সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘বিদেশে কর্মী পাঠানো ৪২ শতাংশ কমেছে’। প্রতিবেদন বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত দুই মাসে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানো বিপুল সংখ্যায় কমেছে। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। আর চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৮২ হাজার ৫৬১ জন। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ হাজার ৭৯০ জন বা ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ কম।
২০২৪ সালের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় ওই সময় প্রায় দ্বিগুণ কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪ জন কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান নয়; বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার সিঙ্গাপুরেও কর্মী পাঠানো কমেছে। মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইনের শ্রমবাজার আগের বছরগুলোর মতো বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি নেই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শ্রমবাজারে। কর্মী পাঠানোয় সমঝোতা স্মারক সই হলেও অস্ট্রেলিয়া, গ্রিসের মতো দেশগুলোর শ্রমবাজার খোলেনি।
এ ছাড়া রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ডের মতো ইউরোপের শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। এসব দেশের ভিসা পেতে ভারতের নয়াদিল্লিতে দূতাবাসে যেতে হয় বাংলাদেশিদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠায় দিল্লি যেতে পারছেন না কর্মীরা। আবার ইউরোপের এই দেশগুলোতে গিয়ে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে নিয়োগকারীরা।
ইউরোপের দেশে প্রবেশের পথ হয়ে ওঠায় কিরগিজস্তানের শ্রমবাজারও বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধের পথে। বৈধ চাকরি দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ায় দেশটির শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়েছে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য।
সরকারের ভাষ্য, বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খুলতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠাতে যোগাযোগ এবং কর্মীদের কাজের ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে একযোগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সুফল মিলবে।
সৌদিনির্ভর বৈদেশিক কর্মসংস্থান
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭ কর্মী বিদেশে চাকরির ছাড়পত্র নেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ২০৯ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। তা ছিল মোট চাকরির ৬৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতারে গত বছর এক লাখ সাত হাজার ৬০৩ জন কর্মী গিয়েছেন। কুয়েতে গিয়েছেন ৪২ হাজার ৭৩৮ জন। আরব আমিরাতে ১৩ হাজার ৭৫৪ জন গিয়েছিলেন। জর্ডান যেতে ১২ হাজার ৩২৯ জন কর্মী ছাড়পত্র নেন। সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের (জিসিসি) দেশগুলোতে কর্মী গিয়েছেন ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৫, অর্থাৎ বাংলাদেশি কর্মীর ৭৮ শতাংশের কর্মসংস্থান হয়েছে এসব দেশে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আগ্রাসন শুরু করে। প্রতিরোধে ইরান সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এর প্রভাবে দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান কমেছে।
গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরব গিয়েছিলেন এক লাখ দুই হাজার ১০৪ জন কর্মী। চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছেন ৪৪ হাজার ৮৭৬ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ৫৭ হাজার ২২৮ বা ৫৬ শতাংশ।
গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত কাতার গিয়েছিলেন ১৪ হাজার ৫৩২ জন। এ বছর গিয়েছেন চার হাজার ৭২৪ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ৬৯ শতাংশ। কুয়েত গিয়েছিলেন তিন হাজার ৫৫৮ জন। এ বছর গিয়েছেন দুই হাজার ৬১৩ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ২৭ শতাংশ।
তবে যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান এবং আরব আমিরাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সংখ্যার বিবেচনায় তা সামান্যই। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জর্ডান গিয়েছিলেন এক হাজার ৬২৩ জন। চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছেন এক হাজার ৯৯৯ জন। আরব আমিরাত গিয়েছিলেন ৫৪০ জন। এবার গিয়েছেন এক হাজার ৯৬৭ জন।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের আগে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি এবং চলতি বছরের একই সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় সমান ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সংস্থান ছিল এক লাখ ৬০ হাজার ২৯১ জনের। চলতি বছরে গেছেন এক লাখ ৬০ হাজার ৭২৬ জন। তবে কমেছে সামগ্রিক অভিবাসন। গত বছরের প্রথম চার মাসে বিদেশে চাকরি নিয়ে দেশ ছাড়েন তিন লাখ তিন হাজার ৬৪২ জন। এই সংখ্যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৮৭ জন।
যুদ্ধ নেই এমন দেশেও বাড়েনি
২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের পর সিঙ্গাপুরই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বড় ভরসা। গত বছরে ৭০ হাজার ৮৩৫ বাংলাদেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ২২ হাজার ১২৬। অর্থাৎ এই শ্রমবাজার আমাদের জন্য প্রসারিত হয়নি।
উচ্চ বেতন এবং ভালো কর্মপরিবেশের জন্য খ্যাতি রয়েছে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার। এই দুই দেশেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি হচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে জাপানে চাকরি নিয়ে গিয়েছেন ৫৯০ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫৬৪। ২০২৪ সালে ছিল এক হাজার ৫৮।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৪ সালে চাকরি নিয়ে যান দুই হাজার ৮২৬ জন বাংলাদেশি। ২০২৫ সালে কর্মসংস্থান হয় দুই হাজার ৪৩৬। চলতি বছর প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ৪৮৪। নিম্ন জন্মহারের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা কমছে। কর্মী ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সুযোগ নেওয়ার কথা বলছে। জাপানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, অগ্রগতি নেই।
একই অবস্থা ইতালি, পর্তুগালের মতো উন্নত দেশের শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে। গত বছরের প্রথম চার মাসে বৈধপথে ইতালিতে যান এক হাজার ২২২ জন। চলতি বছরে এই সংখ্যা তিন হাজার ২৬১ জন। অবৈধ পথে ইতালিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে চাপ দিচ্ছে দেশটি। গত বছরের প্রথম চার মাসে পর্তুগাল গিয়েছিলেন দুই হাজার ৮৪ জন। চলতি বছর গেছেন দুই হাজার ৬৯ জন।
বন্ধ শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা
চলতি মাসের শুরুতে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় দুই বছর কর্মী যাওয়া বন্ধ রয়েছে। গত ৯ এপ্রিল যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ জানিয়েছে, শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে। এতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশ একমত। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় পৌনে পাঁচ লাখ কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সে দেশের সরকার সেবার যে ১০০ বাংলাদেশি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয়, তারা সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পায়। সরকার কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করেছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। তবে গড়ে নেওয়া হয় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। সিন্ডিকেটের কারণে শেষ পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও ১৮ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।
জনশক্তি ব্যবসায়ী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের সংগঠন বায়রা আগেরবার যোগ্যতার ভিত্তিতে এজেন্সি বাছাইয়ের নামে সিন্ডিকেট করেছিল। এবারও কি একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে. নাকি সবার জন্য বাজার উন্মুক্ত থাকবে, তার ওপর শ্রমবাজার খোলার সুফল নির্ভর করবে। সিন্ডিকেট হলে কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ
গতবছর আরব আমিরাত সফরে গিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, জাল নথি, ভুয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সনদে বিদেশ যাওয়ায় বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিদেশ গিয়ে মাথা হেট হয়। এই অনিয়মের কারণে ইউরোপের দেশ রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় বন্ধের পথে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী রোমানিয়া গিয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ৫৪১।
অভিবাসী উন্নয়ন কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক শাকিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কর্মীরা রোমানিয়া গিয়ে চাকরিতে যোগ দেন না। পালিয়ে ইতালি ও জার্মানি চলে যান। এতে নিয়োগকারীরা আর বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী নন। রাশিয়ার শ্রমবাজার বেশ ভালো ছিল। গত বছর প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী গিয়েছিলেন। এবার সংখ্যাটি কমছে। কারণ অনেকে লোভে পড়ে যুদ্ধে যান। সাধারণ চাকরিতে মাসিক বেতন হয়তো ৫০ হাজার টাকা। যুদ্ধে গেলে তা আড়াই লাখ টাকা।
সরকার ও ব্যবসায়ীরা কী বলছে
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শুধু যুদ্ধ নয় কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন সৌদি আরবে যেতে এখন ‘তাকামুল’ নামে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে পাস করতে না পারলে ভিসা দেওয়া হয় না। আবার সৌদিতে গিয়ে চাকরি, কাজ, বেতন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণেও অভিবাসন কমছে। ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়ায় তো কয়েক বছর ধরে বন্ধ। সে কারণে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না।
ইউরোপের দেশগুলোয় কর্মসংস্থান না হওয়ার বিষয়ে এই ব্যবসায়ী বলেছেন, ভিসার জন্য ভারতে যাওয়ার ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে গেছে। সরকার যদি ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভিএফএসের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ঢাকা থেকে ভিসা পাওয়া যাবে। তখন ইউরোপে কর্মসংস্থান বাড়বে।
প্রবাসী কল্যাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সমকালকে বলেছেন, যুদ্ধের কারণে যেসব দেশে কর্মসংস্থান কমেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। দেশগুলো আশ্বস্ত করেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ শুরু করবে। বাংলাদেশকে জোগান ঠিক রাখতে বলেছে।
ইউরোপের শ্রমবাজারের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেছেন, ওইসব দেশের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে ভিসা সহজীকরণের বিষয়ে। জাপানে যাওয়ার জন্য ভাষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার কাজ করছে। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশের সঙ্গে অতীতে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, সেগুলোকে কার্যকরে ফলোআপ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ওমানের মতো পুরোনো বাজারগুলো খুলতে এরই মধ্যে চেষ্টা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে।
প্রথম আলো
‘হামে আক্রান্ত শিশুরা পাঁচ ধরনের জটিলতার ঝুঁকিতে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রতিবেদন। খবরে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মোটাদাগে পাঁচ ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। এসব জটিলতায় মৃত্যুও হয়। অন্যদিকে শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, হাম শিশুস্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি করে, কিছু ক্ষতি স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিও আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগবিষয়ক বিস্তৃত বর্ণনায় হাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, হামে আক্রান্ত হলে দৃষ্টি ক্ষীণ হতে পারে, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, কানে সংক্রমণ হয়, নিউমোনিয়াসহ তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া এনকেফালাইটিস দেখা দেয়, যার কারণে মস্তিষ্কে প্রদাহ হয়। এতে মস্তিষ্কে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এ পর্যন্ত হামে ২৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্বলেরা আক্রান্ত হয় বেশি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের হাম হয়। যেসব শিশু টিকা নেয়নি বা টিকা নেওয়ার পরও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি তাদের হামের ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছেন, হাম হওয়া শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাদের কান পাকে, অপুষ্টিতে ভোগে, অনেকের মুখের ভেতরের চোয়ালের অংশে ঘা হয়।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ কমে যায়। শরীরে ভিটামিন এ কমে গেলে চোখ শুকিয়ে যায়, এতে চোখের ক্ষতি হয়।’ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভিটামিন এ–এর স্বল্পতার কারণে রাতকানা রোগ দেখা দেয়। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, শরীরে ভিটামিন এ–এর ঘাটতি আছে তারা হামে আক্রান্ত হলে পরিস্থিতির অবনতি হয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও হয়ে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, হামে আক্রান্ত শিশুর এনকেফালাইটিস দেখা দেয়। অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, পরিস্থিতি এ রকম হলে শিশুদের একধরনের মৃগীরোগ দেখা দেয়। খিঁচুনি হয়। আবার গর্ভধারণ অবস্থায় হামে আক্রান্ত হলে তা মায়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরিণত সন্তান প্রসব হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সন্তানের ওজন কম হয়। হামের এসব স্থায়ী ক্ষতির বিষয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, স্বাস্থ্য বিভাগেও আলোচনা কম। মানুষকে সচেতন ও সতর্ক করারও কোনো সরকারি প্রচেষ্টা নেই। এ ব্যাপারে নাগরিক উদ্যোগ বা বেসরকারি কর্মসূচিও চোখে পড়ে না।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অপুষ্ট শিশু হাসপাতালে এলেই তাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে। মাকেও ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে, যেন মায়ের দুধ থেকে শিশু ভিটামিন এ পায়। হামে আক্রান্ত দরিদ্র শিশুদের পরিবারকে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় এনজিও বা সমাজকল্যাণ কর্মসূচি থেকে সহায়তা করতে হবে, যেন ওই পরিবারের অপুষ্টি দূর হয়। সার্বিকভাবে দেশের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুস ভাগাভাগি’। খবরে বলা হয়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নরসিংদীতে জমি অধিগ্রহণে দুর্নীতি অনুসন্ধানে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসছে। রীতিমতো স্ট্যাম্পে চুক্তি করে শত শত কোটি টাকা ঘুস কমিশন নিতে ফাঁদ পাতা হয়। এমনকি ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই চক্র ‘ঘুস আসক্তিতে’ এতটাই বেপরোয়া ও নিমজ্জিত হয়েছিল যে, তারা ঘুস কমিশনের চুক্তিপত্র জেলা প্রশাসনের নথিপত্রেও সংযুক্ত করেন। যা প্রশাসনের ইতিহাসে অবিশ্বাস্য ও বিরল ঘটনা। অথচ দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এ ধরনের দুঃসাহসিক ঘুস ফাঁদের সঙ্গে স্বয়ং জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নেতৃত্বে জড়িত এডিসি, সড়ক ও জনপথের (সওজ) প্রকৌশলী, গণপূর্তের প্রকৌশলী, স্থানীয় সাংবাদিক, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও চিহ্নিত দালালসহ অন্তত ২০-২৫ জনের একটি প্রভাবশালী চক্র।
বাড়তি লেনদেনের ফর্মুলা জায়েজ করতে প্রতিটি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে নালাকে ভিটি ও ভিটিকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া হয়েছে। রাতারাতি গড়ে উঠেছে জোড়াতালি দেওয়া নিুমানের ঝুঁকিপূর্ণ বাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ প্রকল্পে নজিরবিহীন কমিশন বাণিজ্য ধরা পড়েছে যুগান্তরের ছয় মাসের অনুসন্ধানে। অবস্থা এমন যে, মসজিদে দানকৃত জমিও ব্যক্তি নামে ক্ষতিপূরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তারা।
এদিকে জমি অধিগ্রহণ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে নরসিংদীতে এখন সুনাম অর্জনকারী সবচেয়ে আলোচিত কর্মকর্তার নাম অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। কারণ যোগদানের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তিনি ঘুস সিন্ডিকেটের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন। তার শক্ত অবস্থানের কারণে চলমান এই প্রকল্পে তিন ধরনের মানুষের মুখোশ খুলে গেছে। যাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে মনে করেন। বিপরীতে লাভবান হয়েছে সরকার। যদিও এর সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিগ্রস্ত ক্যাডার কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা চেয়েছিলেন, কম দামের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে বাণিজ্যিক হিসেবে দেখিয়ে বেশি লাভবান হতে।
তবে এডিসি মাহমুদা বেগমের কঠোর পদক্ষেপের কারণে এই ভয়াবহ দুর্নীতির অপচেষ্টা একরকম ভেস্তে গেছে। তারই একক প্রচেষ্টায় সরকারের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে চলেছে। কিন্তু বিধি বাম। তিনি থাকতে পারলেন না। প্রভাবশালী কর্মকর্তার নীতিবহির্ভূত তদবির না শোনায় ২৭ এপ্রিল তাকে সিনিয়র সহকারী প্রধান হিসাবে পরিকল্পনা কমিশনে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি মাহমুদা বেগম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের ফিল্ডবহিতে সরকারি স্বার্থের পরিপন্থি অনেক বিষয় ছিল। যে কারণে অধিগ্রহণ তালিকায় নিয়মবহির্ভূতভাবে অনেক ভবন স্থান পেয়েছে। যেগুলো অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছে। নিয়ম হচ্ছে-সরকারের অধিগ্রহণ সিদ্ধান্তের পর জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। ফসলি জমি ও শিল্পকারখানার ক্ষতি না করে অধিগ্রহণের নকশা প্রণয়ন করতে হবে। নরসিংদীর ক্ষেত্রে এটা ছিল উলটো। ক্ষতিপূরণের তালিকায় অস্বচ্ছতা ছিল নজিরবিহীন। তাই বাস্তব তথ্য-উপাত্ত ও জমির রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ এবং অধিগ্রহণ আইন ও নিয়মনীতির মাধ্যমে অবৈধ অধিগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে। সরকারের টাকা সাশ্রয় করতে গিয়ে তিনি ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হয়েছেন বলেও জানান।
কালের কণ্ঠ
‘তালিকাভুক্ত ১৬১১ জঙ্গি মাঠে’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে গোয়েন্দা তালিকায় থাকা ১৬১১ জঙ্গি বর্তমানে আবার মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াতে শুরু করেছে। এই জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে কঠোর নজরদারি শুরু করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এর মধ্যে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় দেশের আটটি বিমানবন্দরসহ ১২টি কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় সতর্কতা জারির পাশাপাশি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক এই বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
এই জঙ্গিদের বেশির ভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়ে নতুন করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য সংগঠিত হচ্ছে। গতকাল রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গোয়েন্দাদের তালিকাটি কালের কণ্ঠের হাতে আছে। ওই তালিকার তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে।
আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত জামিন পেয়েছে আরো ৩৮০ জন। এই ৩৮০ জনের মধ্যে সাতজন আনসার আল ইসলাম, চারজন এবিটি, ৬৮ জন জেএমবি, ছয়জন নব্য-জেএমবি, ছয়জন হিযবুত তাহরীর, চারজন ইমাম মাহমুদের কাফেলা, চারজন হুজি, ১৫ জন জেএএফএইচএস এবং ২৬৫ জন নাম-উল্লেখ না থাকা সংগঠনের সদস্য। তাদের কেউ কেউ জামিনে থেকে হাজিরা দিলেও বেশির ভাগের হদিস মিলছে না। এর মধ্যে ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আর কখনো আদালতে হাজিরা দেননি। আরো ৯৬ জন কোথায় আছে তারো কোনো হদিস নেই।
২০২৪-এর আগস্টে ১৮ জন, সেপ্টেম্বরে ৩৮ জন, অক্টোবরে ১৩ জন, নভেম্বরে ১৫ জন ও ডিসেম্বরে ১২ জন জামিন পান। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ২৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৯ জন, মার্চে ৫১ জন, এপ্রিলে ৩১ জন, মে মাসে ৪০ জন, জুনে ৬১ জন এবং জুলাইতে ৫৬ জন জামিন পান। এর মধ্যে জেএমবির ৬৮ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দালের ১৫ জন, হুজিবির চারজন, ইমাম মাহমুদ কাফেলার চারজন, হিযবুত তাহরীর ছয়জন, নব্য-জেএমবির ছয়জন, এবিটির চারজন, আনসার আল ইসলামের সাতজন ও নামবিহীন সংগঠনের ২৬৫ জন রয়েছেন।
আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জেএমবি, হুজিবি, নব্য-জেএমবি, হিযবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, আল্লাহর দল, এবিটি, স্বারকীয়া ও ইমাম মাহমুদের কাফেলা—এই ৯টি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সদস্য।
পলাতকদের ধরন অনুযায়ী মামলার শুরুতে ১৩০ জন, জামিনে গিয়ে তদন্তাধীন অবস্থায় ৬১ জন, জামিনে গিয়ে বিচারাধীন অবস্থায় ৮৩ জনসহ মোট ২৭৪ জন পলাতক রয়েছেন। এর মধ্যে জেএমবির ১৬৪ জন, হিযবুত তাহরীরের ৫৮ জন, এবিটির ২৪ জন, নব্য-জেএমবির আটজন, আনসার আল ইসলামের ১৩ জন, হুজিবির একজন, আল্লাহর দলের চারজন, স্বারকীয়ার একজন ও ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য রয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জামিনে থাকা জঙ্গিদের পাশাপাশি গ্রেপ্তার না হওয়া জঙ্গিরা এখন নতুন করে নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় পলাতক জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।’ গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গিসংগঠনগুলোর কাছে অনেক গ্রেনেড ও ভারী অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে এর আগেও তারা দেশে অনেক ধরনের নাশকতা চালিয়েছে। এতে বিভিন্ন সময়ে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে।
ইত্তেফাক
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ‘হঠাৎ আলোচনায় জঙ্গি!’। প্রতিবেদনে বলা হয়, হঠাৎ করেই আলোচনায় এসেছে জঙ্গি! গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পুলিশের সব ইউনিটে চিঠি দেওয়ার পরই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তার জোরদার করার পাশাপাশি গতকাল সোমবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে। অন্য পাঁচটি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর।
দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সরকারি স্থাপনায় একটি নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে গোয়েন্দা সতর্কতা জারি করে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ সদরদপ্তরের ডিআইজি (গোপনীয়) কামরুল আহসানের সই করা একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার এই সতর্কতা জারি করা হয়। এর পরই গতকাল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, একটি জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা চালানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট সব ইউনিটকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা, নজরদারি বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। বেবিচক উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করে। বিমানবন্দরের কর্মরত সব বাহিনীকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের একটি চিঠির পর দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিমানবন্দরগুলো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাভুক্ত (কেপিআই) হওয়ায় সব সময়ই কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে থাকে। তবে ঐ চিঠি পাওয়ার পর নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হয়েছে। এটি নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিমানবন্দরে বেবিচকের নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ছাড়াও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। ফলে আগে থেকেই নিরাপত্তা রয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেছেন, ‘আমরা তথ্য পেয়েছি, কাজ করছি। পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিটি রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও সব জেলা পুলিশ সুপারসহ পুলিশের সব ইউনিটে পাঠিয়ে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এই চক্রটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা; যেমন—জাতীয় সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং শাহবাগ ম্যুরালসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। বোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশীয় ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে চিঠিতে।’
নয়া দিগন্ত
‘সার্বভৌমত্বে নতুন হুমকি’-এটি দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, বর্তমানে আন্তঃদেশীয় উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের বিস্তার, রোহিঙ্গা সঙ্কটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই সংবেদনশীল হয়ে উঠছে। নানা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, আরসা-টিটিবি-টিটিপিকে ঘিরে একটি সমন্বিত ত্রিমুখী নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক এই নেটওয়ার্কের পেছনে আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বা স্বার্থসম্পৃক্ততার বিষয়ও উল্লেখ করছেন, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জটিল ও বহুস্তরীয় হুমকি মোকাবেলায় আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সমন্বিত, তথ্যভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধ- সবকিছু মিলিয়ে একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগই সম্ভাব্য বড় ধরনের নিরাপত্তা সঙ্কট প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, নয়া দিগন্ত আগেও একাধিক প্রতিবেদনে আরসা, টিটিবি ও টিটিপির সম্ভাব্য তৎপরতা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সেসব বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এসব গোষ্ঠী উগ্র মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। বর্তমান প্রতিবেদনে ওই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম, কাঠামো ও সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নতুন কিছু সংবেদনশীল ও কৌশলগত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান প্রেক্ষাপট ও ভারতীয় কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের সাথে তাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, এই নতুন আঞ্চলিক সমীকরণ ভারত-অধিকৃত কাশ্মির ইস্যুতে নয়াদিল্লির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় ভারত মূলত ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ কৌশল গ্রহণ করে। অভিযোগ রয়েছে, এই কৌশলের অংশ হিসেবে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) মদদ দিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ভাতৃপ্রতিম সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়।
একই সময়ে, আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও টিটিপি (ধর্মীয় উগ্রবাদী) এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর (বিচ্ছিন্নতাবাদী জাতীয়তাবাদী) মধ্যে একটি কৌশলগত সমঝোতা গড়ে ওঠে। এ ছাড়া টিটিপির সাথে পাখতুন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী ‘ইত্তেহাদুল মুজাহিদীন পাকিস্তান’-এর যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চরম সঙ্কটে পড়ে।
বণিক বার্তা
দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম ‘টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন অঞ্চলে গ্যাসের সম্ভাব্যতা ৬ টিসিএফ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস ব্লক-১৮-এর অবস্থান। মিয়ানমারের সীমান্ত ঘেঁষা এ গ্যাস ব্লকে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাব্যতার তথ্য মিলছে গবেষণায়।
পূর্বাঞ্চলীয় ফোল্ডবেল্ট ব্লক-১৮-এর আওতাধীন সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ ও কোরাল দ্বীপে প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য প্রায় ৬ হাজার ১৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) বা ছয় টিসিএফ গ্যাস সম্পদ রয়েছে বলে গবেষণায় জানা গেছে। পূর্বাঞ্চলীয় ফোল্ডবেল্টে বিপুল গ্যাসের সম্ভাব্যতার বিষয়টি দেড় দশক আগেও ইঙ্গিত দিয়েছিল মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুস্তাভসন অ্যাসোসিয়েটস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেশের সমুদ্রসীমার গভীরে গ্যাসের সম্ভাব্যতার নানা প্রক্ষেপণ থাকলেও এসব এলাকায় বৃহৎ আকারে অনুসন্ধানের বড় কোনো কার্যকর উদ্যোগ ও তৎপরতা দেখা যায়নি পেট্রোবাংলা কিংবা জ্বালানি বিভাগের তরফে। বরং গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে বিগত সময়ে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশের গ্যাস খাতে আর্থিক সংকট দিন দিন বাড়িয়ে তোলা হয়েছে।
দেশের গভীর ও অগভীর সাগরে মোট ২৬টি গ্যাস ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় ব্লক-৮ থেকে ব্লক-১৮ প্রবল সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে বিবেচিত। সাগরে বিদেশী বেশ কয়েকটি কোম্পানি ইজারা নিলেও পরবর্তী সময়ে নানা কারণে তারা ব্লক ছেড়ে চলে যায়। মার্কিন প্রতিষ্ঠান ব্লক ১৮-তে গ্যাসের সম্ভাব্যতার যে তথ্য দিয়েছিল, সেসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে গ্যাসের বাড়তি সম্ভাব্যতার তথ্যও উঠে আসছে গবেষণায়। এমনকি গ্যাস আমদানির বিপরীতে বরং স্থানীয়ভাবে বিনিয়োগ করে বিপুল গ্যাস পেতে পারে বাংলাদেশ—এমন পূর্বাভাসও ছিল। কিন্তু সেসব প্রক্ষেপণ অনুযায়ী বিনিয়োগ না করে অতীতে সিদ্ধান্তহীনতা ও বিদেশী কোম্পানির অপেক্ষায় সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের অফশোর এলাকায় গ্যাসের সম্ভাব্যতার নানা তথ্যের বিষয়টি অস্বীকার করেননি পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা। তবে তাদের ভাষ্য হলো গভীর সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে অতীতের বিভিন্ন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা, বিনিয়োগে অনাগ্রহ এমনকি দক্ষ লোকবল ও বিশ্বমানের প্রযুক্তিগত সংকট ছিল। এ কারণে গ্যাস উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমলেও স্থানীয়ভাবে বৃহৎ আকারে এসব পূর্বাভাস মূল্যায়িত হয়নি। দেশের অফশোর অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। সরকারের অনুমতি পেলে আগামী মাসে এ দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাগরে দরপত্র আহ্বানে পেট্রোবাংলা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানে যাব।’
দেশের গভীর সাগরে গ্যাসের সম্ভাব্যতার বিষয়টি উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। এতে দেখা গেছে টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও কোরাল দ্বীপ অঞ্চলে ছয় টিসিএফের বেশি সম্ভাব্য প্রাথমিক গ্যাস সম্পদের উপস্থিতি রয়েছে। যেখান থেকে উত্তোলনযোগ্য সম্ভাব্যতা ৪ হাজার ৭৪৫ বিসিএফ এবং প্রমাণিত সম্ভাব্যতা ২ হাজার ৬৪ বিসিএফ। ভূতত্ত্ববিদ, বাপেক্সের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারাও বিষয়টি অস্বীকার করেননি।
বেইজিংভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কেইএআই’ ব্লক-১৮-তে গ্যাসের সম্ভাব্যতা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে ‘মন্টে কার্লো সিমুলেশন’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে অফশোরের গ্যাস ব্লক-১৮-তে প্রাথমিক সম্ভাব্যতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
‘অ্যাসেসমেন্ট অব প্রসপেক্টিভ গ্যাস রিসোর্সেস অ্যান্ড ডেভেলপ আ প্রডাকশন ভিউ অব ইস্টার্ন ফোল্ডবেল্ট (ব্লক-১৮), বাংলাদেশ ইউজিং মন্টে কার্লো সিমুলেশন মেথড’ শীর্ষক এ গবেষণা প্রতিবেদনে মূলত টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন ও কোরাল দ্বীপ এলাকায় গ্যাসের সম্ভাব্যতা, নিরূপণ ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনচিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আজকের পত্রিকা
‘সৌরবিদ্যুৎ ব্যবসায় জমি দিতে চায় রেল’-এটি দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, অব্যবহৃত ও নিষ্কণ্টক জমি কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ জন্য একসঙ্গে থাকা বড় আকারের জমি চিহ্নিত করে বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ উদ্যোগের কার্যকারিতার জন্য একসঙ্গে কমপক্ষে ১০ একর খালি জমি থাকতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ পরিকল্পনা ও শক্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে তা জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত জমি খুঁজতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে একসঙ্গে থাকা বড় আকারের জমি প্রয়োজন। কারণ, ছোট আকারের প্লটে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন। উদ্যোগটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিষ্কণ্টক (মামলা, দখল ইত্যাদি জটিলতামুক্ত) জমির তালিকা তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় রেলের জমিতে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় কয়েকটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও সম্ভাব্য পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রচুর- সংখ্যক প্যানেল বসানোর জন্য বেশ বড় জমির প্রয়োজন হয়। উদ্যোক্তাদের উদ্ধৃত করে রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গড়ে প্রায় তিন একর জমি প্রয়োজন। তবে প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করতে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত একত্রে কমপক্ষে ১০ একর জমি চান। এ কারণে তাঁরা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী প্রস্তাব দিতে বলেছেন।
রেল কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করবেন। বিশেষ করে জমি থেকে জাতীয় গ্রিডের দূরত্ব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হবে। গ্রিড সংযোগ কাছাকাছি হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ ও লাভজনক হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতিও বিবেচনায় নেবেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন আজকের পত্রিকায় বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সম্প্রতি একটি সভা হয়েছে, যেখানে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত অন্তত ১০ একর জমি চান। তাই রেলের মালিকানাধীন বড় ও ঝামেলামুক্ত জমি চিহ্নিত করে প্রস্তাব দিতে হবে, যেখানে কোনো মামলা বা জটিলতা নেই এবং যা সহজে ব্যবহারযোগ্য, এ ধরনের জমিই খোঁজা হচ্ছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ উদ্যোগ থেকে কীভাবে লাভবান হবে, এ বিষয়ে রেলের মহাপরিচালক বলেন, এখনো চূড়ান্ত কোনো বিজনেস মডেল (ব্যবসায়িক কাঠামো) নির্ধারণ হয়নি। তবে পাবলিক- প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), মুনাফা ভাগাভাগি, জমি ভাড়া দেওয়া কিংবা কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার মতো বিভিন্ন মডেলে কাজ করা যেতে পারে। উপযুক্ত জমি পাওয়া সাপেক্ষে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
দেশ রূপান্তর
দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপপুর’। খবরে বলা হয়, সময়ের এক অনন্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হবে আজ, যার মধ্য দিয়েই মূলত এই কেন্দ্র থেকে ধাপে ধাপে শুরু হবে বহুল কাক্সিক্ষত সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরঘেঁষে, সবুজের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যেন নিঃশব্দে বহুদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই মুহূর্তের জন্য। আজ সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রি-অ্যাক্টরের হৃদয়ে প্রবেশ করবে পারমাণবিক জ্বালানি, আর তার সঙ্গে সঙ্গে জেগে উঠবে শক্তির এক নতুন সুর।
এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ। দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দুটি ইউনিট মিলে কেন্দ্রটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। যার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলে দেশের শিল্প, কৃষি ও নগরজীবনে নতুন গতি আনবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণকালে প্রতিদিন প্রায় ২০-২৫ হাজার মানুষ কাজ করছেন প্রকল্প এলাকায়।
আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের কাজ শুরু হবে। ওই বছর সেপ্টেম্বরে রূপপুরের দুটি ইউনিট থেকে মোট ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী।
এদিকে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হয়েছে গত বছরের মে মাসে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে পুরোদমে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ হবে বলে জানিয়েছে পিজিসিবি। আন্তর্জাতিক পরমাণু গবেষক এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রথম ধাপ, যা নির্মাণ পর্যায় থেকে কার্যক্রম শুরুর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, ফুয়েল লোড করা মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, বরং এটি একটি সূক্ষ্ম ও দীর্ঘ কারিগরি প্রক্রিয়ার শুরু। জ্বালানি লোড করার পর রি-অ্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই চেইন রি-অ্যাকশন বা ‘ফিশন বিক্রিয়া’ শুরু করা হয়। ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি করা হয় নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা। তবে এই সময়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তা গ্রিডে দেওয়া না গেলেও প্রকল্পের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করবে।
