রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে খাবারে চেতনানাশক মিশিয়ে ধারাবাহিক চুরি ও হত্যার ঘটনায় জড়িত এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তারকৃতের নাম বিলকিস বেগম (৪০)। বিলকিসের গ্রামের বাড়ি জামালপুর জেলার মেলান্দহ থানায়। বর্তমানে সে গাজীপুরের চন্দনা স্কুলের পেছনে ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বসবাস করে।
সোমবার পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান এসব তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘বিলকিস বেগম অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির। তার কোনো এনআইডি নেই এবং হাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই। তিনি বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নাম-পরিচয়ে গৃহকর্মীর কাজ নিতেন। পরে সুযোগ বুঝে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে গৃহকর্তা বা পরিবারের সদস্যদের অচেতন করে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করতেন। একটি ঘটনায় তিনি হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত করেন।’
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে মো. ইবনুল আলম পলাশের বাসায় কেয়ারটেকার মো. জাকিরের
কাছে গৃহকর্মী হিসেবে কাজের খোঁজে যান। পরবর্তীতে ভিক্টিম ইবনুল আলমের স্ত্রী তাকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং তার এনআইডি কার্ডসহ পরদিন কাজে আসার জন্য বলেন। পরদিন গত ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট বাসায় আসেন। গৃহকর্ত্রী এনআইডি কার্ড চাইলে সে জানায় যে, এনআইডি কার্ড আনতে ভুলে গেছেন পরের দিন নিয়ে আসবেন।
১৪ আগস্ট সকালে গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী কর্মস্থলে চলে গেলে তিনি বাসায় থাকা বৃদ্ধা রওশনারা বেগম (৬৬)-এর জন্য আলুভাজি ও রুটি প্রস্তুত করেন। এ সময় কৌশলে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে দেন। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুক্তভোগী অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর বিলকিস বৃদ্ধার হাতে থাকা স্বর্ণের বালা, কানের দুল এবং টেবিলে থাকা ব্যাগ থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।
পরে বাসার মালিক দম্পতি ফিরে এসে বৃদ্ধাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেন। টানা ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হওয়ার পর ঘটনাটি প্রকাশ পায়।
এ ঘটনায় ভিকটিমের ছেলে ইবনুল আলম পলাশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা রজু করেন। অপরাধীর ছবি, মোবাইল নম্বর বা এনআইডির তথ্য না থাকায় পুলিশ তাকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয় এবং আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
পরবর্তীতে মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত পিবিআইকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ফিরোজ আহমেদ মুন্সীর নেতৃত্বে একটি দল সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে সন্দেহভাজনকে শনাক্তের চেষ্টা চালায়।
এদিকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানাধীন এলাকায় গৃহকর্মী কর্তৃক মালিককে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে হত্যা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার লুটের আরেকটি ঘটনা ঘটে।
দু’টি ঘটনার আচরণগত ও কৌশলগত মিল থাকায় পিবিআই আরও গভীর তদন্ত পরিচালনা করে। এবং সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পূর্ববর্তী ঘটনার ভিক্টিমকে অপরাধীর ছবি দেখান। তারা নিশ্চিত করেন যে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত মহিলা আর তাদের বাসায় চুরির ঘটনায় জড়িত একই মহিলা।
পরবর্তীতে অভিযান চালিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামি বিলকিস বেগমকে (৪০) শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে এসকল ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে বিলকিস জানান, চুরি করা স্বর্ণালংকার গাজীপুরে নিয়ে পরিচিত শহরবানুর মাধ্যমে বিক্রি করেন। তার দেয়া তথ্য মতে পিবিআই এর অভিযানিক দল গাজীপুরে অভিযান করে শহরবানুকে খুঁজে পায় এবং একটি জুয়েলারি দোকানে স্বর্ণ বিক্রির সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনায় শহরবানু, জুয়েলারি ব্যবসায়ী গোবিন্দ ঘোষ ও রুপা সরকার আদালতে সাক্ষ্য দেন। তবে স্বর্ণালংকার তাৎক্ষণিক গলিয়ে ফেলায় লুণ্ঠনকৃত স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
