এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সমস্যা কী? রাজনৈতিক না অর্থনৈতিক। মোটাদাগে বলা যায়, রাজনৈতিক নয়। অর্থনৈতিক সংকটই বাংলাদেশকে কাবু করতে চলেছে। এই সংকট দেশকে ঠেলে দিচ্ছে এক অস্তিত্ব ঝুঁকিতে। ইরান যুদ্ধ অর্থনীতির ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বলা চলে তামাম দুনিয়াকে। দেশে দেশে সরকারগুলো সংকট মোকাবিলায় রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার কোনো ছাপ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকিং সেক্টরকে নিয়েই এই সংকট প্রকট হচ্ছে।
ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে একদম ভেঙে দেয়। টাকা লুটের নেশা পেয়ে বসেছিল সরকারকে। এক এস আলমের হাতেই ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা অনেকটা ছেড়ে দিয়েছিল। একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই টাকা লুট করেছে। শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংক থেকেই ৮০ হাজার কোটি টাকা এস আলম একাই নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ব্যাংক সেক্টরের কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারির মধ্যেই এই টাকা পাচার করা হয়। ‘টপটেন’ নামের এক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা সরানোর উদ্যোগ তদন্তে ধরা পড়েছে। সর্বশেষ এই অ্যাকাউন্টে ৫৭০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়ার একটি প্রচেষ্টা অন্তর্বর্তী জমানায় ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি গড়িয়েছিল আদালতেও। শেষ পর্যন্ত এই টাকা জব্দ করা হয়।
অনেকেই লুটের টাকার উপর ভাগ বসিয়েছেন। হঠাৎ বড়লোক হয়েছেন। যেমনটা হয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর একজন পিয়নও। তিনি নিজেই বলেছিলেন, পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছে। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না।
বিদেশে অনেকে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এখন তারা মহা আনন্দেই আছেন। কখনও সিঙ্গাপুর, কখনও দুবাই কখনও দিল্লি আবার কখনও লন্ডন, আমেরিকা ও কানাডায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নতুন নতুন ব্যবসা খুলছেন। বাড়িঘর কিনছেন। কিন্তু এই টাকা ফেরত আনার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বরং নতুন করে পথ খোঁজা হচ্ছে। যাতে করে ওই ব্যক্তির ছায়া আবার ফিরে আসে। অন্তর্বর্তী প্রশাসন হাঁকডাক করে ১৮ মাস কাটিয়েছে। তদন্ত কমিটি হয়েছে। ফলাফল শূন্য। বলাবলি আছে, এই সুযোগে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের বেশ কিছু মানুষ মোটাতাজা হয়েছেন। বিদেশে সম্পদ গড়ার তালিকায় তাদের নাম উঠেছে।
যাইহোক, এরমধ্যেও ব্যাংক সেক্টরকে সঠিক পথে ফেরানোর জন্য লুট হয়ে যাওয়া পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছিল। এখন নতুন সরকার সে সিদ্ধান্ত উল্টে দেয়ার কথা ভাবছে। সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই খবর এসেছে। যদিও গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্যাংকিং খাত এমনিতেই স্পর্শকাতর। ইশারা-ইঙ্গিতে মুহূর্তেই অস্থির হয়ে পড়ে। পাঁচ ব্যাংক আলাদা হওয়ার খবরে ব্যাংকিং সেক্টরে প্রভাব পড়েছে। তিন কোটি গ্রাহকের ইসলামী ব্যাংকে ইতিমধ্যেই টাকা তোলার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা কিনা উদ্বেগজনক।
৫ই আগস্টের পরিবর্তনের পর প্রায় পাঁচ হাজার লোকের চাকরি চলে গিয়েছিল ইসলামী ব্যাংক থেকে। এদেরকে আবার ফিরিয়ে আনার নানা তৎপরতা এখন স্পষ্ট। তারাই গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে মব তৈরি করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল।
এই পাঁচ হাজার লোকের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল অঞ্চলভিত্তিক। সম্প্রতি আইএমএফ-এর বৈঠকে নানাভাবে প্রসঙ্গটি এসেছে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শনিবার এক কূটনৈতিক আড্ডায় এমনটাই জানা গেল। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক সরাসরি বললেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনলে বাংলাদেশে অস্থিরতা বাড়বে। নতুন সরকারের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এটা মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন হবে। যা কল্পনারও বাইরে।
-স্টাফ রিপোর্টার
