার বাংলাদেশকে মৎস্য–ভর্তুকি চুক্তি ও বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি বাস্তবায়ন করতেও বলা হয়েছে; কিন্তু এতে এলডিসি ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিশেষ সুবিধার বিষয়টি অস্পষ্ট।

এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রায় সব মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সমান সুবিধা দিচ্ছে না। ফলে অন্য দেশও বাংলাদেশের কাছে একই সুবিধা চাইতে পারে, আর না দিলে ডব্লিউটিওর এমএফএন নীতি ভঙ্গের অভিযোগ উঠতে পারে।

শুল্কের ব্যবধান বাড়বে

চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার হবে ১৯ শতাংশ। এই শুল্ক অনেক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান এমএফএন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। পারস্পরিক বা পাল্টা শুল্ক থেকে ছাড় পাওয়া পণ্য বাদ দিলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের আমদানি-ওজনভিত্তিক গড় শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় ৩৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ এমএফএন শুল্ক এবং ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আরও বেশি শুল্কের মুখে পড়বে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের গড় আমদানি শুল্ক এখন প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। তবে কর রেয়াত ধরলে কার্যকর গড় শুল্ক দাঁড়ায় প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ। আর নতুন চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ পণ্যে এই শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসবে। ফলে দুই দেশের শুল্ক ব্যবধান আরও বড় হবে।

রাজস্ব ক্ষতি বাংলাদেশের

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পণ্যে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শুল্ক কমাবে বা পুরোপুরি তুলে দেবে। এ জন্য পাঁচ ধরনের শ্রেণি রাখা হয়েছে। যেমন ইআইএফ শ্রেণির পণ্যে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই শুল্ক শূন্য হবে। বি-৫ শ্রেণিতে শুরুতেই অর্ধেক শুল্ক কমবে, বাকি অংশ ধাপে ধাপে কমে পঞ্চম বছরে শূন্য হবে। বি-১০ শ্রেণিতে একইভাবে প্রথমে অর্ধেক কমবে, বাকি অংশ দশম বছরে গিয়ে শূন্য হবে। যে পণ্যে শুল্ক আগেই শূন্য, সেখানে তা শূন্যই থাকবে। আর এক্স শ্রেণির পণ্যে কোনো ছাড় নেই, আগের এমএফএন শুল্কই বহাল থাকবে।

এ নিয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ আগামী ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইনের পণ্যে এমএফএন শুল্ক তুলে নেবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি পণ্যচুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুল্কমুক্ত হবে। আরও ২ হাজার ২১০টি পণ্য ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শুল্কমুক্ত হবে।

এই ছাড়ের বড় অংশ শুরুতেই কার্যকর হবে। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরপরই অনেক মার্কিন পণ্যে শুল্ক কমে যাবে বা উঠে যাবে। ফলে বাংলাদেশ রাজস্ব হারাবে শুরু থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৩২৬টি পণ্য শুল্কমুক্ত তালিকার বাইরে থাকবে; কিন্তু বাংলাদেশ বর্তমানে এসব পণ্য খুব কম আমদানি করে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আমদানির ১ হাজার ৬৩৮টি ট্যারিফ লাইনকে পাল্টা শুল্কের তালিকার বাইরে রাখার কথা বলেছে। তবে এসব পণ্যে এমএফএন শুল্ক বহাল থাকবে। এই তালিকার বাণিজ্যিক মূল্য বাংলাদেশের জন্য সীমিত। কারণ, বাংলাদেশ বর্তমানে এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি পণ্য সামান্য পরিমাণে রপ্তানি করে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য, বিশেষ করে পোশাক, এই তালিকার বড় সুবিধা পাচ্ছে না।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর প্রায় ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন বা ১২৪ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। একই সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর প্রায় ১৮০ মিলিয়ন বা ১৮ কোটি ডলার শুল্ক আদায় করেছিল। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের আদায় ছিল বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।

আর নতুন চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আদায় ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যের ওপর প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলারের শুল্ক প্রায় শূন্যে নেমে আসবে।

কতটা লাভবান হবে পোশাক খাত

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও মানবসৃষ্ট তন্তু দিয়ে তৈরি কিছু পোশাকে পাল্টা শুল্ক থাকবে না। তবে আগের যে এমএফএন শুল্ক প্রায় ১৬ শতাংশ, তা বহাল থাকবে। দেখা গেছে, বাংলাদেশে তুলা আমদানির ৪০ শতাংশ আসে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে। প্রায় ২৫ শতাংশ আসে ব্রাজিল থেকে, ১৫ শতাংশ ভারত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে মাত্র ৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা অন্যদের তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেশি দামি। এর সঙ্গে পরিবহন খরচও আছে। বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশ থেকে আমদানি হওয়া ‘নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের’ ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসবে না, তবে তা ‘পরে নির্ধারিত একটি পরিমাণ’ পর্যন্ত। সুতরাং শেষ পর্যন্ত পোশাকপণ্য কতটা সুবিধা পাবে তা নির্ভর করবে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক সিদ্ধান্তের ওপর। অর্থাৎ ছাড় পেলেও এসব পোশাক বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি শুল্কমুক্ত হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের তিন হুমকি

পুরো চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তিনবার হুমকি দিয়েছে যে শর্ত না মানলে তারা চুক্তি বাতিল করবে এবং আগের দেওয়া বাড়তি শুল্ক আরোপ করবে। প্রথম হুমকি ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তি করা যাবে না।

দ্বিতীয় হুমকি বাজারভিত্তিক নয় এমন দেশের সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে। যেমন বাংলাদেশ যদি কোনো অবাজার অর্থনীতির দেশের সঙ্গে এমন চুক্তি করে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি দুর্বল হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে অবাজার অর্থনীতি বা নন-মার্কেট ইকোনমি দেশের একটি তালিকা আছে। অর্থাৎ যেখানে পণ্যের দাম পুরোপুরি বাজারের নিয়মে ঠিক হয় না। দেশগুলো হলো অ্যাঙ্গোলা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, চীন, জর্জিয়া, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লাওস, মলদোভা, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করলে যুক্তরাষ্ট্র তা মানবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমল। এই ধারার কারণেই কি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন লাগছে?

চুক্তিতে আরও আছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে ঝুঁকিতে ফেলে। তবে দুটি ছাড় আছে। যেমন যদি বিকল্প সরবরাহকারী না থাকে অথবা আগে যদি অন্য চুক্তি থেকে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় হুমকি হচ্ছে, এই বাণিজ্য চুক্তি থাকলেও অন্যায্য বাণিজ্য, হঠাৎ আমদানি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তার কারণে যুক্তরাষ্ট্র আরও অতিরিক্ত শুল্ক বসাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে এই চুক্তির কোনো ধারা বাংলাদেশ মানেনি, তাহলে আগের পারস্পরিক শুল্কহার ফিরিয়ে আনবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই বাণিজ্য চুক্তির কারণে বাংলাদেশের বাণিজ্যসংক্রান্ত সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হতে পারে। যেমন রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করতে গেলে রাশিয়া থেকে রিঅ্যাক্টর কেনা যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে পড়তে পারে। চীনের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। অথচ চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস এবং বেসরকারি খাত সেখান থেকে সস্তা, প্রতিযোগিতামূলক ও দ্রুত সরবরাহযোগ্য পণ্য আনে।

অন্যরা কী করেছে

যুক্তরাষ্ট্র ৫৭টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর পাল্টা শুল্কহার ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশের সঙ্গে আলাদা চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড) করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশগুলো হলো মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, আর্জেন্টিনা, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া ও ইকুয়েডর।

দেখা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে করা চুক্তিটি অনেক বেশি কঠোর। অন্য দেশের চুক্তি বেশি পারস্পরিক, কাঠামোগত, নিয়মভিত্তিক ও বাণিজ্য সম্প্রসারণমুখী; কিন্তু বাংলাদেশের চুক্তি বেশি শর্তযুক্ত, অনুপালননির্ভর, নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক ক্রয়সমৃদ্ধ, অসম ও রাজস্ব ক্ষতির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। ২০২১-২২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ছিল ১ হাজার ৪২ কোটি ডলার। পরের বছর তা কমে ৮৫২ কোটি ডলারে নেমে আসে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় ৭৬০ কোটি ডলারে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে রপ্তানি বেড়ে ৮৬৯ কোটি ডলার হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।

খাতভিত্তিক হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলার। এর বাইরে ক্যাপ ২৬ কোটি ডলার এবং হোম টেক্সটাইল ১৫ কোটি ডলার রপ্তানি হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানিও বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি ছিল ২৫৪ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ২৭১ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৫৯৮ কোটি ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৫০৬ কোটি ডলার।

প্রবাসী আয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই দেশ থেকে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৪৪ কোটি ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৪৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

চুক্তি কীভাবে কার্যকর হবে

বাংলাদেশ এই চুক্তি করার ১১ দিন পরে ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বেশির ভাগ পাল্টা চুক্তি আরোপ বাতিল করে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এই রায়ের পরই মালয়েশিয়া বলেছে, রায়ের কারণে মালয়েশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেছে। দেশটির সংসদ সদস্যরাও অনুমোদন স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ নিয়ে গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের এখনো আনুষ্ঠানিকতা বাকি আছে। চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকায় আসছেন। তখন বাণিজ্য চুক্তির সার্বিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর না হলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে গম, ভোজ্যতেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তুলা ইত্যাদি পণ্য কেন বেশি করে আমদানি করা হচ্ছে এবং সেগুলো কীভাবে হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এসব পণ্য কোথাও না কোথাও থেকে আমাদের আমদানি করতেই হবে।

টিকফার ব্যবহার চান বিশেষজ্ঞরা

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্ট বা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি সই হয়েছিল ২০১৩ সালের নভেম্বরে। এর উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-সম্পর্কিত সমস্যা, বাধা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিয়মিত আলোচনার একটি আনুষ্ঠানিক ফোরাম তৈরি করা। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে টিকফার আওতায় সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। ঢাকায় অনুষ্ঠিত সেই বৈঠক ছিল টিকফার সপ্তম বৈঠক।

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান টিকফার কার্যকর ব্যবহারসহ সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশকে নতুন আলোচনার সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ গ্রহণ করে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন পক্ষকে নিজেদের উদ্বেগগুলো তুলে ধরা। তবে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক রপ্তানি বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের বড় উৎস এবং সম্ভাবনাময় বাজার। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা–সংক্রান্ত যে কাঠামো চুক্তি বা টিকফা প্ল্যাটফর্ম আছে, আলোচনার জন্য বাংলাদেশ তা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করতে পারে।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার প্রতিবেদন ‘চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর সরকার’। খবরে বলা হয়, সারা দেশে চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি বার বার বলে আসছেন। এরপর গত রোববার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে পুলিশ। এই আটকের মধ্য দিয়ে সমাজে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে তারেক রহমানের সরকার। যদিও আটকের ১২ ঘণ্টা পর মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে রেজাউল কাইয়ুমকে। ফলে এ নিয়ে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজের বিশিষ্টজনরা বলছেন, এটাও বা কম কিসে! কারণ অতীতে কোনো সরকারকে নিজ দলের কারও বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়নি।

তাদের মতে, বিএনপি সরকার সত্যিকার চাঁদাবাজদের দু-একজনকে ধরলে দেশে চাঁদাবাজি অর্ধেকে নেমে আসবে। আর যদি পুরো মাত্রায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার শুরু করে তাহলে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ হতে বাধ্য।

সূত্রগুলো বলছে, সরকারের সুনাম ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের গ্রিন সিগনাল পেয়ে লাগাতার অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সারা দেশে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করে ‘অলআউট’ অ্যাকশনে নেমেছে তারা।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি মহানগর এলাকা, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও অন্যান্য ইউনিটকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজির মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, চাঁদাবাজদের বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে-চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী সে যে দলেরই হোক, যত বড় নেতাই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে ‘অ্যাকশন’ শুরু হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যৌথ অভিযান শুরু করার কথা বলেছেন। সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা যৌথ অভিযান চালাচ্ছি। গত ১ মে থেকে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে।

সূত্র বলছে, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের দমনে পুলিশের পক্ষ থেকে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় বিট পুলিশিংয়ের আদলে কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কমিটির নাম হতে পারে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি, কমিউনিটি পুলিশিং বা বিট পুলিশিং। ওইসব কমিটিতে মসজিদ, স্কুল, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তখনই অভিযান পরিচালনা করে যখন অপরাধটা মহামারির আকার বা একটা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাছাড়া অতীতে এ ধরনের অভিযানে মূল চাঁদাবাজরা গ্রেফতার হওয়ার নজিরও তেমন নেই। তবে ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পরের নির্বাচিত সরকার মূল চাঁদাবাজদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাভাবনা অনেক ইতিবাচক এবং ব্যতিক্রমধর্মী। এটা নেতাকর্মীদেরও ধারণ করতে হবে। যখন প্রধানমন্ত্রীর চিন্তাচেতনা, দেশ নিয়ে ভাবনা, দেশপ্রেম বিএনপির সব নেতাকর্মীর মধ্যে থাকবে তখন দেশ অনেক এগিয়ে যাবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ইউনিটভিত্তিক কঠোর অভিযান চলছে। এর পাশাপাশি থানায় চাঁদাবাজির যে মামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর তদন্ত এগুচ্ছে কিনা তা নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। চাঁদাবাজির মামলাগুলো তদন্ত দ্রুত শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে কোনো অবস্থাতেই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। ঢাকা রেঞ্জের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজদের গ্রেফতারে লাগাতার অভিযান অব্যাহত আছে।

কালের কণ্ঠ

‘বঙ্গে ফুটল পদ্ম, ‘দিদি’র পতন’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসতে চলছে কোনো হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাত ১টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রাথমিক ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হওয়া ২৯৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি নিশ্চিত করেছে ২০৮টি আসন। অন্যদিকে তৃণমূল পেয়েছে ৭৯টি আসন।

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি গতকাল ভারতের তামিলনাড়ু, কেরালা, আসাম ও পুদুচেরিতেও ভোট গণনা হয়েছে। তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে চমক দেখিয়েছে সুপারস্টার থালাপতি বিজয়ের নতুন দল তামিলাগা ভেত্রি কাঝাগাম (টিভিকে)। প্রাথমিক ফলাফলে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মতো ঐতিহ্যবাহী দলকে পেছনে ফেলে এককভাবে এগিয়ে রয়েছে দলটি। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ২৩৪টি আসনের মধ্যে থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে ১০৭ আসন পেয়েছে।

আর ডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৪ আসন। কেরালায় ১৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) ৮৯ আসন পেয়েছে। আর লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) পেয়েছে ৩৫ আসন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ পেয়েছে তিনটি আসন।

আসামে ১২৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ পেয়েছে ১০২টি আসন। আর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন আইএনসি পেয়েছে ২১টি আসন।

পুদুচেরিতে ৩০টি আসনের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ১৮টি আসন পেয়েছে। কংগ্রেস জোট পেয়েছে ছয়টি আসন।

পশ্চিমবঙ্গে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফল স্পষ্ট হতেই বিজেপি শিবিরে উল্লাস আর তৃণমূলে বিষাদের চিত্র দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জায়গা থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘দুর্গ’ বলে পরিচিত একাধিক অঞ্চল দখল করতে চলেছে বিজেপি বলে অভিযোগ করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে ব্যারাকপুরে তৃণমূল প্রার্থীর ওপর আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে বিজেপি এজেন্টদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট জমা পড়েছে।

অন্যদিকে কোচবিহার জেলার দিনহাটায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে বলে জানিয়েছেন ডিআইজি অঞ্জলি সিং। এ ছাড়া বাঁকুড়াতেও কাউন্টিং সেন্টার চত্বরে তৃণমূল ও বিজেপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দুই দলই একে অন্যের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে। তবে এ নিয়ে প্রশাসনের তরফ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

ধুতি-পাঞ্জাবি পরে উদযাপন মোদির, দিলেন বদলের বার্তা

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এগিয়ে থাকার খবরে রাজধানী দিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তর থেকে মঞ্চে উঠে বদলের বার্তা দিয়েছেন মোদি। তাঁর পরনে ছিল ঘিয়ে রঙের গরদের ধুতি, গায়ে অফহোয়াইট রঙের তসরের পাঞ্জাবি। গলায় পাড়ওয়ালা উত্তরীয়। সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন অমিত শাহসহ অন্য নেতারাও। পাশে ছিলেন বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন। এ সময় মোদি বলেন, ‘বাংলায় রাজনৈতিক হিংসায় অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে, এবার বদলা নয়, বদল।’

শুধু বাঙালির সাজই নয়, বিজেপির সদর দপ্তরে বাজানো হয় নির্বাচনী গান, ‘পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার’। এর আগে এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাঁদের আশ্বাস দিচ্ছি, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার দেব, যা সমাজের সকল স্তরের মানুষের সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘দেড় বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা ঋণ বেড়েছে সরকারের’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুন থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় বছরে সরকারের ঋণ বেড়েছে তিন লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ের প্রায় পুরোটা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। এ সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কম অর্থ ব্যয় করা হলেও ঋণের লাগাম ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

গতকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয় হালনাগাদ ঋণ বুলেটিন প্রকাশ করেছে। বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি ২২ লাখ ছয় হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন শেষে যা ছিল ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারের ঋণস্থিতি ছিল ১৯ লাখ ৪৪ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ বেড়েছে দুই লাখ ৬২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার মেগা প্রকল্প থেকে সরে আসার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন ব্যয় ব্যাপকভাবে কমালেও ঋণনির্ভরতা কমাতে পারেনি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে না পারা এবং আগের ঋণ পরিশোধের চাপের পাশাপাশি-পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানতে না পারায় ঋণ বাড়াতে হয়েছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আগের সরকারের পতনের আগে ওই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ঋণ দাঁড়িয়েছিল ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ঋণ বুলেটিনে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা উল্লেখ ছিল। পরে বৈদেশিক ঋণকে নতুন বিনিময় হারে রূপান্তর করার কারণে এর পরিমাণ ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেড়েছে।

সরকারের ঋণ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের চেয়ে বৈদেশিক উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। গত অর্থবছরে সরকার ৩৪৪ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা নিয়েছে, আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ডলার। দেড় বছরে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ আট লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। আগের সরকারের পতনের এক মাস আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা গত ডিসেম্বর শেষে বেড়ে হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা।

ইত্তেফাক

‘উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আট নদীর পানি বিপত্সীমার ওপরে’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের আসাম-মেঘালয় পাহাড় হতে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের আটটি নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে পানির স্তর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, অব্যাহত থাকতে পারে পানি বৃদ্ধি। বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলে আগামী তিন দিন মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারী এবং ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এই বন্যা অন্য জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এদিকে ভারতের বিশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, মেঘালয় ও আসামে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত চলছে। মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে হাওর অঞ্চলের নদনদীর পানি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নদী তীরবর্তী ও নিচু এলাকার মানুষদের সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি ও উজানের পানির প্রভাবে নদনদীর এই আকস্মিক বৃদ্ধি স্থানীয় হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুর রহমান জানান, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে। এছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি নদীর পানি আট পয়েন্টে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত আছে। আগামী তিন দিন মাঝারি থেকে মাঝারি ভারী এবং মাঝারি ভারী থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছর ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মধ্যে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে এরই মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ৭ মে পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও উজান এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে।

পাউবো জানিয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলার নালজুর নদী জগন্নাথপুর পয়েন্টে, নেত্রকোনা জেলার বাউলাই নদী খালিয়াজুড়ি পয়েন্টে, ভুগাই-কংস নদী জারিয়াজাঞ্জাইল পয়েন্টে, সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা পয়েন্টে, মগরা নদী নেত্রকোনা ও আটপাড়া পয়েন্টে এবং হবিগঞ্জ জেলার কালনি-কুশিয়ারা নদী আজমেরিগঞ্জ পয়েন্টে, সুতাং নদী সুভাং-রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের মধ্যে সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে, অপরদিকে ভুগাই-কংস নদীসমূহের পানি সমতলে হ্রাস পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে (আগরতলা-ত্রিপুরা) এবং অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় মাঝারি-ভারী থেকে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার সিলেট, সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল আগামী তিন দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। ২য় দিন কুশিয়ারা নদীর কোথাও কোথাও পানি সমতল প্রাক-মৌসুমি বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। নেত্রকোনা জেলার ডুলাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীসমূহের পানি সমতল আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। নেত্রকোনা জেলার ভুলাই-কংস অববাহিকার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীসমূহের পানি সমতল আগামী দুই দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং ৩য় দিন বৃদ্ধি পেতে পারে। জুড়ি নদীর পানি সমতল আগামী ৭২ ঘণ্টায় দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। সুতাং নদীর পানি সমতল আগামী এক দিন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পরবর্তী দুই দিন হ্রাস পেতে পারে, এবং প্রাক-মৌসুমি বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হবিগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘হাওরের আকাশে কালো মেঘ কাটছেই না’। খবরে বলা হয়, ‘সব ধান তল অয়া গেছে। কিছুই পাই নাই। ধান দূরের কথা, এক মুইঠ খেড়ও (খড়) বাঁচাইতে পারি নাই। ধার-দেনা কইরা ক্ষেত করছিলাম। এহন সারা বছর কি কইরা চলাম, গরুগুলোরেও কেমনে বাঁচাইলাম, কিছুই বুঝতাছি না।’

নয়া দিগন্তকে কথাগুলো বলছিলেন ইটনা উপজেলার এলংজুরী ইউনিয়নের বড়হাতকবিলা গ্রামের কৃষক বখতিয়ার ভূঁইয়া। এদিকে হাওরের আকাশে কালো মেঘ কাটছেই না, এক দিকে বৃষ্টি আরেক দিকে নদীর পানি বাড়ছে। এতে কৃষকের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ আরো গাঢ় হচ্ছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী তিন দিন কিশোরগঞ্জে মেঘলা আকাশ, বজ্রঝড় এবং থেমে থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল সোমবার কিশোরগঞ্জে সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে হাওর অঞ্চলের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে এবং বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

নিকলী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: জাহিদুল ইসলাম মাসুম বলেনে, আগামী তিনদিন কিশোরগ ঞ্জে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ৬ ও ৭ মে জেলাজুড়ে ভারী বজ্রঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রতিদিনই হাওরে পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাড়ছে। করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের খয়রত গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, রোববার রাত থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে।

এলাকায় বেশিরভাগ ধান কাটা হয়ে গেলেও রোদ না থাকায় তা পচে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আজ্জোয়া ( সোমবার) দুপুরে কিছু রইদ (রোদ) উঠছিল। কিন্তু এই রইদে কী অইবো। একলাগা রইদ না থাকলে ধান শুকাইবো না।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলছেন, দুপুর নাগাদ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে রোদ দেখা গেলেও জেলার চারটি নদীর মধ্যে ভৈরবে মেঘনা ছাড়া আর অন্যগুলোর পানি বেড়েছে।

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জের ইটনায় ধনু-বৌলাই নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। চামড়া বন্দর এলাকায় মগড়া নদীর পানি বেড়েছে ১৭ সেন্টিমিটার এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। তবে তা এখনো বিপদসীমায় পৌঁছেনি।

বণিক বার্তা

‘পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে সরকার গঠনের পথে বিজেপি’-এটি বণিক বার্তার প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক উত্থানের পথে দীর্ঘদিন ধরে বড় ব্যতিক্রম ছিল পশ্চিমবঙ্গ।

হিন্দিভাষী উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে প্রভাব বিস্তারে বিজেপি একের পর এক সাফল্য পেয়ে এসেছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধে দৃঢ়চেতা হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ এতদিন নাগালের বাইরে ছিল। অবশেষে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বিজেপি। গতকাল ভোট গণনার পর বেসরকারি ফলাফলে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকটাই নিশ্চিত।

একই দিন ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল দেখা গেছে। তামিলনাড়ুতে মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগমের (ডিএমকে) নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে পরাজিত করে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বিজয় থালাপাতির নতুন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজগম (টিভিকে) ক্ষমতায় আসার পথে রয়েছে। অন্যদিকে কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) পরপর দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (এলডিএফ) পরাজিত করে ভারতের শেষ কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের অবসান ঘটানোর পথে। তবে আসামে বিজেপি নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও দলটি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।

এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল পশ্চিমবঙ্গে। গত অর্ধশতকে রাজ্যটিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে মাত্র একবার। প্রথমে ৩৪ বছর শাসন করেছে বামফ্রন্ট, এরপর ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে এমন রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন, যেখানে ‘প্রভাবশালী একক দল’ বা হেজেমনিক রাজনীতির প্রবণতা প্রবল।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় মোট আসন ২৯৪টি। এনডিটিভির খবর অনুযায়ী বেসরকারি ফলাফলে বিজেপি জিতেছে ২ শতাধিক আসনে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে ৮১টি আসনে। এছাড়া বামপন্থী জোট ও কংগ্রেস জিতেছে দুটি করে আসনে।

ফলাফল বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং সুশাসনের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষকে আমি শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমি তাদের আশ্বস্ত করছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমাদের দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আমরা এমন একটি সরকার গঠন করব, যা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’

আজকের পত্রিকা

দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘দিদির রাজ্য মোদির দখলে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার যাচ্ছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির হাতে। ভূমিধস জয়ের পথে হাঁটছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে রাজ্য ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের পতন হচ্ছে। গতকাল সোমবার রাত ৯টার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আনন্দবাজারের খবর, বিজেপি জিততে যাচ্ছে ২০৮ আসন। আর তৃণমূলের ঘরে যাচ্ছে ৭৯। ভোটের ফলাফলের এই খবর যখন আসছে, তখন বিজেপির কর্মীদের তোপের মুখে পড়লেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজয় নিশ্চিতের ইঙ্গিত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গে এবার বদল আসবে।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার আসন ২৯৪টি। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ১৪৮টি আসনে জয় প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই রাজ্য ছাড়াও গতকাল তামিলনাড়ু, আসাম, কেরালা ও পদুচেরির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে তামিলনাড়ুতে জিততে যাচ্ছেন জনপ্রিয় অভিনেতা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে থালাপতি বিজয়ের দল তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে)। আর আসামে বিজেপি, কেরালায় কংগ্রেস, আর পদুচেরিতে জিততে যাচ্ছে অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট।

গত ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় ধাপের ভোট গ্রহণ হয়। এরপর গতকাল হলো ফল ঘোষণা। এর আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে উত্তেজনা চলছিল। বিজেপি ও তৃণমূল—দুই দলই নিজেদের আগাম জয় দাবি করেছিল। তবে বুথফেরত জরিপে বলা হয়েছিল, এবার রাজ্য যাবে গেরুয়া রঙের দখলে। সেই চিত্রই গতকালের ফলাফলে উঠে এল। ভোটের ফলে ভালো করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় রংখেলাও শুরু করেছেন বিজেপির কর্মীরা। কলকাতার গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলায় গেরুয়া ঝড়ে ঝরে পড়ল ঘাসফুল। কাকদ্বীপ থেকে কালিম্পং, গেরুয়া শিবির ইতিমধ্যেই উদ্‌যাপনে মেতে উঠেছে। কোথাও বাইক মিছিল, কোথাও বা গেরুয়া আবির খেলা, কোথাও আবার বিজেপির অফিসের সামনেই মিষ্টিমুখ। জেলায় জেলায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের তুমুল উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো।

রাজ্যে বিজেপির জয় হবে, সেটা আগে থেকেই বলে আসছিলেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল সকালেই তিনি বলেন, এই রাজ্যে তাঁর দল সরকার গঠন করবে।

এদিকে জয়ের বার্তা পেয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বিহার, ওডিশার মতো পশ্চিমবঙ্গের মানুষও এনডিএর ওপর ভরসা রেখেছে। রাজ্যে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘বাংলায় রাজনৈতিক হিংসায় অনেক জীবন নষ্ট হয়েছে, এবার বদলা নয়, বদল।’

আর পশ্চিমবঙ্গে জয়ের জন্য দলের কর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানালেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন।

এদিকে ভোট চুরির অভিযোগ এনেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট গণনা দেখতে গতকাল নিজের আসন ভবানীপুরে যান তিনি। শুভেন্দু অধিকারী ওই কেন্দ্রে বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। আনন্দবাজার বলছে, এই আসনে হেরে যেতে পারেন তিনি। তবে এই আসনসহ ভোটে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন মমতা। ভবানীপুরের ওই গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় মমতা বলেন, শতাধিক আসনে গণনা লুটে নিয়েছে বিজেপি।

দেশ রূপান্তর

‘স্বার্থ রক্ষা করে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তবর্তী পাঁচটি রাজ্যের চারটিতেই দলটি সরাসরি অথবা তাদের সমর্থিত সরকার ক্ষমতাসীন হলো। তবে বাংলাদেশের দীর্ঘ পশ্চিম-সীমান্তের ওপারের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে দলটি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর নানামুখী প্রভাব পড়বে, এমনটি মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সরকারের ভেতরকার বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ক্ষমতায় পালাবদলের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, তা বিবেচনায় নিলে আগামী বছরগুলোয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থিতিশীল রেখে দেশের স্বার্থের বিভিন্ন দিক রক্ষা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে।

তারা বলেন, বিজেপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বাংলাদেশ ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব ও প্রচার আছে। আর ‘বিদেশি অনুপ্রবেশ’ দলটির একটি বড় রাজনৈতিক এজেন্ডা; নির্বাচনী ইশতেহারেও যার উল্লেখ আছে। ‘সন্দেহভাজন’ ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ প্রতিবেশী দেশে ঠেলে দেওয়া (পুশ ইন) সমর্থন করে বিজেপি। আর প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরে সংখ্যালঘুদের বিষয়ে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিষয়ে দলটির স্পর্শকাতরতা আছে। সব মিলিয়ে এসব বিষয় আগামী দিনগুলোয় বারবার সামনে আসতে পারে।

বেসরকারি বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগের ব্যাপার ‘আছে’, আবার ‘নেই’ এমন দ্বৈত পরিস্থিতি উদ্ভূত হতে পারে। তবে ঢাকা ও দিল্লি থেকে দুই দেশের কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে সম্পর্কের বিষয়গুলো ও মতভেদ সামাল দেয়, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির মনে করেন, বিজেপি জেতায় পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। মুসলিম-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কা আছে; এবং এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার ভালো দিকও আছে, এমনটি মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয়ভাবে বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে অনেক বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর দেশটির সরকারের কার্যত নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এখন বিজেপি কেন্দ্র ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় স্থানে ক্ষমতায় থাকায় দুই দেশের মধ্যে সরকারি-পর্যায়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে যেমন থাকবে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে সম্পর্কও তেমনই থাকবে।

বাংলাদেশ ও ভারত তিস্তার পানি ভাগাভাগির চুক্তির খসড়া ২০১০ সালে চূড়ান্ত করেছে। বর্তমান বিজেপি দলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সাবেক কংগ্রেস দলীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের স্পষ্ট দালিলিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধিতার অজুহাতে দেশটি এখনো তিস্তা চুক্তি সই করেনি।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন