মোজতবা আহত, ইরানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জেনারেলদের বোর্ড

মোজতবা আহত, ইরানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জেনারেলদের বোর্ড

ফন্ট সাইজ:

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশ পরিচালনায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপসের জেনারেলদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করছেন। এক্ষেত্রে তারা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। রাজনীতিবিদ আবদোলরেজা দাভারি ইরানি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। মোজতবা খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে তার।

তিনি বলেন, মোজতবা দেশ চালাচ্ছেন যেন তিনি বোর্ডের পরিচালক। তিনি বোর্ড সদস্যদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। তারা সম্মিলিতভাবে সব সিদ্ধান্ত নেন। জেনারেলরাই হচ্ছেন সেই বোর্ডের সদস্য।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা আত্মগোপনে আছেন। তিনি আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও ওই হামলায় তার স্ত্রী ও সন্তান নিহত হন। বর্তমানে তার কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত সীমিত। শুধু চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই তার দেখাশোনা করছেন। ইসরাইলি নজরদারি ও সম্ভাব্য হামলা এড়াতে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করা বন্ধ করেছেন। তার চিকিৎসা তদারকি করছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি নিজেও একজন হৃদরোগ সার্জন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা গুরুতরভাবে আহত হলেও মানসিকভাবে তিনি সচেতন ও সক্রিয়। তার একটি পায়ে তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ভবিষ্যতে তাকে কৃত্রিম পা ব্যবহার করতে হবে। তার হাতেও অস্ত্রোপচার হয়েছে। ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা ফিরে আসছে। মুখ ও ঠোঁট মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তার কথা বলা কঠিন হয়ে পড়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া, নিজেকে দুর্বল দেখাতে না চাওয়ায় মোজতবা সরাসরি কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। তিনি কেবল লিখিত বিবৃতি দিচ্ছেন। তার নিরাপত্তা, শারীরিক অবস্থা এবং তার কাছে পৌঁছানোর জটিলতার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব জেনারেলদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম কট্টরপন্থীরা এখনো রাজনৈতিক আলোচনায় সক্রিয় এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব কমে যাচ্ছে।

বর্তমানে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো মূলত রেভল্যুশনারি গার্ডদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। তারা বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করছে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে আছেন আহমাদ ভাহিদি, আর সাবেক কট্টরপন্থী কমান্ডার মোহাম্মদ বাকের জোলঘাদর । তিনি এখন সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান। আরও আছেন আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি। তিনি পিতা ও ছেলে- উভয় সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এখনো প্রভাব ধরে রেখেছেন।

অন্যদিকে নির্বাচিত সরকারকে অনেকটাই পাশ কাটিয়ে রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ও তার মন্ত্রিসভাকে মূলত অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, খাদ্য ও জ্বালানির মতো প্রয়োজনীয় সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দৈনন্দিন প্রশাসন চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার ভূমিকা কমে গেছে। তার জায়গায় পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশের বৈদেশিক কৌশল নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
সামরিক কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যেমন ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ করা, এসব এখন গার্ড বাহিনীই নির্ধারণ করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থাপনাও করেছে এবং গোপন যোগাযোগ ও সরাসরি আলোচনার অনুমোদন দিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এবার প্রথমবারের মতো রেভল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ কমান্ডাররা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

তবে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কখনোই এককভাবে পরিচালিত হয়নি। এখানে বিভিন্ন ক্ষমতার কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে মতবিরোধ প্রায়ই দেখা যায় এবং কখনো তা প্রকাশ্যেও আসে। মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আব্বাস আরাঘচির মতো ব্যক্তিরা এখনো ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য স্পষ্টভাবে সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। আপাতত জেনারেলরা একসঙ্গে কাজ করছেন এবং তাদের মধ্যে কোনো বড় ধরনের বিভক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন