সংসদে আর্থিক খাতের নিয়োগ ও বয়সসীমা নির্ধারণ নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অভিজ্ঞ ও যোগ্য ব্যক্তিদের কাজে লাগাতে বয়সসীমা শিথিল করা জরুরি।
এর বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকারের সাম্প্রতিক নিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। তবে সরকার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হবে না এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে দু’টি বিল পাস হয়। বিল দু’টি পাসের সময় আপত্তি জানায় বিরোধী দল। সংসদে পাস হওয়া বিল দু’টি হচ্ছে, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন (সংশোধন) ২০২৬’ এবং ‘বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল ২০২৬’। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিদ্যমান আইনে, কোনো ব্যক্তি ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ করলে তাকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)’র চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে নিয়োগের অযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয় বা তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলটি পাস হওয়ায় এ বিধানটি বিলুপ্ত হলো। অপরদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আইনে বলা আছে, ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হলে কোনো ব্যক্তি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারেন না। এই বিলটি পাসের পর এই বিধানটিও বিলুপ্ত হয়। এই দুইটি বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত পৃথক বিবৃতিতে বলা আছে- অভিজ্ঞ, দক্ষ ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিয়োগ দেয়ার লক্ষ্যে আইনগুলো সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।
এর আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দল বলছে, রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ দেয়ার সুযোগ তৈরি হলো এ বিল দু’টি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিল সংসদে পাস হওয়ার পর সংসদে কথা উঠলে অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। বলেন, এই বিলটা যখন ’৯৩-তে হলো, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদেশের এই নাগরিকগুলোকে, অভিজ্ঞ লোকগুলো তাদেরকে কর্মকাণ্ডে বাইরে রাখতে চান? কোথায় ৫৭ বছর এখন ৭২ বছর। এই ডিফারেন্সটার মধ্যে যারা আছে তাদের তো আমরা বাইরে রাখতে পারবো না। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাক্সেসফুলি এই সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে। তারা সফলভাবে এগুলো পরিচালনা করছে। যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার ক্ষেত্রে সেটা (বয়সের সীমা) তো আমরা চাচ্ছি না। যেটা বীমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সেটা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতির যে নতুন প্রেক্ষাপট সৃষ্টি হচ্ছে, এখানে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে যদি আপনি চান, আপনাকে এগুলোকে মাথায় রাখতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নাই। এ প্রফেশনাল জব। ইকোনমিকে প্রফেশনালি চালাতে গেলে এই পরিবর্তন আনতে হবে বাংলাদেশে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অনির্ধারিত আলোচনায় ফ্লোর নিয়ে বলেন, ১৩৩টা অধ্যাদেশ যেগুলা ছিল, যেগুলা বিল আকারে এসেছে এবং যেগুলো ল্যাপস (বাতিল) হয়ে গেছে, সেগুলাতে আমাদের অধিকার পুরাপুরি পাইনি। কারণ সময়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। সেই ক্ষেত্রে ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, আমাদেরকে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকতে হয়েছে। এখন সে রকম কোনো প্রেক্ষাপট ছিল না। এই দুইটা বিলের (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন (সংশোধন) ২০২৬ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল-২০২৬) ক্ষেত্রে আমাদের অধিকার কিন্তু খণ্ডন আপনার চেয়ার থেকে আপনি করলেন। খণ্ডনটা কিন্তু আপনার হাতেই হবে। দুই নম্বর হচ্ছে- যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় স্পেস করে দেয়া দরকার। কিন্তু একটা কথা আছে যে, বৃক্ষ তোমার পরিচয় ফলে। সরকারের দুই মাসের যে সমস্ত কার্যকলাপ বেসিক জায়গাগুলোতে হাত দেয়া, প্রত্যেকটা জায়গায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা চলে (শেষ হয়ে গেছে) গেছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আমি বেসিক জায়গায় বলেছি। নীতিগত যে জায়গা- বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে, যে কাজটা করা হয়েছে। সাবেক গভর্নরকে বিদায় দেয়ার যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে জাতি এটা দেখেছে। এখান থেকে শুরু করে আমি বারবার এগুলো মেনশন করতে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত যে সমস্ত জায়গায় পরিবর্তন এসেছে, সেগুলো জনগণ এবং ডেমোক্রেসি কোনোটাই সাপোর্ট করে না। এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত আমরা উন্মুক্ত রাখতে পারলাম না। ওখানেও গিয়ে আমরা ঝাপাইয়া পড়বো। তাহলে যেটা মন্ত্রী বললেন যে, যোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় না দিলে দেশ আগাবে কীভাবে? এইভাবে যদি যোগ্যতা সিলেকশন হয়, আমার প্রশ্ন- দেশ আগাবে কীভাবে? আমরা তো কার ইন্টেনশন কী সেটা দেখতে পারবো না। এটা মনের ব্যাপার। এটা একমাত্র আল্লাহতাআলা জানেন। আল্লাহু ছাড়া এটা কেউ জানে না। আমরা দেখবো তার প্রকাশটাকে। বাস্তবায়নটাকে কীভাবে এটা রিফলেক্ট করছে, সমাজে এই রিফলেশনে আমরা শঙ্কিতভাবে সবকিছুকে পলিটিসাইজ, ক্ষেত্রবিশেষে গোষ্ঠী-পরিবার এগুলাকে প্রাধান্য দিয়ে আগাইলে এ দেশ তো আগাবে না। আমরা তো সবাই মিলে চাই যে, দেশটা এগিয়ে যাক। এ পর্যন্ত সে রকম দৃশ্যমান কোনো কিছু আমাদের কাছে নেই।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আসলে একটা বিল পাস হওয়ার পরে এই ধরনের আলোচনার কোনো সুযোগ ছিল না এখানে, সেটাও রুলস অব প্রসিডিউরের বাইরে যে উনারা প্রশ্ন তুলেছেন, আমাদের উত্তর দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারগুলো যদি প্রেসিডেন্স দেখেন, যতবার সরকারে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, এক্সচেঞ্জ কমিশনের যতগুলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে, সবগুলো নন-পলিটিক্যাল। আমি ক্লিয়ারলি বলতে চাই এবং যেই কারণে বাংলাদেশে আর্থিক শৃঙ্খলা বিএনপি সরকারের সময় কোনো সমস্যা হয় নাই। সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে, কোনো সময় শেয়ারবাজার লুটপাট হয় নাই। বিকজ বিএনপি’র অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো কোনো সময় পলিটিক্যাল কনসিডারেশনে হয় নাই। যোগ্য ব্যক্তিদের সেখানে দেয়া হয়েছে, সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে, আমি আপনাকে নিশ্চিতভাবে বলতে চাই। দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশ গভর্নর উনি কিছু প্রশ্ন করেছেন, বাংলাদেশ গভর্নর কোনো দলের ব্যক্তি নয়, সে একটা দলের সমর্থক হতেই পারেন। কিন্তু তার যদি যোগ্যতা থাকে তার অ্যাপয়েন্টমেন্টের অসুবিধাটা কোথায়? “আপনি (বিরোধী দলীয় নেতা) বলছেন- ‘প্রুফ অব দ্য পুডিং ইজ ইন দ্য ইটিং’, তাই আসুন আমরা অপেক্ষা করি এবং দেখি। তিনি তার পারফরম্যান্সের মাধ্যমে যদি দলীয় কোনো বিষয় বা প্রভাবের প্রমাণ দেন, তখন আপনি তা বলতে পারবেন। তিনি বলেন, বিগত দিনে বিগত সরকারের সময় যখন গভর্নরের এজ (বয়স) বাড়িয়েছে, তো সেই সময় আপনারা কোনো আপত্তি তো করেন নাই। গভর্নরের এজ (বয়স) আমরা বাড়াইনি, এটা বিগত সরকার থেকে বাড়ানো হয়েছে। আমি একটা কথা এড করতে চাই, ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে দেয়া হবে না। উনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন কোনো সরকার বাংলাদেশে সিদ্ধান্ত দেয় নাই। বিগত দিনের ইতিহাস নাই বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট হবে না। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করবেন আগামীতে ব্যাংকিং সেক্টরে বলেন, আর্থিক সেক্টরে বলেন- কোনো পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট হবে কি না।
