‘সেই থেকে মানবজমিনের প্রেমে পড়ে গেলাম, আজও পড়ছি’

‘সেই থেকে মানবজমিনের প্রেমে পড়ে গেলাম, আজও পড়ছি’

ফন্ট সাইজ:

’৭১ সালের রায়ট যখন চলে তখন তিনি কিছুটা বোঝেন। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া পাকবাহিনীর গাড়িগুলোও দেখেছেন। পাঠশালা (৫ম) পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। বাড়ির সামনে শতবর্ষী বিদ্যালয় থাকলেও আর সামনের দিকে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেননি। পিতা মতিলাল রবিদাস পরলোকগত হওয়ায় হাল ধরতে হয়েছে পরিবারের। নিজে কম লেখাপড়া করলেও সন্তানদের পড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এক ছেলে দুইবার মেট্রিক ফেল করলেও দুই মেয়ে মিতা রবিদাস ও সুমি রবিদাস ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত লেখা-পড়া করেছে। রাজনগর বাজারের পোস্ট অফিসের সামনে ‘জামতলায়’ দীর্ঘ ৫৩ বছর থেকে চাপ্পল সেলাইয়ের কাজ করে আসছেন। ঝড়বৃষ্টি ও রোদে পুড়ে চলছে তার শ্রম। সেই কনক রবিদাস যেন এক খবর পাগল মানুষ। বিশেষ করে মানবজমিন পত্রিকার ভক্ত। পত্রিকার জন্মদিনের সংখ্যা দিয়ে ক্রয় করা শুরু করে আজ অব্দি মানবজমিনই ক্রয় করে আসছেন।
গতকাল দীর্ঘ সময় কথা হলো কনক রবিদাসের সঙ্গে। রাজনগর পুরাতন থানার পশ্চিম দিকে কেন্দ্রীয় ঈদগাহের সামনে নিজেদের পৈতৃক বাড়িতে বসবাস করছেন কয়েক প্রজন্ম থেকে। ৩-৪শ’ বছরেরও বেশি সময় ধরেই এখানে তাদের বাস।
কনক রবিদাস বলেন, করোনা ভাইরাসের লকডাউনের সময় কিছুদিন পত্রিকা পাইনি। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময়টা অনেক কষ্টে গেছে। কোনো খবর পেতাম না। কী ঘটছে জানতাম না। সে সময়টা ছিল যন্ত্রণার। এটা পত্রিকা পাগল মানুষ ছাড়া কেউ বুঝবে না। তিনি আরও বলেন, সবাই তো এখন মোবাইল ফোনের ইন্টারনেট আর অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়েছে। ঝটপট খবর দেখে নেয়। আর ভুয়া খবরের পেছনে দৌড়াচ্ছে। গুজবে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব খবর কয়জনে পায়। নেটে পাওয়া খবর পরদিন বদলে যায়। আমি পত্রিকা পড়ে খবর জানি। আর এটাই সঠিক খবর। এটা বদলায় না। কনক রবিদাস বলেন, দীর্ঘদিন এখানে রাস্তার পাশে বসে জুতা সেলাইয়ের কাজ করে আসছি। এ টাকা দিয়েই পরিবার চলে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চলে। প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা রুজি করা যায়। কখনো ৪০০-৫০০ও হয়ে যায়। বর্তমান চড়া বাজার মূল্যের সময়ে ৮ সদস্যের পরিবার নিয়ে চলা কষ্টদায়ক। অনেক কষ্ট করেছি। এখন ছেলে কিছু রোজগার করছে। এতে কোনো মতে চলে যাচ্ছে। বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। সদ্য অপর মেয়েটিরও বিয়ে হয়ে যাবে।
কনক রবিদাস বলেন, এক সময় বাংলাবাজার পত্রিকা পড়তাম। হকার প্রতিদিনই পত্রিকা দিয়ে যেতো। ওই সময় শুনলাম বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক আরেকটি পত্রিকা চালু করবেন। হকারকে আগেই বলে রাখলাম প্রথমদিন থেকে যেন পত্রিকা দিয়ে যায়। সকালে হাতে নতুন পত্রিকা পেলাম। ছোট পত্রিকা হওয়ায় আমার এখানে বসে বসে পড়া সহজ। প্রথমদিন পত্রিকা হাতে নিয়েই দেখলাম এটির নাম ‘মানবজমিন’। হকারকে বলে রাখলাম প্রতিদিন যেন এটি দিয়ে যায়। সেই থেকে মানবজমিনের প্রেমে পড়ে গেলাম। আজো মানবজমিনই পড়ছি। ১৫ই ফেব্রুয়ারি মানবজমিন পত্রিকার যে জন্মদিন- এটি জানেন কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, না তো! আজকে কি পত্রিকার জন্মদিন? উত্তরে হ্যাঁ বলার সঙ্গে সঙ্গে কনক রবিদাসের চোখে-মুখে ফুটে উঠে আনন্দের রেখা।
তিনি বলেন, কাজের চাপ কম। তাই পত্রিকা পড়েই সময় কাটাই। পত্রিকা হাতে নিয়েই শিরোনাম থেকে পড়া শুরু করি। একটি একটি করে সবক’টি নিউজ শেষ পর্যন্ত পড়ি। আর আমি একা নই। আমার চাচাতো ভাইসহ সবার চাহিদা মানবজমিন পত্রিকার। আগে আমরা দু’জন বসতাম এখানে। উভয়ে মিলে পত্রিকা একটি কিনতাম। এখন আমাদের লোকজন বেড়েছে। একটায় হয় না। তাই এখন ২টি মানবজমিন কিনি। মানবজমিন পত্রিকার খবর সম্পর্কে কনক রবিদাস বলেন, সব সময়ই আলোচিত নিউজগুলো পাই। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন, সরকার পতন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের নিউজগুলো গুরুত্ব সহকারে পাঠ করেছি। এবারের নির্বাচনের আগে পত্রিকার নিউজ দেখে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে- এটা আমি ধরে নিয়েছিলাম। পত্রিকায় রেজাল্ট দেখে আমার ধারণা সঠিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে। কনক রবিদাস বলেন, আমি মানবজমিনের জন্ম থেকে আছি। আমার মৃত্যু পর্যন্ত মানবজমিনের সঙ্গেই থাকবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন