আতাউর রহমান আতা। নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত। বিএনপি’র রাজনীতিতে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করলেও বরাবরই দলের বিরুদ্ধে অবস্থান করাটাই যেন তার নেশা এবং পেশা। দীর্ঘদিন ধরেই স্রোতের বাইরে অবস্থান নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তেমনটি করেছেন বিতর্কিত ও দলের বহিষ্কৃত এই নেতা। মানিকগঞ্জে বিএনপি’র রাজনীতিতে সবচাইতে জনপ্রিয় ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আফরোজা খান রিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রার্থী হয়েছিলেন। শুধু বিদ্রোহ প্রার্থী হয়ে ক্ষান্ত হননি রিতার মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে একাধিক অভিযোগ দায়ের করতেও দ্বিধা করেননি। নির্বাচন কমিশন আতার ভিত্তিহীন অভিযোগ খারিজ করে দিলে পরে হাইকোর্টের আশ্রয় নেয়। হাইকোর্টও তার সকল অভিযোগ খারিজ করে দেয়। যার কারণে আতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে। সদ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুটবল প্রতীকে অংশ নিয়ে তার জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা প্রোপাগান্ডার জবাব দিয়েছে নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা।
কে এই আতা: আতাউর রহমান আতা মানিকগঞ্জ জেলায় বিএনপি’র রাজনীতিতে একটি আলোচিত-সমালোচিত নাম। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি দলের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে যোগ দিয়েছিলেন ফেরদৌস আহমেদ কোরাইশীর নতুন দলে। এরপর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বিতর্কিত নেতা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফেরদৌস আহমেদ কুরাইশীর নতুন দলে সুবিধা করতে না পেরে সেখান থেকেও মুখ ফিরিয়ে আবার বিএনপিতে ফিরে আসেন তিনি। ওই নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুণার রশীদ খান মুন্নুর বিরোধিতা করে গোপনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহিদ মালেকের পক্ষে কাজ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আতাউর রহমান আতা বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীও হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী সরকারের সময় নিজেকে নিরাপদ রাখতে গোপনে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। দলীয় পদ ব্যবহার করে তার এমন ভূমিকায় তিনি ব্যক্তিত্বহীন নেতা হিসেবে পরিচিতি পান জেলা জুড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপি’র কোনো কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। আন্দোলন সংগ্রামে নিষ্ক্রিয় থাকার পরেও কেন্দ্রীয়ভাবে তাকে একাধিকবার জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বারবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় দলের নেতাকর্মীরা বরাবরই তার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারপরও অদৃশ্য কারণে বিএনপি অধ্যুষিত মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় একাধারে দুইবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়। ওই দু’টি নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীরা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে দিনরাত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আতার জয় নিশ্চিত করেন। জয়লাভ করার পর আতা তার নিজস্ব কিছু অনুসারী ছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের কোনো ধরনের মূল্যায়ন না করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে গোপন সখ্যতা তৈরি করে সরকারি কাজ বাগিয়ে নিতেন ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি অধ্যুষিত মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপিকে দ্বিধাবিভক্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন সুযোগ সন্ধানী আতা। আওয়ামী দুঃশাসন থেকে মুক্তির আন্দোলনে জেলা বিএনপি’র প্রধান কাণ্ডারি আফরোজা খান রিতার নেতৃত্বে বিএনপি যখন রাজপথে, তখন আতাকে দেখা যেত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের চেয়ারে। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মানিকগঞ্জে বেশ কয়েকটি বড় সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও কোনো মঞ্চেই আতার উপস্থিতি ছিল না। বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, রুহুল কবীর রিজভী, ড. মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সুলতান সালাউদ্দিন টুকুসহ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মানিকগঞ্জের সভা-সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও সে সময়গুলোতে আতা ছিলেন পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। অথচ তিনি ছিলেন তখন জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি। আন্দোলন সংগ্রামে মানিকগঞ্জের হাজারো নেতাকর্মী জেল-জুলুম নির্যাতনের শিকার হলেও আতা ছিলেন আওয়ামী লীগের ছায়ায় নিরাপদে। বিভিন্ন সময় দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের কিছু অনুসারী নেতাদের নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন কেন্দ্রীয় বিএনপি ও জেলা বিএনপি’র দুঃসময়ের কাণ্ডারিদের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালের পর থেকে জেলা বিএনপি’র কমিটি যতবারই হয়েছে ততবারই আতাউর রহমান আতা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন। সর্বশেষ ২০২১ সালের কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা বিএনপি’র কমিটিতে সভাপতি পদে আফরোজা খান রিতার প্রতিদ্বন্দ্বী হন আতা। নির্বাচনে মোট ৪৫টি ভোটের বিপরীতে আতাউর রহমান আতা পেয়েছিলেন মাত্র ২টি ভোট। শোচনীয় পরাজয়ের পরেও কেন্দ্র থেকে ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাকে ১নং সহ-সভাপতি করা হয়। ওই সময়ও তিনি কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাংবাদিক সম্মেলন পর্যন্ত করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর রিতাকে আহ্বায়ক করে জেলা বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও আতাউর রহমান আতা কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে সাংবাদিক সম্মেলন করেন এবং কমিটি থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। দখলবাজ যখন আতা: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মানিকগঞ্জ জেলা ডায়াবেটিক হাসপাতাল দখলে নিতে মরিয়া হয়ে পড়েন এই বিতর্কিত নেতা আতা। অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পিতভাবে আতাউর রহমান আতার নির্দেশে তার অনুসারীরা মুখোশ পরে হাসপাতালটি নিজেদের কবজায় আনার চেষ্টা চালায়। নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ওই ঘটনায় আতার নির্দেশেই তারই প্রাক্তন স্ত্রীকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছিত পর্যন্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছিল আতার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় আতার বিরুদ্ধে সরাসরি তার সাবেক স্ত্রীসহ ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করার সাহস পায়নি। আওয়ামী লীগ আমলে এই হাসপাতালটি ছিল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতানুল আজম খান আপেলের দখলে। একাধিক বিয়ে: আতার ব্যক্তিগত চরিত্র নিয়েও জেলা জুড়ে রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। কাগজে-কলমে চারটি বিয়ে করলেও নারী ঘটিত অনেক অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে দলের নেতাকর্মীরা বিব্রত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
শিল্পকারখানায় রাজত্বে যখন আতা: অভিযোগ উঠেছে, গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আতা একটি বাহিনী তৈরি করে নানান অপকর্মে লিপ্ত হয়েছেন। সদর উপজেলার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে যতগুলো শিল্পকারখানা রয়েছে প্রায় সবগুলোতেই আতাপন্থিদের অবৈধ খবরদারিতে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। প্রতিটি শিল্পকারখানায় আতাপন্থিরা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করায় শিল্পমালিকরাও চরম আতঙ্কে ছিল। জাগীর শিল্পাঞ্চলে গড়ে উঠেছে আতার দখলদার সাম্রাজ্য। সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে উঠে এসেছে শিল্পাঞ্চলে আতা বাহিনীর তাণ্ডবের শিরোনাম। জানা গেছে, চলতি গত বছরের ৩রা মে জাগীর শিল্পাঞ্চলে আতা বাহিনীর সংঘবদ্ধ একটি চক্র দিনে দুপুরে জেটি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি ওয়্যারহাউজে কাজ বাগিয়ে নিতে চাপ প্রয়োগ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে। অভিযোগ রয়েছে সেদিন জাপানি ওই কোম্পানির শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকতে বাধা দেয় আতার ঘনিষ্ঠ অনুসারী ড. জহির, বাবু ও কালামসহ অন্তত ২০ জন। আতার লোকদের লাভজনক কাজগুলো না দেয়ায় এর আগেও দুইবার তার অনুসারীদের নিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি ও অপচেষ্টা চালানো হয়। এ ছাড়াও জেলার বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ ড্রেজার পরিচালনা করে মাটিকাটা, গোলড়া শিল্প অঞ্চলে অবৈধভাবে কাঁচা মালামালের আড়ৎসহ নানান অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে আতা ও তার বাহিনীদের বিরুদ্ধে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আতা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নির্বাচন অংশ নেয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জে দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাই ‘আতা’র স্বভাব, বিরক্ত দলীয় নেতৃবৃন্দ
স্টাফ রিপোর্টার, মানিকগঞ্জ থেকে
১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
